সিলেটে আলোচিত ‘ট্রিপল মার্ডার’, প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়েই হামলা চালান বাবুল!
সিলেটে নিজ বাসায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহপরিচালিকা তাহমিনা হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আটক বাবুল মিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে নগরের রায়নগর মিতালী এলাকার একটি খালি জায়গা ও ঝোপঝাড়ে তল্লাশি চালিয়ে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার ছোরাটিতে রক্তের দাগের মতো চিহ্ন পাওয়া গেছে ও এটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এদিকে নিহত আব্দুস সাত্তারের ২ মেয়ে ও মেয়ের জামাই দেশে এসে মরদেহ ময়নাতদন্তের পর গ্রহণ করেছেন। কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। আসামি বাবুল মিয়াকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের পেছনে গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সঙ্গে বাবুল মিয়ার সম্পর্কের বিষয়টি যেমন খতিয়ে দেখা হচ্ছে, তেমনি ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত বিষয় ও জমিজমা-সংক্রান্ত কোনো বিরোধ ছিল কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ ও এর পেছনের প্রেক্ষাপট অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (
সিলেটে নিজ বাসায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহপরিচালিকা তাহমিনা হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আটক বাবুল মিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে নগরের রায়নগর মিতালী এলাকার একটি খালি জায়গা ও ঝোপঝাড়ে তল্লাশি চালিয়ে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার ছোরাটিতে রক্তের দাগের মতো চিহ্ন পাওয়া গেছে ও এটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে নিহত আব্দুস সাত্তারের ২ মেয়ে ও মেয়ের জামাই দেশে এসে মরদেহ ময়নাতদন্তের পর গ্রহণ করেছেন। কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। আসামি বাবুল মিয়াকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের পেছনে গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সঙ্গে বাবুল মিয়ার সম্পর্কের বিষয়টি যেমন খতিয়ে দেখা হচ্ছে, তেমনি ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত বিষয় ও জমিজমা-সংক্রান্ত কোনো বিরোধ ছিল কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ ও এর পেছনের প্রেক্ষাপট অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
পুলিশ জানায়, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পূর্বপরিচিত হওয়ায় বুধবার বাবুল মিয়া ওই বাড়িতে যান। দরজায় নক করলে গৃহকর্মী তাহমিনা দরজা খুলে তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেন। পরে একটি কক্ষে গিয়ে তাহমিনার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতে চান। কিন্তু তাহমিনা সেই সম্পর্কে অমত প্রকাশ করলে তার কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বাবুল মিয়া ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করেন। এ সময় সুরাইয়া এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয় এবং একপর্যায়ে তাকেও ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থলে তিনজনকে হত্যার পর বাবুল মিয়া বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যান। পরে তিনি রায়নগর এলাকায় নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। পুলিশের গঠিত বিশেষ টিমের সদস্যরা সেখানে গিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করেন এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটিও উদ্ধার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে আসামি জানিয়েছেন, হত্যার পর তিনি ছুরিটি ধুয়ে ফেলেছিলেন। তবে ধাতব বস্তুতে রক্ত লেগে থাকলে যে ধরনের স্থায়ী কালচে দাগ সৃষ্টি হয়, প্রাথমিকভাবে ছুরিটিতে তেমন দাগ পাওয়া গেছে। আলামতটি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।
তিনি আরো বলেন, ঘটনার মূল ঘাতককে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তার দেওয়া তথ্যের সঙ্গে তদন্তে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য ও আলামতের মিলও পাওয়া গেছে। এছাড়া হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত বিষয় কিংবা জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ থাকতে পারে। তবে প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ ও এর পেছনের প্রেক্ষাপট আমাদের কাছে অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে। মামলা দায়েরের পর তদন্ত আরও বিস্তারিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে।
ঘটনাস্থলে ড্রেসিং টেবিলের নিচে কিছু কাগজপত্র পাওয়া গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এগুলো কোনো মূল দলিল নয়; ফটোকপি বা খসড়া কপি হতে পারে। এসব কাগজ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত কি না এবং মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
গৃহপরিচালিকা তাহমিনার সঙ্গে বাবুল মিয়ার সম্পর্কের বিষয়ে সাইফুল ইসলাম বলেন, বাবুল ওই বাসায় রংয়ের কাজ করেছিলেন। তখন তাহমিনার সঙ্গে তার যোগাযোগ বা সম্পর্ক তৈরি হয়। সেটি প্রেমের পর্যায়ে গিয়েছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল জানিয়েছেন, তাহমিনার কোনো আচরণে তিনি কষ্ট পেয়েছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বুধবার ছুরিসহ প্রস্তুতি নিয়ে ওই বাসায় যান। প্রথমে তাহমিনাকে আঘাত করা হয়। পরে সুরাইয়া বেগম রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে আব্দুস সাত্তারকেও হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যান বলে পুলিশকে জানিয়েছে। ওই বারান্দার রেলিংয়ে হাত ও পায়ের ছাপ এবং নিচে রক্তের ছাপ পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এসব আলামতও তদন্তে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
দেশে ফিরছেন বড় ছেলে
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নিহত আব্দুস সাত্তারেরর দুই মেয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। প্রক্রিয়া শেষে সেখান থেকে সরাসরি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে যান। সেখানে তাদের বাবা-মা ও গৃহকর্মীর মরদেহ রাখা রয়েছে। মর্গে পৌঁছেই কান্নায় ভেঙে পড়েন দুই মেয়ে। বাবা-মায়ের মরদেহ দেখে শোকে স্তব্ধ হয়ে যান তারা। পরে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ গ্রহণ করেছেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনজনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। স্বজনরা মরদেহ নিয়ে রায়নগরের বাসায় পৌঁছেছেন। ময়নাতদন্ত শেষে তাদের লাশ পরিবারের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিহত গৃহকর্মী তাহমিনার মরদেহ হযরত মানিক পীর (রহ.) মাজারসংলগ্ন গোসলখানায় গোসল করানো হয়। পরে স্বজনরা তার লাশ নিয়ে সুনামগঞ্জে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। পরে মো. আব্দুস সাত্তার ও সুরাইরা বেগমের লাশ নিয়ে রায়নগরের নিজস্ব বাসভবনে যান।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) মো. আব্দুস সাত্তার ও সুরাইরা বেগমের লাশ দাফন করার কথা রয়েছে বলে জানা গেছে। প্রাথমিকভাবে মানিকপীরে দাফনের কথা থাকলেও আব্দুস সাত্তার দম্পতির বড় ছেলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন নিহতের ছেলে সাবেক ছাত্রদল নেতা আরিফ ইফতেখার। তিনি দেশে ফেরার পর পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে দাফনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নিহত দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে দুই সন্তান লন্ডনে এবং দুই সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন।
মামলার বিষয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, পরিবারের সঙ্গে আমরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি এবং সার্বিক বিষয়ে তাদের সহযোগিতা করছি। এখনো কোনো মামলা দায়ের হয়নি। তারা আইনজীবী ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে কথা বলছেন। আশা করছি, অল্প সময়ের মধ্যে এজাহার দেওয়া হবে। আমরা সেটি মামলা হিসেবে নেব।
কোতোয়ালি থানার ওসি খান মো. ময়নুল জাকির কালবেলাকে বলেন, নিহত আব্দুস সাত্তারের মেয়ে দেশে এসে মরদেহ গ্রহণ করেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে আইনজীবীর মাধ্যমে এজাহার দাখিল করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত বাবুল মিয়াকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়েছে। আগামীকাল নিহত দম্পতির ছেলে দেশে আসার পর মামলা দায়েরের কথা রয়েছে।
দ্রুত বিচার আদালতে বিচার চান সিসিক প্রশাসক
এদিকে তিনজনকে হত্যার প্রতিবাদ এবং আসামির দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করেছে মিতালী আবাসিক এলাকা সমাজকল্যাণ সমিতি ও ১৯ নম্বর ওয়ার্ডবাসী। মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার দাবি করেন।
তিনি বলেন, আব্দুস সাত্তার একজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ও সামাজিকভাবে পরিচিত ব্যক্তি ছিলেন। তার পরিবারের ওপর এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত মর্মান্তিক। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। এ ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তবে আশার বিষয় হলো, ঘটনার অল্প সময়ের মধ্যেই পুলিশ একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এখন এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানাই।
তিনি আরো বলেন, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে আমিও এলাকাবাসীর মতো এ ঘটনার দ্রুত বিচার চাই। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আর কেউ জড়িত আছে কি না, তদন্তের মাধ্যমে তা খুঁজে বের করতে হবে। প্রকৃত অপরাধীরা যেন আইনের আওতায় আসে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
সিসিক প্রশাসক বলেন, দেশে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের দ্রুত বিচারের জন্য দ্রুত বিচার আদালতে মামলা পরিচালনার নজির রয়েছে। আমরা চাই, এই হত্যাকাণ্ডের বিচারও দ্রুত বিচার আদালতের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হোক। একই সঙ্গে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। ঘটনার মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে গ্রেপ্তার করায় সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সদস্যদের ধন্যবাদ জানান তিনি। একই সঙ্গে দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
What's Your Reaction?