সঞ্চয়পত্রে নতুন বিনিয়োগের চেয়ে ভাঙছেন বেশি গ্রাহকরা

সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে টানা চার বছর ধরেই সরকার নিট ঋণ নিতে পারছে না। বরং নতুন করে সঞ্চয়পত্র বিক্রির চেয়ে মেয়াদপূর্তি ও আগাম ভাঙানোর কারণে বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে এই খাত থেকে সরকারের প্রত্যাশিত অর্থ আসছে না, উল্টো বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) নিট বিক্রি ঋণাত্মক ৫৫৫ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ, এ সময়ে যত টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি অর্থ সরকারকে পরিশোধ করতে হয়েছে। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সম্প্রতি এ তথ্য জানিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)-এর সচিব আবদুর রহমান খানকে চিঠি পাঠিয়েছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রওশন আরা বেগম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিনিয়োগের হালনাগাদ চিত্র তুলে ধরা হয়। ফেব্রুয়ারিতেও ঋণাত্মক নিট বিক্রি তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্যাংক, সঞ্চয় অধিদপ্তর ও ডাকঘরের মাধ্যমে মোট ৬ হাজার ৪০৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। একই সম

সঞ্চয়পত্রে নতুন বিনিয়োগের চেয়ে ভাঙছেন বেশি গ্রাহকরা

সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে টানা চার বছর ধরেই সরকার নিট ঋণ নিতে পারছে না। বরং নতুন করে সঞ্চয়পত্র বিক্রির চেয়ে মেয়াদপূর্তি ও আগাম ভাঙানোর কারণে বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে এই খাত থেকে সরকারের প্রত্যাশিত অর্থ আসছে না, উল্টো বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) নিট বিক্রি ঋণাত্মক ৫৫৫ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ, এ সময়ে যত টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি অর্থ সরকারকে পরিশোধ করতে হয়েছে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সম্প্রতি এ তথ্য জানিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)-এর সচিব আবদুর রহমান খানকে চিঠি পাঠিয়েছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রওশন আরা বেগম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিনিয়োগের হালনাগাদ চিত্র তুলে ধরা হয়।

ফেব্রুয়ারিতেও ঋণাত্মক নিট বিক্রি

তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্যাংক, সঞ্চয় অধিদপ্তর ও ডাকঘরের মাধ্যমে মোট ৬ হাজার ৪০৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। একই সময়ে আগের কেনা সঞ্চয়পত্র পরিশোধ করা হয়েছে ৭ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।

ফলে শুধু ফেব্রুয়ারিতেই নিট বিক্রি ঋণাত্মক হয়েছে ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ, বিক্রির তুলনায় পরিশোধ বেশি হয়েছে।

জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে মোট ৬১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হলেও পরিশোধ করতে হয়েছে ৬১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। এতে নিট বিক্রি ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫৫ কোটি টাকায়।

আগের তিন বছরেও একই চিত্র

এর আগের তিন অর্থবছরেও সঞ্চয়পত্রে নিট বিক্রি ঋণাত্মক ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ঋণাত্মক ১৭ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকায়।

সবশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকার এ খাত থেকে ইতিবাচক নিট ঋণ পেয়েছিল। ওই বছর ৩২ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সরকার নিট ঋণ নেয় ২০ হাজার ২৬০ কোটি টাকা।

সরকারের ব্যয় বাড়াচ্ছে সুদ

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়লে সরকারের ঋণও বাড়ে। এই ঋণের বিপরীতে সরকারকে তুলনামূলক বেশি সুদ দিতে হয়। ফলে সুদ ব্যয় কমাতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই এ খাত থেকে ঋণ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। মুনাফার হার কমানোসহ নানা পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছিল। যদিও এতে নতুন বিক্রি কিছুটা কমেছে, তবে আগের সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর কারণে মুনাফা বাবদ সরকারের ব্যয় এখনও অনেক বেশি।

আইআরডি সচিব আবদুর রহমান খান বলেন, সঞ্চয়পত্র হোক বা ট্রেজারি বিল-বন্ড দুই ক্ষেত্রেই সরকারকে উচ্চ সুদ দিতে হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ মোট ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার বড় অংশই সঞ্চয়পত্র ও ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে।

বিকল্প পথ ব্যাংকঋণ

সঞ্চয়পত্র থেকে কম অর্থ এলে সরকারকে বিকল্প উৎস থেকে ঋণ নিতে হয়। সবচেয়ে সহজ পথ হয়ে ওঠে ব্যাংকঋণ। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারকে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হয়েছে।

নতুন সরকারের ব্যাংক ঋণ নেওয়ার গতি বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৫২ দিনের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে বর্তমান সরকার। দ্রুত ঋণ বৃদ্ধির ফলে চলতি অর্থবছরের বাজেটে নির্ধারিত ঋণগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রাও এরইমধ্যে অতিক্রম করেছে সরকার।

এবারের বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৮ শতাংশ। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিয়েছে ৬৮ হাজার ২২৯ কোটি টাকা ঋণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার বেশি ব্যাংকঋণ নিলে বেসরকারি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা ঋণ কম পান। এতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়, কর্মসংস্থান কমে যায় এবং সামগ্রিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি শ্লথ হয়ে পড়ে।

ইএআর/এসএনআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow