সাইকেলের ঘণ্টায় জেগে ওঠা এক গ্রাম

ফজরের আজান শেষে আরেকটি শব্দের অপেক্ষা করে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চরটেকি গ্রামের সকাল। সেটি পাখির ডাক নয়, কোনো হাটের কোলাহলও নয়, সেটি সাইকেলের ঘণ্টা। একটি ঘণ্টা বাজে, তারপর আরেকটি, তারপর আরও কয়েকটি। কয়েক মিনিটের মধ্যে মনে হয়, অদৃশ্য কোনো সুরকার যেন গ্রামের সরু পথজুড়ে ধাতব শব্দের একটি অর্কেস্ট্রা সাজিয়ে দিয়েছেন। ধানের শীষ বাতাসে দুলতে থাকে। শিশিরভেজা ঘাসের পাশ দিয়ে এগিয়ে যায় একের পর এক সাইকেল। সূর্যের আলো প্রথমে পড়ে হ্যান্ডেলের ক্রোমে, তারপর মেয়েদের চোখে। তাদের কারো মুখে তাড়া নেই, কিন্তু থামারও সময় নেই। কারণ তারা জানে, এই পথ শুধু বিদ্যালয়ের দিকে যায় না, এই পথ যায় এমন এক ভবিষ্যতের দিকে, যেখানে একটি মেয়ের পরিচয় শুধু কারো মেয়ে, বোন বা স্ত্রী হয়ে থাকবে না, সে নিজের পরিচয় নিজেই লিখবে। এই গ্রামের মানুষ একসময় মেয়েদের সাইকেল চালানো দেখে থমকে দাঁড়াত। আজ তারা দাঁড়িয়ে থাকে শুধু দেখার জন্য নয়, গর্ব করার জন্য। আরও পড়ুন বগুড়া জিলা স্কুল / ১৭৩ বছরের গৌরবের আড়ালে ধুঁকছে মেধার বাতিঘর চরটেকি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে প্রতিদিন প্রায় ১৬০টি সাইকেল এসে থ

সাইকেলের ঘণ্টায় জেগে ওঠা এক গ্রাম

ফজরের আজান শেষে আরেকটি শব্দের অপেক্ষা করে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চরটেকি গ্রামের সকাল। সেটি পাখির ডাক নয়, কোনো হাটের কোলাহলও নয়, সেটি সাইকেলের ঘণ্টা।

একটি ঘণ্টা বাজে, তারপর আরেকটি, তারপর আরও কয়েকটি। কয়েক মিনিটের মধ্যে মনে হয়, অদৃশ্য কোনো সুরকার যেন গ্রামের সরু পথজুড়ে ধাতব শব্দের একটি অর্কেস্ট্রা সাজিয়ে দিয়েছেন।

ধানের শীষ বাতাসে দুলতে থাকে। শিশিরভেজা ঘাসের পাশ দিয়ে এগিয়ে যায় একের পর এক সাইকেল। সূর্যের আলো প্রথমে পড়ে হ্যান্ডেলের ক্রোমে, তারপর মেয়েদের চোখে। তাদের কারো মুখে তাড়া নেই, কিন্তু থামারও সময় নেই। কারণ তারা জানে, এই পথ শুধু বিদ্যালয়ের দিকে যায় না, এই পথ যায় এমন এক ভবিষ্যতের দিকে, যেখানে একটি মেয়ের পরিচয় শুধু কারো মেয়ে, বোন বা স্ত্রী হয়ে থাকবে না, সে নিজের পরিচয় নিজেই লিখবে।

সাইকেলের ঘণ্টায় জেগে ওঠা এক গ্রাম

এই গ্রামের মানুষ একসময় মেয়েদের সাইকেল চালানো দেখে থমকে দাঁড়াত। আজ তারা দাঁড়িয়ে থাকে শুধু দেখার জন্য নয়, গর্ব করার জন্য।

চরটেকি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে প্রতিদিন প্রায় ১৬০টি সাইকেল এসে থামে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, যেন বিদ্যালয়ের দেওয়ালের পাশে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে ১৬০টি অসমাপ্ত গল্প। প্রতিটি সাইকেলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের সাহস, একজন বাবার সিদ্ধান্ত, একজন মায়ের ভরসা আর একটি মেয়ের নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরে পাওয়ার ইতিহাস।

যে পথ একসময় ছিল ভয় আর সংকোচের

কিশোরগঞ্জের ১৯৯৩ সালে পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের চরটেকি গ্রামে প্রায় এক একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় চরটেকি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ। বর্তমানে এখানে চার শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১৬০ জন নিয়মিত সাইকেলে বিদ্যালয়ে আসে।

চরকাওনা, বারোঘর, নয়াপাড়া, ব্রাহ্মণচর, বেলতলি, মধ্যপাড়া, মহিষাকান্দি, নতুনবাজারসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তারা বিদ্যালয়ে পৌঁছায়। তবে এই দৃশ্য একদিনে তৈরি হয়নি। প্রথমদিকে মেয়েদের সাইকেল চালিয়ে রাস্তায় বের হওয়া নিয়ে ছিল নানা কটূক্তি, বাঁকা দৃষ্টি, সামাজিক সংকীর্ণতা, এমনকি ইভটিজিংও। অনেক পরিবার মেয়েদের সাইকেল কিনে দিতেও দ্বিধা করত। সময়ের সঙ্গে সেই দৃশ্য বদলেছে। যে গ্রামে একসময় মেয়েদের সাইকেল চালানো নিয়ে প্রশ্ন উঠত, আজ সেই গ্রামই তাদের নিয়ে গর্ব করে।

বদলে যাওয়া আত্মবিশ্বাসের গল্প

দশম শ্রেণির পরীক্ষার্থী মাহিয়া ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে বিদ্যালয়ে এসেছে। এখন সে স্কুটিতে চলাচল করলেও তার আত্মবিশ্বাসের শুরু হয়েছিল একটি সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরেই।

মাহিয়া বলে, সাইকেল চালাতে শুরু করার পর নিজের ওপর অনেক বেশি বিশ্বাস জন্মেছে। আগে একা কোথাও যেতে ভয় লাগত, এখন নিজের কাজ নিজেই করতে পারি। প্রতিদিন প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে আসতে আমার আর কোনো সংকোচ হয় না।

তবে সে জানায়, বিদ্যালয়ের শেষ প্রায় ৬০০ মিটার রাস্তা এখনো কাঁচা। বর্ষা মৌসুমে কাদা ও জলাবদ্ধতার কারণে চলাচল অনেক কষ্টকর হয়ে পড়ে।

স্বপ্নের পথে এখনো বাধা

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আফরিন প্রতিদিন জাঙ্গালিয়া কাজীহাটি গ্রাম থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। তার ভাষায়, ‘এখনো মাঝে মধ্যে ইভটিজিংয়ের মুখোমুখি হতে হয়। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হলে আরও বেশি মেয়ে সাইকেল চালিয়ে বিদ্যালয়ে আসতে উৎসাহ পাবে।’

সাইকেলের ঘণ্টায় জেগে ওঠা এক গ্রাম

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সিনথিয়ারা মৌ জানায়, বারোঘর গ্রামের পর বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযোগ সড়কের একটি অংশ সাইকেল চলাচলের উপযোগী নয়। ফলে অনেক ছাত্রী স্থানীয় একটি বাড়িতে সাইকেল রেখে বাকি পথ হেঁটে বিদ্যালয়ে যায়। তাদের দাবি, দ্রুত সড়কটি সংস্কার করা হোক।

বদলেছে সমাজের মানসিকতা

প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে আমাদের প্রতিষ্ঠানে চার শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৬০ জন নিয়মিত সাইকেল চালিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। শুরুতে কিছু সামাজিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও এখন অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। মেয়েদের এই আত্মবিশ্বাসই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। আজ অনেকেই আমাদের প্রতিষ্ঠানকে ‘সাইকেল বালিকাদের বিদ্যালয়’ নামে চেনে। এই পরিচয় আমাদের গর্বিত করে।

পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ইলিয়াস উদ্দিন চুন্নু বলেন, এই বিদ্যালয় এখন নারী শিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নের প্রতীক হয়ে উঠেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে আরও বেশি শিক্ষার্থী সাইকেল ব্যবহার করতে পারবে।

স্থানীয় প্রবীণ নূর হোসেন মনে করেন, এই পরিবর্তন শুধু বিদ্যালয়ের নয়, পুরো গ্রামের। তিনি বলেন, এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেখিয়ে দিয়েছে, ইচ্ছাশক্তি থাকলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলানো যায়। শুরুতে নানা বাধা ছিল, কিন্তু আজ এলাকার মানুষ তাদের পাশে আছে। আমাদের গ্রাম এখন অনেকের কাছে ‘সাইকেল বালিকাদের বিদ্যালয়ের গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত। এটা আমাদের গর্ব।

সমাজ সংস্কারক রাশেদা খাতুন বলেন, বর্তমান সময়ে মেয়েদের নিরাপদ যাতায়াত একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেই বাস্তবতায় গ্রামের মেয়েরা সাইকেল চালিয়ে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, এটি অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ। তাদের এই সাহস অন্য মেয়েদেরও আত্মবিশ্বাস জোগাবে। প্রশাসন, অভিভাবক এবং সমাজের সবার উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো।

প্রশাসনের দৃষ্টিতেও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রূপম দাস বলেন, গ্রামীণ জনপদে মেয়েদের সাইকেল চালিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। এটি শুধু যাতায়াত সহজ করছে না, তাদের আত্মবিশ্বাস ও শিক্ষায় অংশগ্রহণও বাড়াচ্ছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।

চরটেকি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন শুধু বিদ্যালয়ের পথে ছুটে যায় না, তারা বদলে দিচ্ছে একটি গ্রামের সামাজিক মানসিকতাও। যে সমাজ একসময় মেয়েদের চলার পথে প্রশ্ন তুলত, সেই সমাজই আজ তাদের এগিয়ে যাওয়ার গল্প বলে।

তবে এই সাফল্যের মাঝেও কাঁচা রাস্তা, বর্ষার জলাবদ্ধতা এবং কিছু এলাকায় নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা এখনো রয়ে গেছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রত্যাশা, এসব সমস্যা দূর হলে আরও অনেক মেয়ে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরবে।

চরটেকির এই গল্প দেখিয়ে দেয়, কখনো কখনো একটি সাইকেল কেবল দুই চাকার যান নয়, এটি হতে পারে আত্মবিশ্বাসের প্রথম পাঠ, স্বাধীনতার প্রথম পদক্ষেপ এবং একটি গ্রামের সামাজিক পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক।

সাইকেলের ঘণ্টায় জেগে ওঠা এক গ্রাম

বিকেলের শেষ আলোয় আবারো সারি বেঁধে সাইকেলে চড়ে বাড়ির পথে রওনা দেয় মেয়েরা। গ্রামের সরু পথ ধরে একে একে মিলিয়ে যায় তাদের চাকার শব্দ।

তারা হয়ত প্রতিদিনের মতোই শুধু বাড়ি ফিরছে, কিন্তু অজান্তেই বদলে দিচ্ছে একটি গ্রামের মানসিকতা। এখানে প্রতিটি সাইকেল শুধু একজন শিক্ষার্থীকে নয়, বহন করে একটি স্বপ্ন, একটি সাহস আর বদলে যাওয়া আগামীকে।

এফএ/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow