শ্রমিক দিবসের সূতিকাগার শিকাগোর হে মার্কেট ঘুরে দেখা
৪ মে, দিনটি আমার কাছে শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, ইতিহাসের এক অনির্বাণ স্মৃতিদিবস। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, কাকতালীয়ভাবে আজ আমি অবস্থান করছি সেই যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরেই, যেখানে ১৪০ বছর আগে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের ইতিহাস বইয়ে পড়েছি, অসংখ্য আলোচনা সভা ও শোভাযাত্রায় এর কথা শুনেছি। কিন্তু যে ভূমিতে এই আন্দোলনের বীজ রোপিত হয়েছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে ইতিহাসকে অনুভব করার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মনে হচ্ছিল, অতীত আর বর্তমান যেন একই সরলরেখায় এসে মিলেছে। সকাল ঠিক নয়টায় ইন্ডিয়ানার ওয়েস্ট লাফায়েত থেকে শিকাগোর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। দূরত্ব মাত্র দুই ঘণ্টার। যাতায়াতের জন্য বেছে নিয়েছিলাম আন্তঃনগর শাটল বাস। যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের বাস নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট রুটে চলাচল করে এবং অধিকাংশ যাত্রী আগেই অনলাইনে টিকিট সংগ্রহ করেন। মোবাইলে সংরক্ষিত কিউআর কোড স্ক্যান করেই বাসে ওঠা যায়। কোথাও কন্ডাক্টরের হাঁকডাক নেই, নেই শেষ মুহূর্তে যাত্রী তোলার ব্যস্ততা। সবাই সারিবদ্ধভাবে উঠে নিজের
৪ মে, দিনটি আমার কাছে শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, ইতিহাসের এক অনির্বাণ স্মৃতিদিবস। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, কাকতালীয়ভাবে আজ আমি অবস্থান করছি সেই যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরেই, যেখানে ১৪০ বছর আগে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।
বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের ইতিহাস বইয়ে পড়েছি, অসংখ্য আলোচনা সভা ও শোভাযাত্রায় এর কথা শুনেছি। কিন্তু যে ভূমিতে এই আন্দোলনের বীজ রোপিত হয়েছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে ইতিহাসকে অনুভব করার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মনে হচ্ছিল, অতীত আর বর্তমান যেন একই সরলরেখায় এসে মিলেছে।
সকাল ঠিক নয়টায় ইন্ডিয়ানার ওয়েস্ট লাফায়েত থেকে শিকাগোর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। দূরত্ব মাত্র দুই ঘণ্টার। যাতায়াতের জন্য বেছে নিয়েছিলাম আন্তঃনগর শাটল বাস। যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের বাস নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট রুটে চলাচল করে এবং অধিকাংশ যাত্রী আগেই অনলাইনে টিকিট সংগ্রহ করেন। মোবাইলে সংরক্ষিত কিউআর কোড স্ক্যান করেই বাসে ওঠা যায়। কোথাও কন্ডাক্টরের হাঁকডাক নেই, নেই শেষ মুহূর্তে যাত্রী তোলার ব্যস্ততা। সবাই সারিবদ্ধভাবে উঠে নিজের নির্ধারিত আসনে বসে পড়েন। পুরো ব্যবস্থাটিই সময়ানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলার এক অনন্য উদাহরণ।
বাস যত শিকাগোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ততই মনে পড়ছিল ১৮৮৬ সালের সেই উত্তাল বসন্তের কথা
বাংলাদেশের দূরপাল্লার বাসযাত্রার সঙ্গে এই পার্থক্য সহজেই চোখে পড়ে। প্রশস্ত আসন, বিনামূল্যের ওয়াইফাই, মোবাইল চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা এবং বড় কাচের জানালার ভেতর দিয়ে ছুটে চলা সবুজ প্রান্তর, ছোট ছোট জনপদ ও শিল্পাঞ্চল যেন পথের ক্লান্তিকে মুহূর্তেই ভুলিয়ে দিচ্ছিল।
বাস যত শিকাগোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ততই মনে পড়ছিল ১৮৮৬ সালের সেই উত্তাল বসন্তের কথা। শিল্পবিপ্লবের যুগে আমেরিকার অসংখ্য কারখানায় শ্রমিকদের প্রতিদিন ১২-১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো। কর্মপরিবেশ ছিল অনিরাপদ, মজুরি ছিল অপ্রতুল, আর মানুষের জীবন যেন উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। এই অমানবিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে উচ্চারিত হয় এক ঐতিহাসিক দাবি। আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম এবং আট ঘণ্টা নিজের ও পরিবারের জন্য। এই দাবির মধ্যেই লুকিয়ে ছিল মানুষের মর্যাদা, স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বীকৃতি।
২৫ এপ্রিল থেকে শিকাগো শহরে ধর্মঘট ও প্রতিবাদের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক মিছিল ও সমাবেশে অংশ নিতে থাকেন। আন্দোলনের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে ৪ মে হে মার্কেট স্কয়ারে। হাজারো শ্রমিকের সমাবেশের একপর্যায়ে বিস্ফোরণ ঘটে, তারপর শুরু হয় গুলিবর্ষণ। কে প্রথম হামলা চালিয়েছিল, তা নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে।
তবে এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই যে সেদিন হে মার্কেট রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। নিহত হন শ্রমিক ও পুলিশ সদস্য, আহত হন অসংখ্য মানুষ। পরবর্তী সময়ে কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে বিতর্কিত বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু তাদের আত্মত্যাগ আন্দোলনকে স্তব্ধ করেনি, বরং শ্রমিক অধিকারের সংগ্রামকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন শক্তি ও বৈধতা এনে দেয়।
শিকাগোর সুউচ্চ অট্টালিকাগুলো দিগন্তে স্পষ্ট হয়ে উঠতেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আবেগ জেগে উঠলো
১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক কংগ্রেসে শিকাগোর শহীদ শ্রমিকদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতি বছরের ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আজ বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই দিনটি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হয়। তবে একটি ঐতিহাসিক বৈপরীত্য এখানেই। যে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে এই আন্দোলনের জন্ম, সেই দেশেই ১ মে সরকারি শ্রমিক দিবস নয়। এখানে শ্রমিক দিবস পালিত হয় সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার।
উনিশ শতকের শেষ দিকে শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং পরবর্তী সময়ে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে ১ মে তারিখটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ভিন্ন একটি দিনকে সরকারি শ্রমিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ১ মে শ্রমিক দিবসের প্রতীক হয়ে উঠলেও যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব ঐতিহ্য অনুসরণ করে সেপ্টেম্বরের প্রথম সোমবার লেবার ডে উদযাপন করে। ইতিহাসের এই ব্যতিক্রমী বাস্তবতা আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুললো। যে শহরের রক্তাক্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে বিশ্ব শ্রমিক আন্দোলনের নতুন যুগের সূচনা, সেই শহরের মানুষ আজ ভিন্ন দিনে শ্রমিক দিবস পালন করে। ইতিহাসের এমন পরিহাস খুব কমই দেখা যায়।
দুপুরের দিকে শিকাগোর সুউচ্চ অট্টালিকাগুলো দিগন্তে স্পষ্ট হয়ে উঠতেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আবেগ জেগে উঠলো। মনে হলো, আমি শুধু একটি আধুনিক মহানগরে প্রবেশ করছি না, বরং মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং শ্রমিক আন্দোলনের এক পবিত্র স্মৃতিভূমির দিকে এগিয়ে চলেছি। শহরের ব্যস্ত সড়ক পেরিয়ে যখন হে মার্কেট এলাকার কাছে পৌঁছালাম, তখন কোথাও রক্তাক্ত অতীতের কোনো দৃশ্য চোখে পড়ল না।
চারদিকে আধুনিক নগরজীবনের স্বাভাবিক ব্যস্ততা। আকাশছোঁয়া ভবন, ক্যাফে, অফিস, সাইকেল আরোহী আর কর্মচঞ্চল মানুষের ভিড়। প্রথম দেখায় বিশ্বাসই করা কঠিন যে এই পরিবেশের মাটিতেই একদিন শ্রমিকদের রক্ত ঝরেছিল। সময় ক্ষতকে ঢেকে দিয়েছে, কিন্তু ইতিহাসকে মুছে দিতে পারেনি। সেই উপলব্ধি হৃদয়ে ধারণ করেই আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম হে মার্কেট স্মৃতিচত্বরের দিকে, যেখানে অতীতের প্রতিটি পদচিহ্ন আজও নীরবে মানবমুক্তির সংগ্রামের কথা বলে।
হে মার্কেট স্মৃতিচত্বরে পৌঁছে প্রথমেই চোখে পড়ল ব্রোঞ্জে নির্মিত এক শ্রমিকের ভাস্কর্য। দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মূর্তি যেন আজও ন্যায্য অধিকার, ন্যায়বিচার এবং মানবমর্যাদার পক্ষে উচ্চারণ করে চলেছে প্রতিবাদের ভাষা। এটি কোনো একক ব্যক্তির প্রতিকৃতি নয়, বরং পৃথিবীর সব শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামের প্রতীক। ভাস্কর্যের পাশেই রয়েছে তথ্যফলক, যেখানে সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে ১৮৮৬ সালের আন্দোলন, হে মার্কেটের সংঘর্ষ এবং পরবর্তী বিচার প্রক্রিয়ার ইতিহাস। কয়েকজন পর্যটক গভীর মনোযোগ দিয়ে সেসব পড়ছিলেন। কেউ ছবি তুলছিলেন, কেউ আবার নীরবে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের সামনে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। তাদের সেই নীরবতা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করল।
মনে হলো, সভ্যতার প্রকৃত শক্তি কেবল বিজয়ের ইতিহাস সংরক্ষণে নয়, অন্যায়ের স্মৃতিকেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সততার সঙ্গে ধরে রাখায়। চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম আধুনিক শিকাগো তার নিজস্ব ছন্দে বেঁচে আছে। ছোট ছোট ক্যাফে, অফিস, আবাসিক ভবন, কর্মব্যস্ত মানুষের পদচারণা, সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি এবং দ্রুতগতির নগরজীবন। এক মুহূর্তের জন্যও বোঝার উপায় নেই, এই নিরীহ পরিবেশের বুকেই একদিন রক্ত, বারুদের গন্ধ আর আর্তনাদ ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দিয়েছিল। তখন মনে হলো, সময় ক্ষত শুকিয়ে দিতে পারে, কিন্তু স্মৃতি কখনো মুছে দিতে পারে না।
স্মৃতিস্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, হে মার্কেটের সেই আন্দোলনের উত্তরাধিকার আজ কত সুদূর বিস্তৃত। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশে নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, ছুটি, ন্যায্য মজুরি এবং শ্রমিকের মৌলিক অধিকার আইনগত স্বীকৃতি পেয়েছে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে শ্রমজগতের সব সংকটের অবসান ঘটেছে। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি, গিগ কর্মসংস্থান, অভিবাসী শ্রমিকের অধিকার এবং অনিশ্চিত কর্মপরিবেশ নতুন বাস্তবতা ও নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। তবু একটি বিষয় নিঃসন্দেহে সত্য।
শ্রমিক দিবসের পেছনে কত অশ্রু, রক্ত, আত্মত্যাগ, অপূর্ণ জীবনের ইতিহাস জড়িয়ে আছে
১৮৮৬ সালের হে মার্কেট আন্দোলন শ্রমিকের ন্যায্য দাবিকে একটি শহরের সীমা ছাড়িয়ে মানবাধিকারের সার্বজনীন প্রশ্নে পরিণত করেছিল। সেই উপলব্ধির মধ্যেই আমার দেশের কথাও মনে পড়ছিল। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, পরিবহনসহ প্রতিটি উৎপাদনশীল খাত দাঁড়িয়ে আছে লাখো শ্রমজীবী মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমের ওপর। প্রতিটি সেতু, মহাসড়ক, শিল্পকারখানা কিংবা রপ্তানি সাফল্যের অন্তরালে রয়েছে তাদের ঘাম, নিষ্ঠা ও ত্যাগ। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই সেই অবদান যথাযথ মর্যাদা পায় না। হে মার্কেটে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করলাম, এই স্মৃতিস্তম্ভ কেবল শিকাগোর নয়, এটি পৃথিবীর প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের আত্মমর্যাদা, অধিকার এবং আত্মত্যাগের এক অনির্বাণ প্রতীক।
প্রতিবছর আমরা পহেলা মে পালন করি, শোভাযাত্রায় অংশ নিই, শ্রমিকের অধিকার নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু খুব কম মানুষই উপলব্ধি করি, এই দিবসের পেছনে কত অশ্রু, কত রক্ত, কত আত্মত্যাগ এবং কত অপূর্ণ জীবনের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। হে মার্কেটে এসে সেই ইতিহাস যেন আমার কাছে জীবন্ত হয়ে উঠলো। এটি আর শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, মানবমর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং শ্রমের সম্মান প্রতিষ্ঠার এক চিরন্তন শিক্ষালয়। বিদায়ের মুহূর্তে মনে হলো, ইতিহাসের এই নীরব প্রাঙ্গণ আজও অদৃশ্য কণ্ঠে মানবতার এক অনন্ত বার্তা উচ্চারণ করে চলেছে। সেই বার্তা হৃদয়ে ধারণ করেই ফিরে চললাম, সঙ্গে নিয়ে এলাম হে মার্কেটের মাটি থেকে উঠে আসা মানবিক মূল্যবোধ, সংগ্রামের চেতনা এবং শ্রমের মর্যাদার এক অমলিন শিক্ষা।
কেএসকে
What's Your Reaction?

