হাম থেকে ইবোলা: বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় নতুন প্রাদুর্ভাব নিয়ে আতঙ্ক
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে বেশ কয়েকটি সংক্রামক রোগ।প্রাণঘাতী এসব সংক্রামক রোগের কারণে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে কোটি কোটি মানুষ। করোনা মহামারির পর সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে এসব ভাইরাস। এতে এরই মধ্যে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ঝুঁকিতে আছে লাখ লাখ মানুষ। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে আফ্রিকায়। কারণ সেখানে ফের ছড়িয়ে পড়েছে প্রণঘাতী ইবোলার নতুন ধরন। যার নেই কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন। বাংলাদেশ ও সুদানে হামের প্রাদুর্ভাব সম্প্রতি বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে প্রণাঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ হাম। বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া হাম রোগের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম মারাত্মক শিশুস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে এ রোগে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাছাড়া সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৫৬ হাজার ছাড়িয়েছে। হাসপাতালে বেডের সংকটে অনেক রোগীকে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বিভিন্ন সহায়তা সংস্থা জানিয়েছে, আক্রান্তদের মধ্যে অনেক শিশু রয়েছে যারা হয় টিকা নেওয়ার বয়সের নিচে ছিল, অথবা আংশিক টিকা পেয়েছে। বাংলাদেশে ইউনিসেফের কর্মকর্তা মিগুয়েল মাতেওস মুনিওজ স
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে বেশ কয়েকটি সংক্রামক রোগ।প্রাণঘাতী এসব সংক্রামক রোগের কারণে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে কোটি কোটি মানুষ। করোনা মহামারির পর সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে এসব ভাইরাস। এতে এরই মধ্যে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ঝুঁকিতে আছে লাখ লাখ মানুষ। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে আফ্রিকায়। কারণ সেখানে ফের ছড়িয়ে পড়েছে প্রণঘাতী ইবোলার নতুন ধরন। যার নেই কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন।
বাংলাদেশ ও সুদানে হামের প্রাদুর্ভাব
সম্প্রতি বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে প্রণাঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ হাম। বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া হাম রোগের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম মারাত্মক শিশুস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে এ রোগে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাছাড়া সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৫৬ হাজার ছাড়িয়েছে।
হাসপাতালে বেডের সংকটে অনেক রোগীকে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বিভিন্ন সহায়তা সংস্থা জানিয়েছে, আক্রান্তদের মধ্যে অনেক শিশু রয়েছে যারা হয় টিকা নেওয়ার বয়সের নিচে ছিল, অথবা আংশিক টিকা পেয়েছে।
বাংলাদেশে ইউনিসেফের কর্মকর্তা মিগুয়েল মাতেওস মুনিওজ সিবিএস নিউজকে বলেন, গত বছর সরকার টিকার সরবরাহ ব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিল, যার ফলে টিকা সরবরাহে বিলম্ব হয়। পাশাপাশি গত তিন বছরে আংশিক টিকা নেওয়া বা টিকা না নেওয়া শিশুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। তিনি বলেন, কার্যকর সুরক্ষার জন্য দুই ডোজ টিকা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা এমন অনেক শিশুকে দেখছি যারা মাত্র এক ডোজ টিকা পেয়েছে, অথবা একেবারেই টিকা নেয়নি।
হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক ভাইরাসগুলোর একটি। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে বাতাসে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে এটি সহজেই মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়। টিকা না নেওয়া কেউ আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে তার সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ। শিশু ও বয়স্করা এ রোগে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। হাম থেকে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ, স্থায়ী অক্ষমতা এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানিয়েছে, আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝে ওঠার আগেই অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে। ত্বকে ফুসকুড়ি ওঠার চার দিন আগে থেকে এবং পরের চার দিন পর্যন্ত সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কার্যকর টিকা থাকা সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে প্রায় এক লাখ মানুষ হামে মারা গেছে।
- আরও পড়ুন>
- প্রাথমিক ধারণার চেয়েও দ্রুত ছড়াতে পারে ইবোলা
- হান্টাভাইরাস কীভাবে ছড়ায়? এটিই কি হতে পারে পরবর্তী মহামারি?
- নির্মূল হওয়া হাম কীভাবে শিশুর প্রাণ নিচ্ছে?
সম্প্রতি যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানের দারফুর অঞ্চলেও হামের প্রকোপ দেখা যায় লাবাডোর কয়েকটি জেলায় হাম রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এতে সেখানে এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় এক হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। সংক্রমণ ১২টি আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে যুদ্ধের সময় আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত মানুষসহ মোট প্রায় ১২ হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে।
আফ্রিকায় ইবোলার প্রদুর্ভাব
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) কঙ্গোর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (ডিআরসি) ও প্রতিবেশী উগান্ডায় ছড়িয়ে পড়া ইবোলা প্রাদুর্ভাবকে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে, কারণ ভাইরাসটিতে প্রায় ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ডিআরসির পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে ইবোলার বিরল বান্ডিবুগিও ধরন শনাক্ত হয়েছে। এই ধরনের জন্য এখন পর্যন্ত অনুমোদিত কোনো টিকা বা চিকিৎসা নেই।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই প্রাদুর্ভাব পুরো অঞ্চলের জন্য উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করেছে, কারণ এরই মধ্যে উগান্ডায় সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রোগী কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসাতেও পৌঁছেছে। তবে ডব্লিউএইচও এটিকে মহামারি ঘোষণা থেকে বিরত থেকেছে। সংস্থাটি বলেছে, প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ না হওয়ায় এটি মহামারি হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। একই সঙ্গে জাতিসংঘের এই সংস্থা দেশগুলোকে সীমান্ত বন্ধ বা বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার পরামর্শ দিয়েছে।
আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (আফ্রিকা সিডিসি) জানিয়েছে, গত শুক্রবার উত্তর-পূর্ব ডিআরসির ইতুরি প্রদেশে উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের সীমান্তের কাছে প্রথম এ প্রাদুর্ভাবের খবর পাওয়া যায়। শনিবার পর্যন্ত সংস্থাটি ৮৮ জনের মৃত্যু এবং ৩৩৬টি সন্দেহভাজন সংক্রমণের তথ্য জানিয়েছে। ব্যস্ত খনিশিল্প এলাকা মংগওয়ালুতে এই প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। পরে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এলাকা ছেড়ে অন্য জায়গায় চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগটি আরও ছড়িয়ে দেন।
এদিকে উগান্ডায় ডিআরসি থেকে আসা ভ্রমণকারীদের মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া দুটি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে রাজধানী কাম্পালায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ)-এর ট্রিশ নিউপোর্ট বলেন, “অল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা, বিভিন্ন স্বাস্থ্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এবং এখন সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ইবোলা কী?
ইবোলা একটি মারাত্মক এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রথম ১৯৭৬ সালে বর্তমানে ডিআরসি নামে পরিচিত অঞ্চলের ইবোলা নদীর কাছে শনাক্ত হয়। ধারণা করা হয়, ভাইরাসটি মূলত বন্য প্রাণী, বিশেষ করে বাদুড় থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। রক্ত, বমি, বীর্যসহ শরীরের বিভিন্ন তরল বা দূষিত সামগ্রী যেমন বিছানার চাদর ও কাপড়ের সরাসরি সংস্পর্শে এ রোগ ছড়ায়। উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের সংক্রমিত করতে পারেন। এর উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, বমি, ডায়রিয়া, তীব্র দুর্বলতা, পেশিতে ব্যথা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে শরীরের ভেতরে ও বাইরে রক্তক্ষরণ। ভাইরাসটির সুপ্তিকাল দুই থেকে ২১ দিন পর্যন্ত হতে পারে।
হান্টা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব
সম্প্রতি একটি ডাচ ক্রুজ জাহাজে প্রাণঘাতী হান্টা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। জাহাজটি এরই মধ্যে শেষ গন্তব্য রটারডামে পৌঁছেছে। যাত্রার শেষ অংশে জাহাজে শুধু ক্রুরাই ছিলেন। কারণ ১০ ও ১১ মে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর পর সব যাত্রী জাহাজ ত্যাগ করেন।
জাহাজটিতে ভ্রমণের পর তিনজন মারা গেছেন—একজন ডাচ দম্পতি এবং এক জার্মান নারী। এদের মধ্যে দুজনের শরীরে হান্টা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল। কানাডার কর্তৃপক্ষ রোববার আরও একটি সংক্রমণের তথ্য নিশ্চিত করেছে। ফলে ক্রুজের যাত্রীদের মধ্যে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১ জনে।
এর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানায়, আটটি সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে এবং আরও দুটি সন্দেহভাজন ঘটনা রয়েছে। রটারডাম-রাইনমন্ড স্বাস্থ্যসেবার পরিচালক ইভোনেস ভ্যান ডুইনহোভেন বলেন, জাহাজের চিকিৎসক ও নার্স জাহাজেই নমুনা সংগ্রহ করেছেন। রটারডামে পৌঁছানোর পর সেগুলো পরীক্ষা করা হবে এবং সোমবার বিকেলে ক্রুদের শরীরে হান্টা ভাইরাস আছে কি না, তা জানতে আরও পরীক্ষা চালানো হবে।
হান্টা ভাইরাস মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয় না। তবে বিরল কিছু ক্ষেত্রে অ্যান্ডিজ ভাইরাস নামের একটি ধরন মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে। বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য এই ধরনটিকেই দায়ী করা হচ্ছে। ডব্লিউএইচও এমভি হন্ডিয়াস থেকে নামা ব্যক্তিদের জন্য ৪২ দিনের আইসোলেশনের সুপারিশ করেছে।
করোনা মাহমারির পর আবার চোখ রাঙাতে শুরু করেছে এসব ভাইরাস। যদিও হাম বা ইবোলা বিশ্বজুড়ে করোনার মতো ছড়িয়ে পড়েনি। তাছাড়া ইবোলার কোনো ভ্যাকসিন না থাকলেও হামের রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী টিকার মাধ্যমে হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্র করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতা
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) বারবার সতর্ক করে বলেছে, বিদেশে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব সরাসরি আমেরিকানদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ হাম খুব সহজেই সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। সংস্থাটি বলেছে, বিশ্বের যেকোনো স্থানে হাম ছড়িয়ে পড়া সর্বত্র হুমকি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যেখানে টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের নিচে।
এমএসএম
What's Your Reaction?