গত এপ্রিলে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অনুষ্ঠিত এএইচএফ কাপে চরম ব্যর্থ হয়েছিল বাংলাদেশ। সেমিফাইনালে ওমানের কাছে হেরে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ এশিয়া কাপে খেলার যোগ্যতা হারিয়েছিল। যদিও বাংলাদেশ এখন এশিয়া কাপে খেলার সুযোগ পেয়েছে পাকিস্তান নাম প্রত্যাহার করায়। একটি দল না খেলায় বাংলাদেশের সুযোগ আসলো ফাঁকতালে।
এএইচএফ কাপে ব্যর্থতার পর প্রধান আলোচনায় ছিল দেশসেরা খেলোয়াড় রাসেল মাহমুদ জিমিকে বয়সের অজুহাত দিয়ে দলে না নেওয়া। গণমাধ্যমে ব্যাপক নেতিবাচক আলোচনা হওয়ায় গত ৪ মে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ টুর্নামেন্টে হকি দলের ব্যর্থতা ও জিমিকে বাদ দেওয়ার কারণ খতিয়ে দেখতে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তৎকালীন পরিচালক (ক্রীড়া) মোহাম্মদ হুমায়ুন কবিরকে আহবায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন এ প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন সহকারী পরিচাকি (ক্রীড়া) সাজিয়া আফরিন ও সদস্য পরিষদের চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব সাইফুল ইসলাম।
তিন মাসের বেশি অতিক্রম হওয়ার পরও যখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখছিল না, তখন নানা কথা ভেসে বেড়াচ্ছিল ক্রীড়াঙ্গনে। বিশেষ করে হকি অঙ্গনে আলোচনা ছিল- একটি মহলের চাপে থেমে আছে তদন্ত কার্যক্রম। এ নিয়ে গত ২২ আগস্ট ‘হকিতে সার্কাস চলছেই/ রহস্যজনক কারণে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তদন্ত ধামাচাপা!’- শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তদন্ত কমিটি শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে একটি রিপোর্ট জমা দিয়েছে। তবে সেই তদন্ত প্রতিবেদন অশ্বডিম্ব ছাড়া কিছুই নয়।
বাংলাদেশ হকির ইতিহাসে অন্যতম বড় ব্যর্থতা ছিল এশিয়ান কাপে প্রথমবারের মতো খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে না পারা। সেই সাথে যোগ হয়েছিল অদ্ভূত নিয়ম করে রাসেল মাহমুদ জিমিকে দলের বাইরে রাখার সমালোচনা।
খেলোয়াড়দের অনেকেই মুখ খুলছেন, এএইচ কাপ চলাকালীন সময়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো ছিল না। এমনকি খাওয়াদাওয়া নিয়েও খেলোয়াড়দের সঙ্গে কর্মকর্তাদের মনোমালিন্য ছিল। কিন্তু সে সবের কিছুই আসেনি তদন্ত প্রতিবেদনে।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ যাদের নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল তাদের কারোরই হকির সাথে সংশ্লিষ্ঠতা নেই। এই কমিটি তদন্ত করে যা খুঁজে পেয়েছে তা হলো, ‘ঘরোয়া টুর্নামেন্ট বা লিগ না হওয়ায় খেলোয়াড়দের দক্ষতা কমে যাওয়ার কারণে এমন ফল হয়েছে।’
এ কারণে বেশি বেশি ঘরোয়া টুর্নামেন্ট আয়োজন, প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের সময়সীমা বাড়োনো, বিদেশে প্রাকটিস ম্যাচ আয়োজন আর বেশি বেশি বিদেশি দল এনে প্রাকটিস ম্যাচ খেলানোর সুপারিশ করেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তদন্ত কমিটি।
বড় প্রশ্ন উঠেছিল, এএইচএফ কাপের দল গঠন নিয়ে। সে প্রসঙ্গে কমিটি সুপারিশ করেছে- যাতে দল নির্বাচনের সময় খেলোয়াড়দের ফিটনেস পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণ হওয়ার সনদ প্রদান করা হয়। জাতীয় দলে যেখানে বয়স কোনো বিষয় নয়, সেই বিষয়ে তদন্ত কমিটির সুপারিশ হলো- ‘প্রাথমিক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বয়সসীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে বিবেচনা করা যেতে পারে।’ জিমিকে কেন নেওয়া হয়নি সেই বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই প্রতিবেদনে। জাতীয় দলে খেলোয়াড় নির্বাচনের ক্ষেত্রে বয়সের সীমার বিষয়টি পরোক্ষভাবে সমর্থনই করেছে কমিটি। যে কারণে, এই বিষয়ে তারা বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
যত ফিটনেস থাকুক, যত ভালো খেলুক বয়স বেশি হলে দলে জায়গা হবে না- এমন অদ্ভূত নিয়ম বিশ্বে কোনো দেশে আছে কিনা সেটা গবেষণার বিষয়। এমন একটি বিতর্কিত ইস্যু নিয়ে কমিটির পর্যবেক্ষণ ও মতামত অপর্যাপ্ত।
ভালো ফলাফলের জন্য কমিটি দেশি কোচের পাশাপাশি বিদেশি কোচ নিয়োগ, মেন্টাল হেলথ সেন্টার, ট্রেনার, ফিজিও, ডিভিও এনালিস্ট, স্পোর্টস সাইকোলজিস্টসহ আধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণে উন্নত ব্যবস্থাপনার জন্য ফেডারেশনকে সুপারিশ করেছে কমিটি।
বিদেশে কোনো টুর্নামেন্ট খেলতে যাওয়ার আগে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ও প্রাকটিস ম্যাচ আয়োজন নিশ্চিত করতে বলেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ গঠিত তদন্ত কমিটি। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তদন্ত কমিটি ব্যর্থতার কারণ হিসেবে শুধু খেলোয়াড়দের ‘দক্ষতা কমে যাওয়াই’ খুঁজে পেয়েছে। আর একগাঁদা উপদেশ দিয়েছে যেগুলো একজন হকি কোচেরই জানা আছে।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সাড়ে তিনমাস আগের ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন এমন একটা সময় সম্পন্ন করেছে যখন আরেকটি অভিযোগ জমা পড়েছে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার কাছে। সেখানে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ গঠিত অ্যডহক কমিটির একজন যুগ্ম সম্পাদক অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন জাতীয় দলের এএইচএফ কাপের অধিনায়কসহ সিনিয়র কয়েকজন খেলোয়াড়কে।
যুগ্ম সম্পাদকের শাস্তি চেয়ে ক্রীড়া উপদেষ্টার কাছে খেলোয়াড়দের দেওয়া বিচারের চিঠি পেয়েছেন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্বাহী পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম। ‘দুই খেলোয়াড়ের স্বাক্ষরিত চিঠি আমি পেয়েছি। চিঠি পাওয়ার পর আমাদের যে প্রক্রিয়া আছে সেটা চলছে’- বলেছেন মো. আমিনুল ইসলাম।
আরআই/আইএইচএস/