সোনায় মোদীর ‘না’ বাংলাদেশ কোন পথে?

বিশ্ব এখন এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন একটি অঞ্চলের যুদ্ধ বা সংকট আর শুধু সেই অঞ্চলের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরি হলেই তার প্রভাব পড়ে তেলের দামে, জাহাজ চলাচলে, আমদানি-রপ্তানিতে, এমনকি সাধারণ মানুষের রান্নাঘরেও। বৈশ্বিক অর্থনীতির এই আন্তঃসংযুক্ত বাস্তবতায় কোনো দেশই আলাদা দ্বীপ নয়। সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশবাসীকে অপ্রয়োজনীয় বিলাসী পণ্য, বিশেষ করে সোনা কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দেশীয় পণ্য ব্যবহারে জোর দিয়েছেন এবং করোনাকালের মতো সংযমী জীবনযাপনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। একজন রাজনৈতিক নেতার এই বার্তার ভেতরে মূলত একটি অর্থনৈতিক সতর্কবার্তা রয়েছে—সংকটের সময়ে রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, নাগরিকদের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্যও এই বার্তাটি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ে জ্বালানি বাজারে, আর বাংলাদেশ এখনো আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির দেশ। তেলের দাম বাড়লে বাড়ে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ, খাদ্যের দাম এবং বৈদেশিক মুদ্রার ও

সোনায় মোদীর ‘না’ বাংলাদেশ কোন পথে?

বিশ্ব এখন এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন একটি অঞ্চলের যুদ্ধ বা সংকট আর শুধু সেই অঞ্চলের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরি হলেই তার প্রভাব পড়ে তেলের দামে, জাহাজ চলাচলে, আমদানি-রপ্তানিতে, এমনকি সাধারণ মানুষের রান্নাঘরেও। বৈশ্বিক অর্থনীতির এই আন্তঃসংযুক্ত বাস্তবতায় কোনো দেশই আলাদা দ্বীপ নয়।

সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশবাসীকে অপ্রয়োজনীয় বিলাসী পণ্য, বিশেষ করে সোনা কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দেশীয় পণ্য ব্যবহারে জোর দিয়েছেন এবং করোনাকালের মতো সংযমী জীবনযাপনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। একজন রাজনৈতিক নেতার এই বার্তার ভেতরে মূলত একটি অর্থনৈতিক সতর্কবার্তা রয়েছে—সংকটের সময়ে রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, নাগরিকদের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্যও এই বার্তাটি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়ে জ্বালানি বাজারে, আর বাংলাদেশ এখনো আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির দেশ। তেলের দাম বাড়লে বাড়ে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ, খাদ্যের দাম এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ। একই সঙ্গে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ, রপ্তানি বাণিজ্য ও সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশ কী করতে পারে? শুধু সরকার নয়, নাগরিকেরও কী দায়িত্ব আছে?

সংকট শুধু অর্থনীতির নয়, মানসিকতারও

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত ডলার সংকট, রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি বা ব্যাংক খাতের দুর্বলতার কথা আসে। কিন্তু একটি বিষয় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই—অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভর করে মানুষের আচরণের ওপর।

যখন মানুষ আতঙ্কে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কিনে মজুত করতে শুরু করে, তখন বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। যখন বিলাসী আমদানি বাড়ে, তখন বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়ে। যখন সমাজে ভোগবাদী প্রতিযোগিতা বাড়ে, তখন সঞ্চয় কমে যায়।

করোনাকালে আমরা দেখেছিলাম, সংকটের সময়ে অনেক পরিবার তাদের ব্যয় কমিয়ে আনে। অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ, বিলাসী কেনাকাটা, সামাজিক অনুষ্ঠানের অপচয়—সবকিছুতে একধরনের সংযম তৈরি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, কৃচ্ছ্রসাধন মানেই পিছিয়ে যাওয়া নয়; বরং এটি টিকে থাকার বুদ্ধিমত্তা।

আজ আবার সেই বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ।

সরকারের প্রথম কাজ: জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বড় চাপ আসবে জ্বালানি খাতে। বাংলাদেশকে তাই এখন থেকেই বিকল্প পরিকল্পনা নিতে হবে।

প্রথমত, বিদ্যুৎ উৎপাদনে অপচয় কমাতে হবে। এখনো দেশে এমন বহু প্রকল্প রয়েছে, যেখানে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ব্যয় হচ্ছে, কিন্তু উৎপাদন দক্ষতা কম। সরকারি অফিস, বিপণিবিতান ও আলোকসজ্জায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধন আনা জরুরি।

এছাড়া খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানিনির্ভরতা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কৃষকদের প্রণোদনা, সার ও সেচে সহায়তা এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।

বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না অথচ শহরে খাদ্যের দাম বাড়তেই থাকে। এই বৈপরীত্য দূর না করলে সংকটের সময়ে বাজার আরও অস্থির হবে।

অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিলাসী গাড়ি, প্রসাধনী, দামি ইলেকট্রনিকস বা অলংকার আমদানিতে কঠোরতা আরোপ করা যেতে পারে। কারণ সংকটের সময়ে প্রতিটি ডলার গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু আমদানি কমালেই হবে না, দেশীয় শিল্পও বাঁচাতে হবে

ভারতের প্রধানমন্ত্রী দেশীয় পণ্য ব্যবহারের যে আহ্বান জানিয়েছেন, সেটি কেবল আবেগের বিষয় নয়; এর গভীর অর্থনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।

বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় শিল্প নানা প্রতিকূলতার মুখে। একদিকে উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, অন্যদিকে বিদেশি পণ্যের আগ্রাসন। ফলে অনেক উদ্যোক্তা টিকে থাকতে হিমশিম খান।

বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, একদিকে সাধারণ মানুষকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা বলা হয়, অন্যদিকে সরকারি প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয়, বিলাসী গাড়ি কেনা বা বিদেশ সফরের খবর আসে। এতে জনগণের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা যায়। কৃচ্ছ্রসাধন তখনই কার্যকর হয়, যখন সেটি সমাজের সব স্তরে সমানভাবে প্রতিফলিত হয়।

এই মুহূর্তে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ধারণাকে নতুনভাবে সামনে আনা প্রয়োজন। স্থানীয় পোশাক, খাদ্যপণ্য, হস্তশিল্প, প্রযুক্তিপণ্য—যেখানে সম্ভব দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং অর্থনীতির ভেতরে অর্থের প্রবাহও বজায় থাকবে।

তবে দেশীয় পণ্য ব্যবহারের আহ্বান যেন শুধুই স্লোগানে সীমাবদ্ধ না থাকে। স্থানীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে দুর্নীতি কমাতে হবে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

নাগরিকদেরও দায়িত্ব আছে

বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই সব দায় সরকারের ওপর চাপিয়ে দিই। কিন্তু সংকট মোকাবিলায় নাগরিকের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, অপ্রয়োজনীয় ভোগ কমাতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে মানুষের মধ্যে প্রদর্শনমূলক ব্যয়ের প্রবণতা বেড়েছে। বিয়ে, জন্মদিন, উৎসব—সবকিছুতেই একধরনের প্রতিযোগিতা চলছে। এই সংস্কৃতি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর।

এছাড়া সঞ্চয়ের অভ্যাস বাড়াতে হবে। অনেক পরিবার এখনো আয় বাড়লে প্রথমেই ব্যয় বাড়ায়। অথচ সংকটের সময়ে টিকে থাকতে হলে ব্যক্তিগত সঞ্চয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আলো, এসি বা ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার সীমিত করা শুধু ব্যক্তিগত সাশ্রয় নয়; এটি জাতীয় দায়িত্বও।

এবং গুজব ও আতঙ্ক ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, সংকটের খবর ছড়ালেই মানুষ বাজারে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এতে বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি হয়।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনীতি টিকবে না

বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় দুর্বলতা হলো রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। বিনিয়োগকারীরা এমনিতেই বৈশ্বিক সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন। এর মধ্যে যদি অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়ে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

সংকটের সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও বাড়ে। অর্থনীতি যখন চাপে থাকে, তখন সংঘাতের রাজনীতি নয়, বরং ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। কারণ অর্থনৈতিক সংকট কখনো দল দেখে আঘাত করে না; এর প্রভাব পড়ে সবার জীবনে।

দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ না করলে কৃচ্ছ্রসাধন আহ্বান বিশ্বাসযোগ্য হবে না

রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের সংযমের কথা বলবে, তখন রাষ্ট্রকেও আগে নিজের ব্যয় কমানোর উদাহরণ তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, একদিকে সাধারণ মানুষকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা বলা হয়, অন্যদিকে সরকারি প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয়, বিলাসী গাড়ি কেনা বা বিদেশ সফরের খবর আসে। এতে জনগণের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা যায়।

কৃচ্ছ্রসাধন তখনই কার্যকর হয়, যখন সেটি সমাজের সব স্তরে সমানভাবে প্রতিফলিত হয়।
সরকার যদি সত্যিই সংকট মোকাবিলায় সফল হতে চায়, তাহলে প্রথমেই অপচয় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নয়, জনগণের আস্থাও।

সংকটই নতুন শিক্ষার সুযোগ

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। একদিকে আগের মতো আমদানিনির্ভর, ভোগবাদী ও অপচয়কেন্দ্রিক অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা; অন্যদিকে উৎপাদন, সঞ্চয় ও সংযমভিত্তিক নতুন বাস্তবতা গ্রহণ করা।

ইতিহাস বলে, অনেক দেশ বড় সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের অর্থনীতিকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছে। জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল শৃঙ্খলা ও উৎপাদনশীলতার মাধ্যমে। দক্ষিণ কোরিয়া দারিদ্র্য থেকে উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে জাতীয় সঞ্চয় ও শিল্পনীতির কারণে।

বাংলাদেশও চাইলে সংকটকে সুযোগে রূপান্তর করতে পারে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ নীতি এবং নাগরিক সচেতনতা।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা হয়তো আমরা থামাতে পারব না। কিন্তু সেই সংকটের অভিঘাত কতটা সামাল দিতে পারব, সেটি অনেকটাই নির্ভর করবে আমাদের নিজেদের আচরণ, পরিকল্পনা ও দায়িত্ববোধের ওপর।

সংকটের সময়ে সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু অর্থ নয়; সংযম, আস্থা ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধও একটি জাতিকে টিকিয়ে রাখে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/এমএফএ/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow