সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তিতে কী রয়েছে, কেন এটি এত স্পর্শকাতর?
তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি বা নিউক্লিয়ার প্রোগ্রাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশটির সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ব্যবহার করে সৌদি ভূখণ্ডে পারমাণবিক অবকাঠামো গড়ে তোলার এই পদক্ষেপে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিবেশের পাশাপাশি ওয়াশিংটনের ক্ষমতাশীল করিডোরেও মারাত্মক উদ্বেগ ও আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। আবার এই চুক্তিটি আসলে জো বাইডেন প্রশাসনের সময়ে গৃহীত এক পূর্ববর্তী পরিকল্পনারই ধারাবাহিকতা, যেখানে শর্ত ছিল- যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া পারমাণবিক সহযোগিতার বিনিময়ে সৌদি আরবকে ইসরায়েলকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এই চুক্তির বেশিরভাগ বিবরণ ও গোপন শর্তাবলী এখনো অস্পষ্ট থাকলেও, মূল বিতর্ক ও আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে- সৌদি আরব কি তার নিজের মাটিতে নিজস্ব উদ্যোগে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করার ক্ষমতা বা অধিকার পাবে কি না ও এই সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে। তাছাড়া ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও খুব স্পর্শকাতর। কী রয়
তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি বা নিউক্লিয়ার প্রোগ্রাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশটির সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ব্যবহার করে সৌদি ভূখণ্ডে পারমাণবিক অবকাঠামো গড়ে তোলার এই পদক্ষেপে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিবেশের পাশাপাশি ওয়াশিংটনের ক্ষমতাশীল করিডোরেও মারাত্মক উদ্বেগ ও আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।
আবার এই চুক্তিটি আসলে জো বাইডেন প্রশাসনের সময়ে গৃহীত এক পূর্ববর্তী পরিকল্পনারই ধারাবাহিকতা, যেখানে শর্ত ছিল- যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া পারমাণবিক সহযোগিতার বিনিময়ে সৌদি আরবকে ইসরায়েলকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
এই চুক্তির বেশিরভাগ বিবরণ ও গোপন শর্তাবলী এখনো অস্পষ্ট থাকলেও, মূল বিতর্ক ও আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে- সৌদি আরব কি তার নিজের মাটিতে নিজস্ব উদ্যোগে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করার ক্ষমতা বা অধিকার পাবে কি না ও এই সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে। তাছাড়া ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও খুব স্পর্শকাতর।
কী রয়েছে এই বহুল আলোচিত পরমাণু চুক্তিতে?
মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ক্রিস রাইটের এক বিবৃতি অনুযায়ী, ৩০ বছর মেয়াদী এই চুক্তির প্রাথমিক লক্ষ্য হলো সৌদি আরবের প্রয়োজনীয় ‘জ্বালানি চাহিদা’ পূরণ করা।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনার (ভিশন) অধীনে দেশটি তাদের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি অংশের জন্য পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করতে চায়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো গৃহস্থালি ও শিল্প উৎপাদনে জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমিয়ে তা আরও বেশি পরিমাণে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা ও দেশের রাজস্ব বৃদ্ধি করা।
এই চুক্তির ফলে সৌদি আরবের জাতীয় পারমাণবিক অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে মার্কিন কোম্পানিগুলো প্রধান ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তি বা প্রতিযোগীদের সৌদি আরবে কৌশলগত প্রভাব বিস্তার ও অবস্থান তৈরিকে আটকে দেওয়া সম্ভব হবে।
কয়েক বিলিয়ন বা হাজার কোটি ডলার মূল্যের এই বৃহৎ চুক্তিটি মূলত জো বাইডেন প্রশাসনের সময়ে গৃহীত এক পূর্ববর্তী পরিকল্পনারই ধারাবাহিকতা। সেই প্রাথমিক পরিকল্পনায় শর্ত ছিল- যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া পারমাণবিক সহযোগিতার বিনিময়ে সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন বা স্বাভাবিকীকরণ করতে হবে।
তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে হামাসের হামলা ও তার পরে গাজায় শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কারণে ইসরায়েল ও রিয়াদের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন তাই ইসরায়েলের সাথে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতার অপেক্ষায় না থেকে সরাসরি সৌদির সাথে এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি চূড়ান্ত করার পথ বেছে নিয়েছে।
সৌদি আরব কি নিজেদের মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তিটির মাধ্যমে সৌদি আরবে নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলার পথ সুগম হতে পারে। তবে এটি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে যৌথ মার্কিন-সৌদি একটি দ্বিপাক্ষিক সমীক্ষা বা স্টাডির সিদ্ধান্তের ওপর, যা নির্ধারণ করবে রিয়াদের জন্য এমন কেন্দ্রের সত্য়িই কোনো প্রয়োজন রয়েছে কি না।
যৌথ সমীক্ষার এই প্রক্রিয়াটি টানা দুই বছর ধরে চলবে। ফলে হোয়াইট হাউজে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী মেয়াদের উত্তরসূরি প্রেসিডেন্ট যিনি হবেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবেন যে রিয়াদকে স্বভূমিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হবে কি না।
বিশ্বজুড়ে যেসব দেশে বেসামরিক পরমাণু শক্তি শিল্প রয়েছে, তাদের সিংহভাগ দেশই কিন্তু নিজেদের মাটিতে অভ্যন্তরীণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে না। কারণ ইউরেনিয়াম অতিরিক্ত সমৃদ্ধকরণের এই প্রক্রিয়াই নীতিগতভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাঁচামাল তৈরি করে ফেলে। তাই সেই দেশগুলো চুল্লি বা রিয়্যাক্টরের জ্বালানির জন্য আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভর করে।
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই চুক্তি করার পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, ওয়াশিংটনের কাছে রিয়্যাক্টরের যে কোনো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও ব্যবহৃত জ্বালানির ওপর সরাসরি নজরদারি করার অধিকার থাকবে, যা নিশ্চিত করবে যে সেই সামগ্রী দিয়ে কোনোভাবেই পারমাণবিক বোমা তৈরি করা না যায়।
সৌদি আরব কি আসলেই ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে?
ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া ও দখলদার দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল একটি রাজনৈতিক বিষয়। এর পেছনে মূল কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো-
ফিলিস্তিন সংকট ও মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব
সৌদি আরবকে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম ধর্মীয় কেন্দ্র ও নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় (পবিত্র মক্কা ও মদিনার সুরক্ষক হিসেবে)। ঐতিহাসিকভাবে, সৌদি আরবের নীতি হলো- ১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুযায়ী একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলকে কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হবে না। ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও স্বাধীন ভূখণ্ডের দাবিকে উপেক্ষা করে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলে মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরবের নৈতিক অবস্থান ও নেতৃত্ব বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়বে।
অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক জনমত
সৌদি আরবের সাধারণ জনগণ এবং সমগ্র আরব বিশ্বের একটি বড় অংশ ফিলিস্তিনিদের প্রতি গভীর সমানুভূতিশীল। বিশেষ করে গাজায় সাম্প্রতিক সংঘাত ও প্রাণহানির ঘটনার পর আঞ্চলিক জনমত ইসরায়েল-বিরোধী অবস্থানে আরও তীব্র হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিদের যৌক্তিক সমাধানের সুযোগ না দিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি করলে দেশের ভেতরে ও বাইরে তীব্র অসন্তোষ ও জনরোষ তৈরির আশঙ্কা থাকে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা
ইসরায়েলকে মেনে নিলে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী (যেমন ইরান বা তাদের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো) সৌদি আরবকে ‘মুসলিম ও ফিলিস্তিনি স্বার্থের বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে চিত্রায়িত করার সুযোগ পাবে। এটি আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ানোর পাশাপাশি সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি ও ‘আরব শান্তি উদ্যোগ’
২০০২ সালে সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশা আবদুল্লাহ একটি ঐতিহাসিক শান্তি প্রস্তাব এনেছিলেন, যা ‘আরব পিস ইনিশিয়েটিভ’ নামে পরিচিত। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছিল- ফিলিস্তিন সমস্যার ন্যায়সংগত সমাধান এবং দখলকৃত আরব ভূখণ্ড ফেরত দেওয়া হলেই কেবল আরব বিশ্ব ইসরায়েলকে স্বাভাবিক স্বীকৃতি দেবে। এখন সেই অবস্থান থেকে হঠাৎ সরে আসা সৌদি আরবের নিজস্ব তৈরি ঐতিহাসিক কূটনীতির পরিপন্থি।
চুক্তিটি কেন এতটা বিতর্কিত, ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর?
পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তাররোধ বিষয়ক গবেষক ও সংগঠনগুলো বছরের পর বছর ধরে সতর্ক করে আসছে যে, এই ধরণের চুক্তি শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবকে পারমাণবিক অস্ত্র বা আণবিক বোমা তৈরির চূড়ান্ত পথে বসিয়ে দিতে পারে। রিয়াদ নিজেও অতীতে একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছে যে, তাদের প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী বা চিরশত্রু ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তবে নিজেদের সুরক্ষায় তাদেরও পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োজন হবে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে, যার অন্যতম মূল কারণই হলো তেহরানকে পারমাণবিক বোমা তৈরি করা অথবা অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা থেকে বিরত রাখা।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চুক্তি ঘিরে চলা এসব আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বমঞ্চে এমন কোনো দেশের সঙ্গেই চুক্তি করবে না যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিটি একটি পৃথক ‘দ্বিপাক্ষিক সেফগার্ডস চুক্তি’-এর পাশাপাশি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা তাদের মতে পর্যাপ্ত নজরদারি নিশ্চিত করবে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক পারমাণবিক বিশেষজ্ঞরা তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, বুধবার (২২ জুলাই) ঘোষিত এই চুক্তিতে পূর্বের পরমাণু চুক্তিগুলোর মতো কঠোর নজরদারি ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষাবলয় বা প্রতিরোধমূলক শর্তের চরম অভাব রয়েছে। জানা গেছে, সৌদি আরব জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ/IAEA) সবচেয়ে কঠোর ও নিখুঁত নজরদারি বা পরিদর্শন ব্যবস্থার অধীনে থাকবে না।
আইএইএ-এর কঠোর ‘অতিরিক্ত প্রটোকল’ বিশ্বের বহু দেশ বাস্তবায়ন করেছে, যা ২০১৫ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনের আমলে ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তিরও অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল। এর মধ্যে কঠোর পরিদর্শন ও যাচাইবাছাই প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত থাকে যেন সংশ্লিষ্ট দেশটি পারমাণবিক উপাদান শুধু ও শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করে।
এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন তাদের অন্যতম সহযোগী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে একই রকম পারমাণবিক চুক্তি করেছিল, তখন ইউএই নিজ দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ না করা বা ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি প্রক্রিয়াজাত না করার শর্তে রাজি হয়েছিল। আণবিক শক্তি পেতে চাওয়া দেশগুলোর জন্য এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে সৌদি-মার্কিন এই নতুন চুক্তিতে সেই ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ রাখা হয়নি।
আবার এই চুক্তির আওতায় যদি সৌদি আরব ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে পবিত্রতম দুই মসজিদের হেফাজতকারী হিসেবে মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরবের নৈতিক নেতৃত্ব ও ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হবে। ফিলিস্তিন ইস্যু সমাধান না করে চুক্তি করায় দেশটির ভেতরে সাধারণ জনগণ ও রক্ষণশীল ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর তীব্র অসন্তোষ দেখা দেবে।
তাছাড়া আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ও সশস্ত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে সৌদি আরবকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে নিরাপত্তা হুমকি বৃদ্ধি পাবে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব ও তাদের প্যান-ইসলামিক বয়ান আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পাবে। সব মিলিয়ে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক চাপে পড়কে রিয়াদ।
মার্কিন কংগ্রেসে কি এই চুক্তি আটকে দেওয়া সম্ভব?
চুক্তির বিরোধীরা শুরু থেকেই যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, সৌদি আরবকে অভ্যন্তরীণ পারমাণবিক কর্মসূচির সুযোগ করে দেওয়া হলে তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যেও একই ক্ষমতা অর্জনের এক নতুন ও বিপজ্জনক প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে। মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী (যদিও তা গোপন) দেশ হিসেবে পরিচিত ইসরায়েলও এরই মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, এই চুক্তি পুরো অঞ্চলে এক নতুন পারমাণবিক অস্ত্রের দৌড় শুরু করে দিতে পারে।
মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরাও একই ধরনের তীব্র আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। ডেমোক্র্যাটিক সেনেটর ক্রিস মারফি বলেছেন, এই চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একটি বিপজ্জনক পরমাণু প্রতিযোগিতা শুরু করবে, যা ইরানকেও তার নিজস্ব পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার আগ্রহ থেকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে দেবে।
তবে মারফি ও ক্যাপিটল হিলের তার সহকর্মীদের জন্য এই চুক্তিটি সহজে আটকে দেওয়া প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ হবে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই অনুমোদন বা পর্যালোচনার জন্য চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসে পেশ করার কথা রয়েছে। কিন্তু কংগ্রেসের মাধ্যমে চুক্তিটি বাতিল বা ব্লক করতে হলে একটি যৌথ প্রস্তাব পাস করতে হবে। এরপর প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতাকে বাতিল করতে কংগ্রেসে দুই-তৃতীয়াংশের মতো বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন পড়বে, যা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত কঠিন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, রয়টার্স
এসএএইচ
What's Your Reaction?