হজ বিশ্ব মুসলিমের মিলন মোহনা
ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হজ। হজ শব্দের আভিধানিক অর্থ ইচ্ছা করা, সংকল্প গ্রহণ করা, কোনো মহান উদ্দেশ্যে যাত্রা করা, কিংবা বিশেষ কোনো স্থানে গমন করার দৃঢ় প্রত্যয় পোষণ করা। এই সাধারণ অর্থের ভেতরে রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক আবেদন। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় হজ হলো নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট নিয়তে, ইহরামাবস্থায় পবিত্র কাবাগৃহ তাওয়াফ করা, আরাফার ময়দানে অবস্থান করা এবং সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট আমলসমূহ যথাযথভাবে আদায় করা। বিশেষভাবে জিলহজ মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে সম্পাদন করা। হজের গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “ইসলাম পাঁচটি বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত—‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল’ এই সাক্ষ্য দেওয়া, সালাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, হজ আদায় করা এবং রমজানের সিয়াম পালন করা” (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮)। এই হাদিসে হজকে ইসলামের মৌলিক ভিত্তিগুলোর একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, যা তার গুরুত্বকে অনস্বীকার্যভাবে তুলে ধরে। হজে
ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হজ। হজ শব্দের আভিধানিক অর্থ ইচ্ছা করা, সংকল্প গ্রহণ করা, কোনো মহান উদ্দেশ্যে যাত্রা করা, কিংবা বিশেষ কোনো স্থানে গমন করার দৃঢ় প্রত্যয় পোষণ করা। এই সাধারণ অর্থের ভেতরে রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক আবেদন। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় হজ হলো নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট নিয়তে, ইহরামাবস্থায় পবিত্র কাবাগৃহ তাওয়াফ করা, আরাফার ময়দানে অবস্থান করা এবং সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট আমলসমূহ যথাযথভাবে আদায় করা। বিশেষভাবে জিলহজ মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে সম্পাদন করা।
হজের গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “ইসলাম পাঁচটি বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত—‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল’ এই সাক্ষ্য দেওয়া, সালাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, হজ আদায় করা এবং রমজানের সিয়াম পালন করা” (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮)। এই হাদিসে হজকে ইসলামের মৌলিক ভিত্তিগুলোর একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, যা তার গুরুত্বকে অনস্বীকার্যভাবে তুলে ধরে।
হজের ইতিহাস মানবসভ্যতার সুদীর্ঘ অতীতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইবরাহিম (আ.) হজের বিধান প্রবর্তন করেন। তার আগে তিনি আল্লাহর আদেশে তার পুত্র হজরত ইসমাইলকে (আ.) সঙ্গে নিয়ে কাবাগৃহ পুনর্নির্মাণ করেন। ইসলামী ঐতিহ্য অনুসারে, কাবাঘর সর্বপ্রথম নির্মাণ করেন হজরত আদম (আ.) ফেরেশতাদের সহায়তায়। পরবর্তী সময়ে সেই ভিত্তির ওপরই হজরত ইবরাহিম (আ.) কাবাকে পুনর্নির্মাণ করেন। কাবা নির্মাণ সমাপ্ত হলে আল্লাহতায়ালা হজরত ইবরাহিমকে (আ.) নির্দেশ দেন মানবজাতির উদ্দেশ্যে হজের ঘোষণা দিতে। তখন তিনি বিনয়ের সঙ্গে আরজ করেন, এ নির্জন মরুপ্রান্তরে তার আহ্বান কে শুনবে? উত্তরে আল্লাহ বলেন, ‘তোমার দায়িত্ব শুধু ঘোষণা দেওয়া, তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমার দায়িত্ব।’ অতঃপর তিনি উচ্চস্থানে দাঁড়িয়ে আহ্বান জানান। এ ঘটনাকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, ‘তুমি মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা করে দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং কৃশকায় উটের পিঠে চড়ে দূরদূরান্ত থেকে, যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থানে উপস্থিত হতে পারে’ (সুরা হজ, আয়াত : ২৭-২৮)। এ আয়াতের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আজও বাস্তবতায় প্রতিফলিত। যুগে যুগে, ভাষা-সংস্কৃতি-বর্ণ নির্বিশেষে কোটি কোটি মানুষ সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে মক্কায় সমবেত হচ্ছে, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখর করে তুলছে মরুর বুকে ঐশী সমাবেশ।
পবিত্র কাবাগৃহকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এ মহামিলনমেলা। আল্লাহতায়লা কোরআনে বলেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষের জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর স্থাপিত হয়েছে, তা হলো বাক্কায় (মক্কায়), যা বরকতময় এবং বিশ্ববাসীর জন্য পথনির্দেশক’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৯৬)। আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘এতে রয়েছে সুস্পষ্ট নিদর্শন মাকামে ইবরাহিম; আর যে এতে প্রবেশ করে, সে নিরাপদ হয়ে যায়। আর মানুষের ওপর আল্লাহর হক হলো, যার সামর্থ্য আছে, সে যেন এ ঘরের হজ সম্পাদন করে’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৯৭)।
হজ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; এটি এক গভীর আধ্যাত্মিক অনুশীলন এবং মানবিক ঐক্যের অনন্য প্রতীক। ইহরামের সাদা বস্ত্র পরিধান করে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, সাদা-কালো সব মানুষ এক কাতারে দাঁড়ায়; যেখানে নেই কোনো সামাজিক ভেদাভেদ, নেই কোনো অহংকারের স্থান। যেন এক বিশাল সমুদ্র, যেখানে সব পরিচয় বিলীন হয়ে যায় একমাত্র ‘বান্দা’ পরিচয়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) হজের ফজিলত সম্পর্কে বলেছেন, ‘একটি মকবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭৭৩)। আরেক হাদিসে তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করে এবং তাতে অশ্লীলতা বা পাপাচারে লিপ্ত হয় না, সে নবজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫২১)। এ হাদিসগুলো হজের আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির দিকটি অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে তুলে ধরে।
হজের প্রতিটি অনুষঙ্গই প্রতীকী অর্থে পরিপূর্ণ। কাবা তাওয়াফ মানবজীবনের কেন্দ্রীয় সত্যের চারপাশে আবর্তনের প্রতীক, সাফা-মারওয়ার সায়ী হজরত হাজেরার (আ.) ত্যাগ ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার স্মারক, আরাফার ময়দানে অবস্থান কেয়ামতের ময়দানের পূর্বাভাস, মিনায় কংকর নিক্ষেপ শয়তানের বিরুদ্ধে মানবিক সংগ্রামের প্রতীক। এসব আচার একত্রে মানুষের আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহনিষ্ঠার এক মহাকাব্য রচনা করে।
হজ মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্যমান প্রকাশ। এখানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মানুষ এক কণ্ঠে তালবিয়া পাঠ করে, এক ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করে, এক দিকেই মুখ করে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এই দৃশ্য মানবজাতির জন্য এক গভীর বার্তা বহন করে—ঐক্যই শক্তি, বিভেদই দুর্বলতা। কোরআনে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩)। হজ সেই ঐক্যের বাস্তব অনুশীলন। ইসলামের অন্যান্য ইবাদতের মতো এটাও সম্মিলিত চেতনা গড়ে তোলে। যেমন জামাতে সালাত, সম্মিলিত ইফতার, সফরে নেতৃত্ব নির্বাচন সবই ইসলামের সামাজিক কাঠামোয় ঐক্যের গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে। হজ এ চেতনার সর্বোচ্চ প্রকাশ।
বিশ্ব বাস্তবতায় আজ মুসলিম উম্মাহ নানা সংকট, বিভাজন ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ প্রেক্ষাপটে হজের শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আমাদের পরিচয় এক, কেবলা এক, রব এক। বিভেদের রাজনীতি, স্বার্থের সংঘাত এবং মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বিদায় হজের ভাষণে মহানবী (সা.) মানবজাতির জন্য যে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তাতেও এ ঐক্যের বার্তা সুস্পষ্ট। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, কোনো আরবের ওপর অনারবের, কোনো অনারবের ওপর আরবের, কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কিংবা কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আল্লাহভীতি ছাড়া। হজ সেই চেতনার জীবন্ত প্রতিফলন। এটি কেবল অতীতের একটি ঐতিহাসিক ঐতিহ্য নয়; বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি দিকনির্দেশক আলোকবর্তিকা। অতএব, হজ আমাদের শুধু একটি ধর্মীয় কর্তব্য পালনের আহ্বান জানায় না; এটা আমাদের আত্মশুদ্ধি, সামাজিক ঐক্য, মানবিক সমতা এবং আল্লাহনিষ্ঠ জীবনের দিকে আহ্বান করে। যদি আমরা হজের এ গভীর চেতনাকে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে নিঃসন্দেহে মুসলিম উম্মাহ নতুন শক্তিতে উজ্জীবিত হবে।
লেখক: ইমাম ও খতিব
What's Your Reaction?