সবুজের ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া পাহাড়ি জনপদ
চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট এক জনপদ। একসময় যেখানে জীবিকার প্রধান ভরসা ছিল দিনমজুরি, বন থেকে লাকড়ি কুড়িয়ে আনা কিংবা বাঁশ-বেতের কাজ- সেই জায়গাটিই আজ বদলে গেছে সবুজে মোড়া এক সম্ভাবনার মাঠে। পাহাড়ের ঢালে ঢালে এখন সারি সারি পানের বরজ। বদলে গেছে মানুষের জীবন, বদলে গেছে পুরো একটি অর্থনীতির চিত্র। কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সবচেয়ে ছোট ইউনিয়ন শিলখালী। আয়তন মাত্র ৭ দশমিক ৮৭ বর্গকিলোমিটার, যার অন্তত ৬৫ শতাংশই পাহাড়ি এলাকা। তিন দশক আগেও এই জনপদের অধিকাংশ মানুষের আয় ছিল অনিয়মিত ও অনিশ্চিত। কিন্তু গত প্রায় ৩০ বছরে পান চাষ এই এলাকার অর্থনীতিতে নিয়ে এসেছে বড় পরিবর্তন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, বর্তমানে শিলখালীতে ৬৭ একর জমিতে গড়ে উঠেছে পাঁচ শতাধিক পানের বরজ। এসব বরজ থেকে বছরে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ৩১২ মেট্রিক টন পান। সরাসরি এই চাষের সঙ্গে যুক্ত অন্তত ৫০০ কৃষক, আর এ খাত ঘিরে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় তিন হাজার মানুষের। ইউনিয়নের প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস এখন এই পান চাষ। শুধু উৎপাদনই নয়, এর প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনে। শিলখালীর বাসিন্দা জাহানারা বেগমের গল্প সেই পরিবর্তনেরই প্রতিচ
চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট এক জনপদ। একসময় যেখানে জীবিকার প্রধান ভরসা ছিল দিনমজুরি, বন থেকে লাকড়ি কুড়িয়ে আনা কিংবা বাঁশ-বেতের কাজ- সেই জায়গাটিই আজ বদলে গেছে সবুজে মোড়া এক সম্ভাবনার মাঠে। পাহাড়ের ঢালে ঢালে এখন সারি সারি পানের বরজ। বদলে গেছে মানুষের জীবন, বদলে গেছে পুরো একটি অর্থনীতির চিত্র।
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সবচেয়ে ছোট ইউনিয়ন শিলখালী। আয়তন মাত্র ৭ দশমিক ৮৭ বর্গকিলোমিটার, যার অন্তত ৬৫ শতাংশই পাহাড়ি এলাকা। তিন দশক আগেও এই জনপদের অধিকাংশ মানুষের আয় ছিল অনিয়মিত ও অনিশ্চিত। কিন্তু গত প্রায় ৩০ বছরে পান চাষ এই এলাকার অর্থনীতিতে নিয়ে এসেছে বড় পরিবর্তন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, বর্তমানে শিলখালীতে ৬৭ একর জমিতে গড়ে উঠেছে পাঁচ শতাধিক পানের বরজ। এসব বরজ থেকে বছরে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ৩১২ মেট্রিক টন পান। সরাসরি এই চাষের সঙ্গে যুক্ত অন্তত ৫০০ কৃষক, আর এ খাত ঘিরে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় তিন হাজার মানুষের। ইউনিয়নের প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস এখন এই পান চাষ। শুধু উৎপাদনই নয়, এর প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনে।
শিলখালীর বাসিন্দা জাহানারা বেগমের গল্প সেই পরিবর্তনেরই প্রতিচ্ছবি। একসময় বাঁশ-বেত দিয়ে ঝুড়ি আর মোড়া বানিয়ে সংসার চালাতেন তিনি। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। এখন পরিবারের সবাই মিলে পান চাষ করেন।
হাসিমুখে তিনি বলেন, আগে কষ্ট ছিল, এখন আল্লাহর রহমতে অভাব নেই। ছেলেটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, মেয়েও কলেজে।
দিলফুরুজ আকতারের জীবনেও এসেছে একই রকম পরিবর্তন। আগে বান্দরবানের পাহাড় থেকে ঝাড়ু ফুল এনে ঝাড়ু তৈরি করতেন। এখন সেই পেশা ছেড়ে এক একর জমিতে পান চাষ করছেন। তার ভাষায়, এই চাষেই এখন ভালোভাবে সংসার চলে।
স্থানীয় যুবক বেলাল মোহাম্মদের গল্প আরও এক ধাপ এগিয়ে। একসময় বেকার ছিলেন, কখনো বন থেকে গাছ কেটে বিক্রি করতেন। এখন তিন বছর ধরে পান চাষ করছেন। তিনি বলেন, এই চাষই আমার জীবন ঘুরিয়ে দিয়েছে।
এমন গল্প শিলখালীর প্রায় প্রতিটি পরিবারেই। পান চাষ শুধু আয়ের উৎস নয়, এটি হয়ে উঠেছে সামাজিক পরিবর্তনেরও চালিকাশক্তি। অনেক পরিবার এখন তাদের সন্তানদের স্কুল-কলেজে পাঠাতে পারছে নিয়মিতভাবে। শিলখালীর পানের আরেকটি বিশেষ দিক হলো এর বাজারব্যবস্থা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সপ্তাহে দুই দিন বসে পানের হাট- মঙ্গলবার জারুলবনিয়া স্টেশন এলাকায়, আর শুক্রবার কাছারীমোড়ায়। ভোর ছয়টা থেকে শুরু হয়ে সকাল নয়টা পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। এই অল্প সময়েই জমে ওঠে বড় আকারের লেনদেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, স্থানীয় চাষিরা ঝুড়িভর্তি পান নিয়ে হাজির হন। চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পাইকাররা সেই পান কিনে নিয়ে যান। পরে ছোট ট্রাকে করে সেগুলো পাঠানো হয় আড়তে।
পান ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম জানান, শিলখালীর পান স্বাদে মিষ্টি, তাই চাহিদা বেশি। নিয়মিত চট্টগ্রামের আড়তে যায়।
পেকুয়ার এক দোকানি নজরুল ইসলাম বলেন, প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৮০০ বিড়া পান কিনি। এই পানের চাহিদা সবসময় থাকে।
চাষিরা জানান, এক একর জমিতে পানের বরজ তৈরি করতে খরচ হয় পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা। তবে একবার বরজ তৈরি হলে তা টিকে থাকে ১০ থেকে ১২ বছর। বীজ লাগানোর এক মাস পর থেকেই সপ্তাহে অন্তত দুইবার পান সংগ্রহ করা যায়। রোগবালাই না থাকলে বছরে ছয় থেকে সাত লাখ টাকার পান উৎপাদন সম্ভব। বাজারদর ওঠানামা করলেও সাধারণত এক বিড়া পান বিক্রি হয় ১২০ থেকে ২০০ টাকায়। সপ্তাহে দুই হাট মিলিয়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকার পান বিক্রি হয়। সে হিসাবে বছরে এই ইউনিয়ন থেকে প্রায় ১৫ কোটি ৬০ লাখ টাকার পান বেচাকেনা হচ্ছে।
জারুলবনিয়া পানবাজারের উদ্যোক্তা আবদুল হাকিম বলেন, আগে চাষিরা দূরে দূরে গিয়ে পান বিক্রি করতেন। এখন নির্দিষ্ট বাজার থাকায় পরিবহন খরচ কমেছে, লাভ বেড়েছে।
তবে এই সাফল্যের মধ্যেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কাছারীমোড়া এলাকায় রাস্তার ওপরই বসে পানের হাট, ফলে চলাচলে সমস্যা হয়।
ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শেখ ফরিদুল আলম জানান, নির্দিষ্ট বাজারের জন্য তারা উদ্যোগ নিচ্ছেন।
তার মতে, সব মিলিয়ে, পাহাড়ঘেরা ছোট্ট এই ইউনিয়নের গল্প এখন আর কেবল সংগ্রামের নয়। এটি এক বদলে যাওয়ার গল্প- যেখানে সবুজ পানের লতায় জড়িয়ে আছে মানুষের স্বপ্ন, পরিশ্রম আর নতুন সম্ভাবনার পথ।
কৃষি বিভাগ বলছে, আগে পান চাষকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হতো। কিন্তু এখন কৃষকেরা অনেক বেশি দক্ষ।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অপরূপ দে বলেন, কৃষকেরা এখন নিজেরাই রোগ শনাক্ত করতে পারেন, প্রতিকারও নিতে পারেন। ফলে উৎপাদন বাড়ছে।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব আলম মাহবুবের মতে, পান চাষ শুধু অর্থনীতিই বদলায়নি, বদলেছে সামাজিক অবস্থাও।
তিনি বলেন, এখানে এখন আয় বেড়েছে, শিশুরা বেশি স্কুলমুখী হচ্ছে। উপজেলার মধ্যে শিলখালীতেই শিক্ষার হার সবচেয়ে বেশি- প্রায় ৫০ দশমিক ১ শতাংশ।
What's Your Reaction?