হজ-ওমরার প্রয়োজনীয় ১৫ টিপস
পবিত্র হজ ও ওমরা একজন মুসলমানের জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ, আবেগময় ও আত্মশুদ্ধির সফর। আল্লাহর ঘর বায়তুল্লাহ-এর দিকে রওনা হওয়া মানে শুধু একটি ভ্রমণ নয়; বরং এটি আত্মার পরিশুদ্ধি, গোনাহ থেকে ফিরে আসা এবং রবের নৈকট্য অর্জনের এক মহাসুযোগ। কিন্তু এই সফর যেমন মহিমান্বিত, তেমনি বাস্তবিক দিক থেকে কিছু প্রস্তুতি, সচেতনতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা না থাকলে অনেকেই নানা জটিলতায় পড়েন। বিশেষ করে যারা প্রথমবারের মতো হজ বা ওমরায় যাচ্ছেন, তাদের জন্য প্রয়োজন আগে থেকেই সঠিক ধারণা নেওয়া, কোন বিষয়গুলো জরুরি, কোথায় সতর্ক থাকতে হবে, কীভাবে ইবাদতগুলো সুন্দরভাবে আদায় করা যাবে। অভিজ্ঞ হাজিদের অভিজ্ঞতা, আলেমদের পরামর্শ এবং বাস্তবিক কিছু প্রস্তুতি এই সফরকে করতে পারে অনেক বেশি সহজ, স্বস্তিদায়ক ও কবুলযোগ্য। কালবেলার পাঠকদের জন্য এমনই প্রয়োজনীয় ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ টিপস তুলে ধরা হলো, যা আপনার হজ-ওমরার সফরকে আরও সুশৃঙ্খল ও সফল করতে সহায়ক হবে— ১. মুয়াল্লিম নির্বাচন সুন্নত তরিকায় হজ/ওমরা আদায়ের জন্য একজন অভিজ্ঞ মুয়াল্লিমের বিকল্প নেই, বিশেষত প্রথমবারের যাত্রীদের এটা জন্য অত্যন্ত জরুরি। আপনার মুয়াল্লিম কে, তিনি আলেম ও অভিজ্ঞ
পবিত্র হজ ও ওমরা একজন মুসলমানের জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ, আবেগময় ও আত্মশুদ্ধির সফর। আল্লাহর ঘর বায়তুল্লাহ-এর দিকে রওনা হওয়া মানে শুধু একটি ভ্রমণ নয়; বরং এটি আত্মার পরিশুদ্ধি, গোনাহ থেকে ফিরে আসা এবং রবের নৈকট্য অর্জনের এক মহাসুযোগ। কিন্তু এই সফর যেমন মহিমান্বিত, তেমনি বাস্তবিক দিক থেকে কিছু প্রস্তুতি, সচেতনতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা না থাকলে অনেকেই নানা জটিলতায় পড়েন।
বিশেষ করে যারা প্রথমবারের মতো হজ বা ওমরায় যাচ্ছেন, তাদের জন্য প্রয়োজন আগে থেকেই সঠিক ধারণা নেওয়া, কোন বিষয়গুলো জরুরি, কোথায় সতর্ক থাকতে হবে, কীভাবে ইবাদতগুলো সুন্দরভাবে আদায় করা যাবে। অভিজ্ঞ হাজিদের অভিজ্ঞতা, আলেমদের পরামর্শ এবং বাস্তবিক কিছু প্রস্তুতি এই সফরকে করতে পারে অনেক বেশি সহজ, স্বস্তিদায়ক ও কবুলযোগ্য।
কালবেলার পাঠকদের জন্য এমনই প্রয়োজনীয় ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ টিপস তুলে ধরা হলো, যা আপনার হজ-ওমরার সফরকে আরও সুশৃঙ্খল ও সফল করতে সহায়ক হবে—
১. মুয়াল্লিম নির্বাচন
সুন্নত তরিকায় হজ/ওমরা আদায়ের জন্য একজন অভিজ্ঞ মুয়াল্লিমের বিকল্প নেই, বিশেষত প্রথমবারের যাত্রীদের এটা জন্য অত্যন্ত জরুরি। আপনার মুয়াল্লিম কে, তিনি আলেম ও অভিজ্ঞ কি না তা যাচাই করুন। দায়িত্বশীল মুয়াল্লিম না হলে হজের নিয়ম-কানুনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
২. এজেন্সি নির্বাচন
(ক) বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গেলে এজেন্সির লাইসেন্স ও তারা হাব (HAAB)-এর সদস্য কি না নিশ্চিত করুন।
(খ) পরিচিত কেউ আগে গেলে তাদের অভিজ্ঞতা জেনে নিন।
(গ) উপরের দুটি তথ্য সন্তোষজনক হলে, এজেন্সির অফিস পরিদর্শন করে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেনে নিন-
# যেই হোটেলে এজেন্সি রাখবে, সেই হোটেল থেকে হারামের দূরত্ব কেমন হবে ?
# প্যাকেজের খরচ কেমন হবে?
# মুয়াল্লিম (গাইড) হিসাবে আপনি কাকে সাথে পাবেন?
হজের ক্ষেত্রে প্রি-রেজিস্ট্রেশন ও রেজিস্ট্রেশনের টাকা জমা দিয়ে এসএমএস আসল কি না নিশ্চিত হোন, পাশাপাশি ওয়েবসাইটে ( https://hajj.gov.bd/) ট্র্যাকিং নাম্বার বসিয়ে নিজের তথ্যগুলো ঠিক আছে কি না যাচাই করুন।
৩. প্যাকেজ নির্বাচন
হজ-ওমরার প্যাকেজ খরচে বিশাল ফারাক হয়। হজ্বে ২ থেকে ৩ লাখ টাকাও পার্থক্য হয়ে যায়। প্যাকেজে মূল্য পার্থক্যের প্রধান কারণ হয় হোটেল। যত কাছে হোটেল চাইবেন, ততো খরচ বাড়বে। অবশ্য অনেক এজেন্সি টাকা বেশী নিয়েও প্রতিশ্রুত দূরত্বে হোটেল দেয় না।
হাঁটার হিম্মত বা শারীরিক সামর্থ্য কম হলে কাছে হোটেল নিতে হবে আপনাকে প্যাকেজ মূল্য বাড়িয়ে। আর হাঁটার অভ্যাস থাকলে অথবা আপনি বেশিভাগ সময় হারামে অবস্থান করলে স্বল্প মূল্যের প্যাকেজে দূরে হোটেলে যেতে পারেন। তবে আপনার পরিচিত/ মহল্লার কাফেলার সাথে গেলে সামগ্রিক বিবেচনাকে ব্যক্তি পছন্দের উপরে প্রাধান্য দিন।
৪. সৌদি রিয়াল ব্যবস্থাপনা
প্রয়োজনীয় সৌদি রিয়াল সংগ্রহ করুন তবে অনেক বেশি রিয়াল ভাঙ্গিয়ে অহেতুক ঝুঁকি ও পেরেশানি নেবেন না। এক্সচেঞ্জ দোকান মক্কা, মদিনায় , তবে রেট একটু বেশি। প্রবাসে থাকা বাঙালিরা আরও কম রেটে রিয়াল দিতে পারবেন আপনাকে। বাড়তি সুবিধা হচ্ছে, ক্যাশ টাকা নিয়ে আপনাকে ঘুরতে হবে না। টাকা দেশে দেবার কেউ থাকলে, আপনি সৌদি থেকে রিয়াল নিতে পারবেন। প্রয়োজনীয় সৌদি রিয়াল গলায় ঝুলানো ব্যাগে রাখুন (যেটা অজু-ইস্তেঞ্জা সর্বাবস্থায় সঙ্গে থাকে)। খুলে কোথাও রাখলে রিয়াল হারানোর সম্ভাবনা আছে।
৫. ব্যাগ ও জুতা ব্যবস্থাপনা
(ক) প্রয়োজনীয় সকল কাগজ , টাকা ইত্যাদি রাখার জন্য কোমরের বেল্টে বা গলায় ঝুলানো একটি ছোট ব্যাগ রাখবেন।
(খ) কাঁধের জন্য একটি আলাদা ব্যাগ রাখবেন, যেখানে ছোট জায়নামাজ, ছাতা এবং পানির বোতল নেওয়া যায়। কাঁধের ব্যাগটি যেন ফুলে না থাকে, চাইলে যেন ছোট করা যায়। কারণ, হারামে ঢোকার সময় যদি বড় বড় বোতল কাঁধের ব্যাগে থাকে, তবে ব্যাগ ফোলা মনে হলেই পুলিশ ব্যাগ চেক করবে। বড় বোতল পেলে আপনাকে মসজিদে প্রবেশ করতে দেবে না। অবশ্য বের হবার সময় কোনো চেক নেই।
৬. সিম কার্ড
সিম কার্ড যদি নিতে চান সফরের শুরুতে নেওয়াই উত্তম। সিমে থাকা টকটাইম দিয়ে দেশে ও সৌদি উভয় দেশেই কথা বলা যায়। সিমের সাথে আরেকটা ফ্রি সিমও পাওয়া যায়, আপনার সাথীকে দিলে তিনি শুধু কল রিসিভ করতে পারবেন। তবে আপনার সফর কত দিনের এবং কেমন ডাটা ও টকটাইম লাগতে পারে, সেই হিসাব করে প্যাকেজ নিন। নতুবা পরে টকটাইম ও ডাটা রিচার্জ করতে ন্যূনতম ৩৫-৪০ রিয়াল খরচ হবে। (উল্লেখ্য, এটি ওমরার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ, যারা ১৫দিন বা তার কম থাকবেন তাদের ক্ষেত্রে।)
৭. হারিয়ে যাবার ভয় থাকলে
(ক) সবার মোবাইল নম্বর সংরক্ষণ করুন
(খ) হোটেলের কার্ড সঙ্গে রাখুন
(গ) পথ খুঁজে না পেলে প্রয়োজন হলে অন্যের সহায়তায় ফোন করে নিজ কাফেলায় যোগাযোগ করুন
৮. প্রয়োজনীয় সামগ্রী
ঘ্রাণবিহীন সাবান, টিস্যু, লোশন, ছাতা, জায়নামাজ, ফোল্ডিং ব্যাগ, পানির নজল, রেজার, ফোল্ডিং ওয়াটার ব্যাগ ইত্যাদি সঙ্গে রাখুন।
৯. ওষুধ
নিজের প্রয়োজনীয় ওষুধ দেশ থেকেই নিয়ে যান। সাথে সাধারণ কিছু ওষুধ রাখলে অন্যদেরও উপকার হতে পারে।
১০. লাগেজ ব্যবস্থাপনা
তিন ধরনের ব্যাগ রাখুন—
(ক) বুকিং লাগেজ (ভারী জিনিস)
(খ) হ্যান্ড লাগেজ (জরুরি জিনিস)
(গ) ছোট ব্যাগ (ডকুমেন্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র)
১১. ইহরাম পরিধান ও নিয়ত
যদি আপনার গন্তব্য আগে জেদ্দা/ মক্কা হয়, তাহলে অবশ্যই ইহরাম বাঁধতে হবে। তবে যতক্ষণ না ফ্লাইট কনফার্ম হচ্ছে, ততক্ষণ ইহরামের কাপড় পরিহিত থাকলেও ইহরামের নিয়ত করবে না। আল্লাহ্ না করেন, ফ্লাইট কোনো কারণে অনেক দেরি হলে ইহরাম অবস্থায় লম্বা সময় থাকাটা কষ্টকর হয়ে যাবে। যদি ট্রানজিটে জেদ্দা যান, তবে ট্রানজিটে এসে ইহরামের কাপড় পড়তে পারেন। ট্রানজিট থেকে বোর্ডিংয়ের সময় ধীরস্থির ভাবে দুরাকআত নামাজ পড়ে ইহরামের নিয়ত করতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন, এই ক্ষেত্রে ভুলে ইহরামের কাপড় দেশ থেকে মূল লাগেজে দেবেন না। ইহরামের কাপড় হ্যান্ড লাগেজে থাকবে।
১২. মিনার প্রস্তুতি
মিনা, মুজদালিফা ও আরাফায় উকুফে অনেক হাঁটতে হয় এবং খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাগের ওজন বাড়লে কষ্ট হয়ে যাবে। তাই ৭-৮ যুলহিজ্জাহ মিনা যাবার আগেই একান্ত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছাড়া সব মক্কায় রেখে যান। সাথে যথাসম্ভব জমজমের পানি (এটা বেশী নিলে সমস্যা নেই, কারণ মিনাতেই একদিনে আপনার এই পানি শেষ হয়ে যাবে। মিনাতে জমজমের পানি সরবরাহ করে না) ও কিছু শুকনা খাবার নিন।
১৩. মুজদালিফা প্রস্তুতি
একটি ছোট্ট ব্যাগে ৭০টি কংকর সংগ্রহ করুন জামারাতে নিক্ষেপের জন্য। মনে রাখবেন, প্রয়োজন পড়লে জামারাতে পড়ে থাকা কংকর আপনি ব্যবহার করতে পারবেন না। মুজদালিফায় খোলা আকাশের নিচে রাত্রিযাপন করার জন্য একটা পাটি বা বিছানা চাদর আর বালিশ হলে সুবিধা হবে।
১৪. জামারাহ
একটি ছোট্ট ব্যাগে পাথর আগে থেকেই সংগ্রহ করুন। কারণ, জামারাতে (পাথর নিক্ষেপের জায়গা) বড় ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে দেবে না। বড় ব্যাগ নিলে ফেলে দিতে পারে।
১৫. নারী, অসুস্থ ও বয়স্কদের জন্য বিশেষ সুবিধা
ওজর না থাকলেও নারীদের জন্য হজের সময় যে সমস্ত আমলে অতিরিক্ত সুবিধা রয়েছে, অসুস্থ বা বয়স্করাও এই সুবিধার আওতায় আসতে পারেন।
(ক) আরোহী হয়ে তাওয়াফ করা, তথা তাওয়াফে হুইলচেয়ার ব্যবহার করার সুযোগ।
(খ) তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে রমল না করার অনুমতি।
(গ) সায়িতে বতনে মাসীলে (সবুজ বাতি এলাকায়) রমল না করা।
(ঘ) আরাফায় দাঁড়িয়ে উকুফ না করা।
(ঙ) মুজদালিফার রাত্রিতে মুজদালিফায় অবস্থান না করে মিনার জামারার কাছাকাছি চলে আসার সুযোগ।
(চ) মিনার রাত্রিগুলোতে মিনায় অবস্থান না করা, হারামের বাসায় বা হোটেলে থাকার সুবিধা গ্রহণ করা।
(ছ) এগারো তারিখে কিংবা বারো তারিখে একদিন এসে দুদিনের পাথর মারার সুযোগ গ্রহণ করা।
(জ) আট তারিখে মিনায় আসার আগে ইহরাম গ্রহণ করে একটি নফল তাওয়াফ শেষে হজের ১০ তারিখের সায়ী অগ্রিম করে রাখার সুযোগ। রাসুলুল্লাহ ﷺ ১০ তারিখের এই সায়ী মিনায় যাওয়ার আগে অগ্রিম করে ছিলেন।
পরামর্শ দাতা : মুফতি ইয়াহইয়া শহিদ
সিনিয়র শিক্ষক, জামিয়া ইসলামিয়া, তোয়াকুল, গোয়াইনঘাট, সিলেট
What's Your Reaction?