সন্তানের স্বাস্থ্য নিয়ে অযাচিত মন্তব্য, বাড়ছে মায়েদের মানসিক চাপ
নাজিফা রাসেল স্বপ্না শিশু দেখলেই অনেকের মুখে একটি প্রশ্ন শোনা যায়-‘এত চিকন কেন ?’, ‘কিছু খাওয়াও না নাকি?’, ‘এই বয়সে এত রোগা হওয়া তো স্বাভাবিক নয়!’। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা পরিচিতদের এমন মন্তব্য আমাদের সমাজে খুবই সাধারণ। অনেকেই মনে করেন, একটি শিশুর মোটা বা চিকন শরীরই তার সুস্থতা বা অসুস্থতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন মা তার সন্তানের স্বাস্থ্য নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত থাকেন। শিশুর জ্বর, কাশি, বমি, খাবারে অনীহা কিংবা ছোটখাটো অসুস্থতায় তার রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। কখন ডাক্তার দেখাবেন, কী খাওয়াবেন, ওষুধে কাজ হচ্ছে কি না-এসব ভাবনায় তিনি সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন। এমন সময়ে যদি কেউ সন্তানের শারীরিক গঠন নিয়ে কটূক্তি করেন, তাহলে সেই মায়ের মানসিক চাপ আরও বেড়ে যায়। আমাদের একটি ভুল ধারণা হলো-মোটা শিশু মানেই সুস্থ, আর চিকন শিশু মানেই অসুস্থ। কিন্তু শুধু শরীরের গঠন দেখে কোনো শিশুর স্বাস্থ্য বিচার করা যায় না। একটি শিশু স্বাভাবিকভাবে খেলাধুলা করছে কি না, বয়স অনুযায়ী বেড়ে উঠছে কি না, খাওয়া-দাওয়া করছে, ঘুমাচ্ছে, হাসছে, কথা বলছে, নতুন কিছু শিখছে এবং সারাদিন
নাজিফা রাসেল স্বপ্না
শিশু দেখলেই অনেকের মুখে একটি প্রশ্ন শোনা যায়-‘এত চিকন কেন ?’, ‘কিছু খাওয়াও না নাকি?’, ‘এই বয়সে এত রোগা হওয়া তো স্বাভাবিক নয়!’। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা পরিচিতদের এমন মন্তব্য আমাদের সমাজে খুবই সাধারণ। অনেকেই মনে করেন, একটি শিশুর মোটা বা চিকন শরীরই তার সুস্থতা বা অসুস্থতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
একজন মা তার সন্তানের স্বাস্থ্য নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত থাকেন। শিশুর জ্বর, কাশি, বমি, খাবারে অনীহা কিংবা ছোটখাটো অসুস্থতায় তার রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। কখন ডাক্তার দেখাবেন, কী খাওয়াবেন, ওষুধে কাজ হচ্ছে কি না-এসব ভাবনায় তিনি সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন। এমন সময়ে যদি কেউ সন্তানের শারীরিক গঠন নিয়ে কটূক্তি করেন, তাহলে সেই মায়ের মানসিক চাপ আরও বেড়ে যায়।
আমাদের একটি ভুল ধারণা হলো-মোটা শিশু মানেই সুস্থ, আর চিকন শিশু মানেই অসুস্থ। কিন্তু শুধু শরীরের গঠন দেখে কোনো শিশুর স্বাস্থ্য বিচার করা যায় না। একটি শিশু স্বাভাবিকভাবে খেলাধুলা করছে কি না, বয়স অনুযায়ী বেড়ে উঠছে কি না, খাওয়া-দাওয়া করছে, ঘুমাচ্ছে, হাসছে, কথা বলছে, নতুন কিছু শিখছে এবং সারাদিন চঞ্চল ও প্রাণবন্ত আছে কি না-এসব বিষয়ই তার সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।
শিশুদের শারীরিক গঠন একেকজনের একেক রকম হয়। যেমন-পরিবারের সদস্যদের উচ্চতা, গড়ন বা শারীরিক বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য থাকে, তেমনি শিশুদের ক্ষেত্রেও বংশগত প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কেউ স্বাভাবিকভাবেই একটু মোটাসোটা হয়, আবার কেউ হয় পাতলা গড়নের। তাই শুধু ওজন বা শরীরের আকৃতি দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া ঠিক নয়।
শিশুর সুস্থতায় ওজনের চেয়ে তার হাসি ও প্রাণচাঞ্চল্যেই বেশি প্রয়োজন
অনেকেই মনে করেন, বেশি খাওয়ালে শিশু দ্রুত মোটা হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে শিশুর শারীরিক গঠন শুধু খাবারের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না। বংশগত বৈশিষ্ট্য, বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম), হরমোন, দৈহিক কার্যকলাপ, ঘুম, সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং বিভিন্ন শারীরিক কারণও এর সঙ্গে জড়িত। একই ধরনের খাবার খেয়েও দুটি শিশুর শারীরিক গঠন সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।
আবার অনেক শিশু পরিমাণে কম খেলেও সারাদিন দৌড়ঝাঁপ করে, খেলাধুলা করে, হাসিখুশি থাকে এবং স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে। অন্যদিকে কোনো শিশু মোটাসোটা হলেও তার পুষ্টিগত সমস্যা বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত জটিলতা থাকতে পারে। তাই শুধু চোখে দেখে স্বাস্থ্য সম্পর্কে মন্তব্য করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, সন্তানের স্বাস্থ্য নিয়ে করা মন্তব্যগুলো অনেক সময় সরাসরি মায়ের দিকে আঙুল তোলে। ‘ঠিকমতো খাওয়াতে পারো না?’, ‘যত্ন নিলে এমন হতো না’-এসব কথা একজন মায়ের মনে অযথা অপরাধবোধ তৈরি করে। অথচ একজন মা-ই জানেন, সন্তানের এক বেলা খাবার খাওয়াতে, অসুস্থ রাতে জেগে থাকতে কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে তাকে কতটা পরিশ্রম করতে হয়।
শিশুর বৃদ্ধি মূল্যায়নের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত
একটি শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ থাকলে তার সমাধান কটূক্তি নয়, প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। কারণ শিশুর বৃদ্ধি ও ওজন মূল্যায়নের জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে, যা চিকিৎসক শিশুর বয়স, উচ্চতা, ওজন এবং সার্বিক শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে বিচার করেন। সাধারণ মানুষের অনুমান সব সময় সঠিক নাও হতে পারে।
একজন মায়ের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সমালোচনা নয়, সহযোগিতা ও মানসিক সমর্থন। সন্তানের স্বাস্থ্য নিয়ে অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য না করে যদি কেউ বলেন, ‘চিন্তা করবেন না, প্রয়োজনে পাশে আছি’-তবে সেটিই একজন মায়ের জন্য অনেক বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. অর্পিত গুপ্ত তার ইনস্টাগ্রাম ভিডিওতে জানান, মোটা শিশু সুস্থ আর চিকন শিশু মানেই দুর্বল-এটি সম্পূর্ণ একটি ভ্রান্ত ধারণা। একটি শিশুর স্বাস্থ্য তার শরীরের আকার দিয়ে নয়, সে কতটা সক্রিয়, বয়স অনুযায়ী বিকাশের ধাপ পূরণ করছে কি না এবং গ্রোথ চার্ট অনুযায়ী বেড়ে উঠছে কি না সেদিক মূল্যায়ন করা উচিত।
অনেক শিশু জন্মগতভাবেই চিকন গড়নের হয় বা তাদের বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) বেশি থাকে। তাই শিশুটি যদি খেলাধুলা করে, প্রাণবন্ত থাকে এবং স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে, তাহলে শুধু চিকন হওয়ার কারণে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।

প্রিয় খাবার দেখলেই কেন জিভে পানি আসে
আমরা যেন ভুলে না যাই, শিশুর স্বাস্থ্য কেবল তার শরীরের আকারে সীমাবদ্ধ নয়। তার হাসি, প্রাণচাঞ্চল্য, বিকাশ, খেলাধুলা, শেখার আগ্রহ এবং চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ-এসব মিলিয়েই একটি শিশুর সুস্থতার প্রকৃত ছবি ফুটে ওঠে। তাই কোনো শিশুকে দেখে তার ওজন নিয়ে মন্তব্য করার আগে একবার ভাবুন। আপনার একটি অসাবধানী মন্তব্য হয়তো একজন মায়ের মনে অযথা কষ্ট ও অপরাধবোধ তৈরি করতে পারে। শিশুকে তার শরীর দিয়ে নয়, তার সুস্থ বিকাশ দিয়েই মূল্যায়ন করা উচিত।
এসএকেওয়াই
What's Your Reaction?
