সিলেটের বিয়ানীবাজারে শাহজালাল সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডের টাকা আত্মসাৎ করে প্রতিষ্ঠান প্রধান আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মান্নান মিন্টু পালিয়ে গেছেন। তিনি লাপাত্তা হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগে নতুন মোড় নিয়েছে পরিস্থিতি। এ ঘটনায় সমিতির দুই কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সোমবার (১৪ জুলাই) সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল কবির।
গ্রেপ্তার দুই কর্মকর্তা হচ্ছেন- বিয়ানীবাজার উপজেলার মাথিউরা ইউনিয়নের মাথিউরা দুধবকশী গ্রামের মৃত আতাউর রহমানের মেয়ে খালেদা বেগম এবং বিয়ানীবাজার পৌরসভার নয়াগ্রামের সিরাজ উদ্দিনের ছেলে খয়রুল ইসলাম। এর মধ্যে খালেদা বেগম সমিতির ক্যাশিয়ার ও খয়রুল ইসলাম রিসিপশনিস্ট হিসেবে কর্মরত বলে জানা গেছে।
তাহেরা পারভীন শেফা নামে এক ভুক্তভোগীর করা মামলায় পৌর এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। মামলায় আব্দুল মান্নান মিন্টু প্রধান আসামি এবং খয়রুল ইসলাম ও খালেদা বেগম ২ ও ৩ নম্বর এজাহারনামীয় আসামি।
জানা যায়, পৌরশহরের কলেজ রোডে প্রতিষ্ঠিত এ সমিতি কয়েক বছরের মধ্যে বিয়ানীবাজারসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার হাজার হাজার গ্রাহক সংগ্রহ করে। ভুক্তভোগীদের দাবি, অধিক মুনাফা ও আকর্ষণীয় লাভাংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করা হয়। শুরুতে নিয়মিত লাভাংশ পরিশোধ করলেও পরবর্তীতে নানা অজুহাতে অর্থ ফেরত দেওয়া বন্ধ করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
অভিযোগ রয়েছে, গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে সমিতির কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। এরপর থেকে আমানতকারীরা বারবার অফিসে গেলেও তাদের জমা টাকা কিংবা প্রতিশ্রুত লাভাংশ ফেরত পাননি। অনেক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, টাকা চাইতে গেলে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি কয়েকজনকে মারধরেরও শিকার হতে হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, তাদের মধ্যে কেউ কেউ জীবনভর সঞ্চিত অর্থ, আবার কেউ জমি বিক্রির টাকা কিংবা প্রবাস থেকে পাঠানো অর্থ এই সমিতিতে বিনিয়োগ করেছিলেন। ফলে টাকা ফেরত না পেয়ে অনেক পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে।
মামলার বাদী তাহেরা পারভীন শেফা বলেন, ‘এক প্রতিবন্ধী বোন ও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছি। কষ্টার্জিত টাকা মিন্টু স্যারের কথায় শাহজালাল সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতিতে ডিপোজিট করেছিলাম। বিগত দুই বছর থেকে সেই টাকা পাওয়ার আশায় বারবার অফিসে ধর্না দিয়েও মিলেনি। অনেকটা বাধ্য হয়েই আমি কোর্টে মামলা করেছি।’
তিলপাড়া ইউনিয়নের দাসউরা গ্রামের ভুক্তভোগী সিদ্দিক আহমদ বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে সৌদে ছিলাম। সেখানে অবস্থানকালীন সময়ে শাহজালাল সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডে ৭-৮ লাখ টাকা সঞ্চয় করি। ভেবেছিলাম, দেশে ফিরে লাভাংশসহ মূল অর্থ দিয়ে ঘরবাড়ি নির্মাণ ও বৈবাহিক কাজ সম্পন্ন করব। দেশে ফিরে তাদের অফিসে অনেকবার গিয়েও টাকা পাইনি। বরং তারা আমাকে মারধর করে মাথা ফাটিয়ে বিদায় দিয়েছে।’
একই ইউনিয়নের আরও দুই ভুক্তভোগী হচ্ছেন জসিম উদ্দিন ও জয়নুল ইসলাম। তারা বলেন, ‘বিগত প্রায় দেড় বছর ধরে আব্দুল মান্নান মিন্টু ও তার অফিসের কর্মকর্তাদের পেছনে ঘুরে ২/৩ বার ৫০০/১০০০ টাকা করে পেয়েছি। কিন্তু মূলধনের দেখা নেই। আমরা এই সমিতিতে সঞ্চয় করে নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমরা বার বার তাদের অফিসে গিয়ে আশ্বাস আর হুমকি-ধমকি ও গালিগালাজ শুনেছি।’
এ বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল মান্নান মিন্টুর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এদিকে, দুই কর্মকর্তা গ্রেপ্তারের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা বলছেন, শুধু কর্মকর্তা নয়, অভিযোগের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং আমানতকারীদের অর্থ দ্রুত ফেরতের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
বিয়ানীবাজার থানার ওসি আবু জাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল কবির বলেন, একজন ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলায় দুই কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধান আসামিসহ অন্যদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রমও চলমান। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।