সৃজনশীলতায় কোনো লিঙ্গভেদ নেই: রুমা মোদক
রুমা মোদক একাধারে কবি, কথাশিল্পী ও নাট্যকার। লেখালেখি শুরু হয়েছিল কবিতা দিয়ে। পরিচিতি পেয়েছেন মঞ্চনাটকে। ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নির্বিশঙ্ক অভিলাষ’। ধীরে ধীরে মনোনিবেশ করেন মঞ্চনাটকে। ‘কমলাবতীর পালা’, ‘বিভাজন’, ‘জ্যোতিসংহিতা’ তার সফল মঞ্চনাটক। পাশাপাশি অভিনয়ও করেন। একই সঙ্গে ছোটগল্পও লিখছেন। মঞ্চনাটকে অবদানের জন্য একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৭০ সালের ৭ মে হবিগঞ্জে জন্ম নেওয়া রুমা মোদক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে ‘নির্বিশঙ্ক অভিলাষ’, ‘ব্যবচ্ছেদের গল্পগুলি’, ‘প্রসঙ্গটি বিব্রতকর’, ‘গোল’, ‘মুক্তিযুদ্ধের তিনটি নাটক’, ‘অন্তর্গত’ উল্লেখযোগ্য। তার সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি ও গবেষক রত্না মাহমুদা— জাগো নিউজ: আপনার নাট্যচিন্তার মূল উদ্দেশ্য কী—সমাজকে দেখা, নাকি সমাজকে বদলে দেওয়া?রুমা মোদক: শুধু নাট্যরচনা নয়। আমার সমস্ত কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও গন্তব্য মানুষ এবং সমাজ। মানুষকে জানা, সমাজকে জানা। মানুষের কাছে পৌঁছানো, সমাজের কাছে পৌঁছানো। সাধারণ মানুষের ইতিহাসকে সৃষ
রুমা মোদক একাধারে কবি, কথাশিল্পী ও নাট্যকার। লেখালেখি শুরু হয়েছিল কবিতা দিয়ে। পরিচিতি পেয়েছেন মঞ্চনাটকে। ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নির্বিশঙ্ক অভিলাষ’। ধীরে ধীরে মনোনিবেশ করেন মঞ্চনাটকে। ‘কমলাবতীর পালা’, ‘বিভাজন’, ‘জ্যোতিসংহিতা’ তার সফল মঞ্চনাটক। পাশাপাশি অভিনয়ও করেন। একই সঙ্গে ছোটগল্পও লিখছেন। মঞ্চনাটকে অবদানের জন্য একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন।
১৯৭০ সালের ৭ মে হবিগঞ্জে জন্ম নেওয়া রুমা মোদক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে ‘নির্বিশঙ্ক অভিলাষ’, ‘ব্যবচ্ছেদের গল্পগুলি’, ‘প্রসঙ্গটি বিব্রতকর’, ‘গোল’, ‘মুক্তিযুদ্ধের তিনটি নাটক’, ‘অন্তর্গত’ উল্লেখযোগ্য। তার সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি ও গবেষক রত্না মাহমুদা—
জাগো নিউজ: আপনার নাট্যচিন্তার মূল উদ্দেশ্য কী—সমাজকে দেখা, নাকি সমাজকে বদলে দেওয়া?
রুমা মোদক: শুধু নাট্যরচনা নয়। আমার সমস্ত কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও গন্তব্য মানুষ এবং সমাজ। মানুষকে জানা, সমাজকে জানা। মানুষের কাছে পৌঁছানো, সমাজের কাছে পৌঁছানো। সাধারণ মানুষের ইতিহাসকে সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে ধরে রাখা। এতে সমাজ বদলায় কি না জানি না। কিন্তু সমাজ বদলে ফেলার উদ্দেশ্যে আমি লিখি না। শুধু লিখে সমাজ বদলে ফেলা যায় এমনটি আমি ভাবিও না।
জাগো নিউজ: নাটকে নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার—এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
রুমা মোদক: সরাসরি স্লোগান বা অ্যাক্টিভিজম নাটকের কাজ নয়। এতে শিল্পমান ক্ষুন্ন হয় বলে আমার ধারণা। তবে আমি যখন নারীকে প্রাধান্য দিয়ে লিখি; তখন তো নারীর সার্বিক অধিকার, বঞ্চনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। মানুষের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অধিকার নিশ্চিত করা উচিত। তবেই নারীর অধিকারও নিশ্চিত হয়।
জাগো নিউজ: পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর প্রতিরোধ ও স্বরকে কীভাবে চরিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন?
রুমা মোদক: আমি লেখকসত্তার দিক থেকে নিজেকে প্রিভিলেজড মনে করি। কারণ আমি মানুষের কাছাকাছি ছিলাম। বসবাস এবং জীবিকাগত কারণে এবং নিজের আগ্রহের কারণেও আমি প্রান্তিক মানুষের কাছে গিয়েছি। তাদের জীবন ও সংগ্রাম, সংকট আর শক্তির জায়গাটা খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করতে চেয়েছি। বিশেষত নারীর। কী বহুমাত্রিক, কল্পনাতীত সাহস আর সততা সেখানে। অথচ তারা নীতিকথা পড়েননি। তাদের কমিটমেন্ট আর সংগ্রাম একেবারে ইন্সটিংক্ট। আমার লেখায় সব সময় তাদের ধরে রাখতে চেষ্টা করেছি। সব সময়। কেউ নিবিড় পাঠে হয়তো আবিষ্কার করতে পারেন, জীবনের প্রয়োজনে কী বহুমাত্রিক আমার নারীরা। তাদের মানবিক সংকট যতটা দেখেছি, যতটা উপলব্ধি করেছি; ততটা হয়তো ফুটিয়ে তুলতে পারিনি। কিংবা পারার ক্ষমতাও আমার নেই। কিন্তু আমার আগ্রহের জায়গা সেটি। মোটেই লেখক হওয়ার প্রয়োজনগত স্বার্থপরতা নয়। বরং তাদের ব্যক্তি অবস্থানের প্রতি মায়া আর তাদের অসাহায়ত্বের প্রতি মমতা। লেখক হিসেবে ফুটিয়ে তুলতে না পারলেও এই মায়া-মমতার সাথে আমার আজন্ম বসবাসের সাধ মিটবে না।
জাগো নিউজ: সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা আপনার নাটকে কোনভাবে প্রতিফলিত হয়?
রুমা মোদক: নাটক লেখার ক্ষেত্রে আমার স্পষ্ট একটা অবস্থান আছে। আমি আগে থিয়েটার কর্মী পরে নাট্যকার। অর্থাৎ থিয়েটার করার প্রয়োজনে আমি নাটক লিখতে শুরু করেছি। নাট্যকার পরিচিতি পাবার জন্য নয়। আমার দল জীবন সংকেত, হবিগঞ্জের জন্য আমি অধিকাংশ নাটক লিখেছি। এ যাবত বেশিরভাগ নাটক আমি দলের কথা মাথায় রেখে লিখেছি। সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা নাটকে এসেছে শৈল্পিক ভাবে, স্লোগানের মতো নয়। যখন লিখেছি, ভাবতে হয়েছে তা যেন দল মঞ্চায়ন করতে পারে।
জাগো নিউজ: লোকসংস্কৃতি, ইতিহাস বা গ্রামীণ বাস্তবতা থেকে নাট্যউপাদান নির্বাচন কীভাবে করেন?
রুমা মোদক: লোকসংস্কৃতি থেকে নির্বাচন করবো ভেবে তো কিছু নির্বাচন করিনি। যখন যা ভালো লেগেছে, মনে হয়েছে এটা নিয়ে কাজ করতে ভালো লাগবে, করেছি। লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন মাধ্যমকে নাটকে প্রয়োগ করেছি। আমার লেখা প্রথম নাটক ‘কমলাবতীর পালা’য় পালাকীর্তন ছিল, ‘বিভাজনে’ কবির লড়াই ছিল, ‘জ্যোতিসংহিতা’য় রাধারমণের গান ব্যবহার করেছি। তবে ইতিহাসের বরপুত্র জগতজ্যোতিকে নিয়ে জ্যোতিসংহিতা লেখা ছিল একদম নিজস্ব দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে।
জাগো নিউজ: সংলাপ ও দৃশ্যায়নে আপনার স্বতন্ত্র কৌশল বা স্টাইল কী?
রুমা মোদক: স্বতন্ত্র হতে পেরেছি কি না তা তো জানি না, সেটা দর্শক বলবে। সংলাপ-বর্ণনায় আমি নিজস্ব ভাষাশৈলী ব্যবহার করেছি। সেটা একদম আমার।
জাগো নিউজ: মঞ্চায়নের সময় দর্শকের প্রতিক্রিয়া কি আপনার লেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়?
রুমা মোদক: হ্যাঁ, দেয়। নিজেকে অপরাধী লাগে। মনে হয় এত আমার প্রাপ্য নয়। আমি আরও সিরিয়াসলি লিখতে পারতাম। যা পেয়েছি তার পরিমাণ হয়তো আমার লেখার তুলনায় অধিক।
জাগো নিউজ: নারী নাট্যকার হিসেবে থিয়েটারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনটি?
রুমা মোদক: ওহ, চ্যালেঞ্জের অভাব নেই। থিয়েটার কখনোই দেশে পেশা হয়ে ওঠেনি। সর্বপ্রথম চ্যালেঞ্জ নাট্যকার পরিচয়ের আগে নারী শব্দটির ব্যবহার। দেখুন এটাও চ্যালেঞ্জ করে বলি, আমার লেখা প্রথম মঞ্চে আসে ১৯৯৯ সালে। প্রথম নাটকেই থিয়েটার অঙ্গনে আমার নাম আলোচনায় আসে। কিন্তু নারী নাট্যকার হিসাবে। হ্যাঁ, সত্যিকার অর্থেই গবেষণার প্রয়োজনে অনেক নাম আমরা খুঁজে বের করি, কোন নারী কখন কোথায় নাটক লিখেছিলেন, বিচ্ছিন্ন অনেক নারীকে আবিষ্কার করা যায়। কিন্তু ধারাবাহিক, মেইনস্ট্রিম বলতে আমি যখন নাটক লিখতে শুরু করি, আমার আগে কোনো নারীকে পাইনি। কিন্তু এই যে নারী হিসেবে আলাদা বিবেচনা একে জয় করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জটা সাথে নিয়েই এতদূর এসেছি। আমার জীবনসঙ্গী নিজে থিয়েটার কর্মী বলে বোধহয় ব্যক্তিগত ভাবে আমি নারী হিসেবে তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হইনি। কিন্তু সাংগঠনিক প্রয়োজনে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি, তা দিয়ে একটা মহাকাব্য হবে।
জাগো নিউজ: থিয়েটারকে আপনি কতটা সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যম মনে করেন?
রুমা মোদক: সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যম আমরা স্লোগানের প্রয়োজনে বলি বটে, আমি একদমই সেটা মনে করি না। থিয়েটারের দর্শক সীমিত, আর সে দর্শক প্রশিক্ষিত। তারা থিয়েটারের ভাষা বোঝেন বলে থিয়েটার দেখতে আসেন। তারা সচেতন মানুষ। তারা নিজেরাই প্রতিরোধ করতে জানেন। নাটক বড়জোর তাদের উদ্দীপিত করতে পারে, এর বেশি কিছু নয়।
জাগো নিউজ: ভবিষ্যতে কোন প্রশ্ন বা সংকটকে কেন্দ্র করে নাটক লিখতে আগ্রহী?
রুমা মোদক: আমি এখনো জানি না কী নিয়ে লিখবো। আগে থেকে ভাবিও না। তবে এবার আমি মনে মনে জানি, আমি আমার হৃত স্বদেশের আবেগ নিয়ে একটি নাটক লিখবো। হয়তো এটিই শেষ। আর লিখবো না। কম তো লিখলাম না। ২৭ বছর নাটক লিখলাম। প্রায় সব কয়টি মঞ্চস্থ হয়েছে। এখন মনে হয় দেশে আমার শুধু নয়, থিয়েটারেরও প্রয়োজন ফুরিয়েছে।
জাগো নিউজ: সবশেষে বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিবার্চনের ক্ষেত্রে নারীদের অবমূল্যায়ন করা হয় কি না? বিশেষ করে নাটকে আপনাকে পুরস্কার দেওয়ার মতো অবদান থাকার পরও কেন দিচ্ছে না। তা নিয়ে আপনার কোনো অভিমান কাজ করে কি?
রুমা মোদক: বাংলা একাডেমি পুরস্কার তো আর কোটা ধরে দেওয়া হয় না। কাজেই নারীকে অবমূল্যায়ন করা হয় কেন বলবো? সৃজনশীলতার কোনো লিঙ্গভেদ নেই। তবে বাংলা একাডেমি পুরস্কারের নানা হিসাব-নিকাশ, নানা সমীকরণ। দলীয়করণ, তেলবাজি। কম তো দেখলাম না। এসব বলতে গেলে বরং নিজের গায়ে থুথু ছিটানো হয়। ফাঁকে ফুঁকে দুয়েকজন সঠিক মানুষ পেয়ে যায়। হয়তো যোগ্যতার কারণেই আমাকে দেওয়া হয়নি, আমার লেখার মান পুরস্কার পাবার যোগ্য নয়। পুরস্কার তো রবীন্দ্রনাথ পায়, বিহারীলাল পায় না। আমি নাটকের বিহারীলাল। নয়তো সেই ফাঁক-ফুঁকের ছিঁকে ছিঁড়ে না। আফসোস করার কিছু নেই তো। পুরস্কার নিয়ে আড়ালে-আবডালে আকথা-কুকথা বলাবলি, ফিসফাস করার চেয়ে না পাওয়া অনেক ভালো। তোমরা কেউ কেউ উপলব্ধি করো, আমার অনেক আগে পাওয়া উচিত ছিল; এটাই আমার পুরস্কার।
এসইউ
What's Your Reaction?