স্টিভ ওয়াহর যে মন্তব্যে কটাক্ষ ভুলে সাহসী হয়ে উঠেছিলেন সুজনরা
বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যখন ২০০৩ সালে প্রথম দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে অস্ট্রেলিয়া যায়, সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন খালেদ মাহমুদ সুজন। ২৩ বছর আগে স্টিভ ওয়াহর নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া খেলেছিল তাদের সেরা দল নিয়ে। তখনকার ‘টেস্ট শিশু’ টেস্ট সিরিজের আগে অজি বিশ্লেষক ডেভিড হুক্স বাংলাদেশকে নিয়ে খুব নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। ওই অসি এক্সপার্ট ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্টিভ ওয়াহর সমৃদ্ধ ও মহাপরাক্রমশালী দলের সামনে দাঁড়াতেই পারবে না বাংলাদেশ। হালে পানি পাবে না। একদিনেই হেরে বসবে। হুক্সের সেই তির্যক মন্তব্য পত্রপত্রিকায়, বিশেষ করে অসি প্রচারমাধ্যমে, খুব ফলাও করে প্রচারিত হয়েছিল। খুব স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের ক্রিকেট অনুরাগীদের মন খারাপ হয়েছিল। তখনকার টেস্টে বাংলাদেশ একদমই নতুন এক দল। গড়পড়তা তার আগে হাতে গোনা কয়েকটি টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা নিয়েই ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সিরিজ খেলতে গিয়েছিল টাইগাররা। সেই দলকে নিয়ে অমন তির্যক মন্তব্য মোটেই ভালোভাবে নেয়নি বাংলাদেশ ভক্তরা। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ ও সাবেক তারকা ক্রিকেটারদের একটি খারাপ অভ্যাসের কথা অনেকেরই জানা। তা হলো, কোনো টেস্ট বা
বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যখন ২০০৩ সালে প্রথম দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে অস্ট্রেলিয়া যায়, সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন খালেদ মাহমুদ সুজন। ২৩ বছর আগে স্টিভ ওয়াহর নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া খেলেছিল তাদের সেরা দল নিয়ে।
তখনকার ‘টেস্ট শিশু’ টেস্ট সিরিজের আগে অজি বিশ্লেষক ডেভিড হুক্স বাংলাদেশকে নিয়ে খুব নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। ওই অসি এক্সপার্ট ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্টিভ ওয়াহর সমৃদ্ধ ও মহাপরাক্রমশালী দলের সামনে দাঁড়াতেই পারবে না বাংলাদেশ। হালে পানি পাবে না। একদিনেই হেরে বসবে। হুক্সের সেই তির্যক মন্তব্য পত্রপত্রিকায়, বিশেষ করে অসি প্রচারমাধ্যমে, খুব ফলাও করে প্রচারিত হয়েছিল।
খুব স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের ক্রিকেট অনুরাগীদের মন খারাপ হয়েছিল। তখনকার টেস্টে বাংলাদেশ একদমই নতুন এক দল। গড়পড়তা তার আগে হাতে গোনা কয়েকটি টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা নিয়েই ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সিরিজ খেলতে গিয়েছিল টাইগাররা। সেই দলকে নিয়ে অমন তির্যক মন্তব্য মোটেই ভালোভাবে নেয়নি বাংলাদেশ ভক্তরা।
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ ও সাবেক তারকা ক্রিকেটারদের একটি খারাপ অভ্যাসের কথা অনেকেরই জানা। তা হলো, কোনো টেস্ট বা ওয়ানডে সিরিজ শুরুর আগে বেশিরভাগ সময় নানাভাবে প্রতিপক্ষ দলকে ছোট ও হেয় করে আগাম তির্যক মন্তব্য করা। বাংলাদেশ যখন ২০০৩ সালে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলতে গিয়েছিল, তার ঠিক আগে অমন তির্যক মন্তব্যের ঝড় উঠেছিল।
হুক্সের অমন মন্তব্যের পর মনে হচ্ছিল, অসি ক্রিকেটাররাও বুঝি মাঠে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করবে। তাদের হেয়প্রতিপন্ন করবে।
কিন্তু বাস্তব অবস্থা ছিল একদম তার উল্টো। মাঠে ও মাঠের বাইরে স্টিভ ওয়াহর দল ছিল খুবই ইতিবাচক। প্রতিপক্ষের প্রতি ছিল তাদের সমীহ।
মাঠে ও মাঠের বাইরে অসিরা কতটা ইতিবাচক মানসিকতা দেখিয়েছে? তাদের আচরণ যে কতটা ভালো ছিল, ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে যাওয়া দুই ক্রিকেটার মোহাম্মদ আশরাফুল আর হান্নান সরকার এরই মধ্যে জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপে তা জানিয়েছেন। সেই সিরিজে যিনি ছিলেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক, সেই খালেদ মাহমুদ সুজন আজ তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিলেন।
২৩ বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সেই ২ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে একান্ত আলাপে খালেদ মাহমুদ সুজন পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, ‘অসিদের অফ ও অন দ্য ফিল্ড পজিটিভ অ্যাটিটিউড আমাকে মুগ্ধ করেছে। সবাই বলতো অসিরা প্রচুর স্লেজিং করে। আমি, আমরা তা পাইনি। আমাদের গালাগাল দেওয়া বহুদূরের কথা, অসিরা মাঠেও আমাদের সঙ্গে খুব পজিটিভ বিহেভ করেছে। রীতিমত অনুপ্রাণিত করেছে ভালো খেলতে। সাহস জুগিয়েছে।’
খেলোয়াড়ি জীবন শেষে জাতীয় দলের টিম ম্যানেজমেন্ট ও বিসিবি পরিচালনা পর্ষদের সদস্য বনে যাওয়া খালেদ মাহমুদ সুজন বর্তমানে বিসিবির বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের প্রধান কনসালট্যান্ট।
দীর্ঘ দুই যুগ আগের কথা। প্রস্তুতি কেমন ছিল? দেশে ও অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে তারা কীভাবে টেস্ট খেলার প্রস্তুতি নিয়েছেন? সে প্রশ্নের জবাবে সুজন বলেন, ‘সত্যি বলতে কি, ওসব সেভাবে মনে করতে পারছি না। আমাদের প্রস্তুতি বলতে বিশেষ কিছু ছিল না। আমরা অন্য আট-দশটা সিরিজ খেলতে যাওয়ার আগে যেরকম প্রস্তুতি নিই, সেবারও তাই নিয়েছিলাম। আমরা তো আর অস্ট্রেলিয়ান কন্ডিশন সম্পর্কে জানতাম না। সেখানকার উইকেট কেমন হবে, কন্ডিশন কী হবে; এসব আগে ভাগে জানার ও সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়ার মতো অবস্থাও ছিল না তখন। আমরা প্রথমবার অস্ট্রেলিয়া যাব, অসিরা ক্রিকেটের অন্যতম সেরা শক্তি। স্টিভ ওয়াহর নেতৃত্বে জাস্টিন ল্যাঙ্গার, ম্যাথিউ হেইডেন, রিকি পন্টিং, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, গ্লেন ম্যাকগ্রা, জেসন গিলেস্পি, ব্রেট লি আর স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলের মতো বিশ্ব তারকায় সাজানো দল অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তাদের মাটিতে খেলা—সেটাই ছিল মূল ফোকাস। আমাদের কাছে সেটাই ছিল তখন এক বিরাট ব্যাপার।’
‘সেখানে যাওয়ার আগেই ধারাভাষ্যকার ডেভিড হুক্স একটা চরম নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন যে, আমরা দাঁড়াতেই পারব না। একদিনেই হেরে যাব। ভদ্রলোক বেশ কয়েক বছর আগে পরলোক গমন করেছেন। তখন তার মন্তব্য শুনে আমিসহ অনেকেরই মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আমি পত্রিকায় হুক্সের অমন তির্যক মন্তব্য পড়ার পর থেকে অসি ক্রিকেটারদের অ্যাপ্রোচ কেমন হয়, তা দেখতে মুখিয়ে ছিলাম। কিন্তু শুনে অবাক হবেন, অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পর ডারউইনে টেস্ট সিরিজ শুরুর আগেই সে ধারণা ভুল প্রমাণ হলো।’
‘প্রথম টেস্টের আগে বাংলাদেশ আর অস্ট্রেলিয়া দুই দলের একটি সান্ধ্যকালীন চা-চক্র ছিল। চা পান ছিল উপলক্ষ। আসলে অস্ট্রেলিয়া আর বাংলাদেশ-দুই দলের একটি পার্টি, গেট-টুগেদার ছিল। সেখানে অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহর এক মন্তব্য আমি এবং আমাদের পুরো দলকে সাহসী করে তুলল।’
সুজন তারপরে ঘটনা বর্ণনা করেন এভাে, ‘স্টিভ ওয়াহ বললেন, 'তোমরা কি মিডিয়ার খোঁজখবর রাখো? আই মিন পেপার-টেপার পড়ো?' আমরা বললাম, 'খুব পড়ি না। আবার পড়িও।' তখন তিনি বললেন, 'তোমরা কি হুক্সের ওই তির্যক মন্তব্য পড়েছ?' আমরা বললাম, 'হ্যাঁ, পড়েছি।' তখন অজি অধিনায়ক বলে উঠলেন, 'তোমরা ওই লেখা পড়ে মোটেই বিচলিত ও বিব্রত হয়ো না। আমি জানি তোমরা অনেক ভালো দল। আমার বিশ্বাস আছে, তোমরা অমন হেলাফেলার দল নও। তোমরা আমাদের সঙ্গে লড়াই করার সামর্থ্য রাখো। আমার ধারণা, তোমরা মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলবে। আমার মনে হয়, তোমরা ৩/৪ দিন পর্যন্ত লড়াই করতে পারবে।’
স্টিভ ওয়াহর ওই কথাতেই মনটা ভালো হয়ে গিয়েছিল জানিয়ে সুজন বলেন, ‘তার আগে হুক্সের কথায় যতটা মন খারাপ হয়েছিল, অজি অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহর মন্তব্যে মন ততটাই ভালো হয়ে গেল। প্রতিপক্ষ অধিনায়ক যখন আপনাকে ও আপনার দলকে ওইভাবে সাহস জোগাবেন, উজ্জীবিত করবেন, তখন আপনি উদ্দীপ্ত ও অনুপ্রাণিত না হয়ে পারেন না। আমরাও অনেকটাই চাঙ্গা ও অনুপ্রাণিত হলাম।’
‘এমনিতেই আমি স্টিভ ওয়াহর ভক্ত। সেই ছোটবেলা থেকেই আমি স্টিভ ওয়াহ আর ইমরান খানের ভক্ত। ইমরান খান আগে, তারপর স্টিভ ওয়াহ। সেই স্টিভ ওয়াহ যখন একটা টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে আমাদের অমন করে সাহস জোগালেন, অনুপ্রেরণা জোগালেন, তখন তার প্রতি শ্রদ্ধাটা আরও বেড়ে গেল। প্রতিপক্ষ দলের প্রতি এমন সম্মান প্রদর্শন দেখে আমার মনটা সত্যিই খুব ভালো হয়ে গেল। এবং আমরা প্রথম টেস্টে ইনিংসে হারার পরও সেই মূল্যায়ন, ইতিবাচক মানসিকতা আর পারস্পরিক সম্মানবোধটা অটুট ছিল।’
প্রসঙ্গত, ডারউইন ও কেয়ার্নসে দুই টেস্টেই ইনিংস ব্যবধানে হারলেও একটিতে তিনদিন আরেকটিতে চারদিন পর্যন্ত লড়াই করেছিল তখনকার নবীশ টেস্ট খেলুড়ে বাংলাদেশ।
এআরবি/এমএমআর
What's Your Reaction?