হামে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন মরছে শিশু, দায় কার?
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব প্রকট। প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছে শিশু। টিকা সংকটের কথা বলছে অনেকে। অথচ, টিকা পাওয়ার উপযুক্ত হওয়ার আগেও আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন গবেষণা এবং সে আলোকে কার্যকরী পদক্ষেপ। কিন্তু না, দায়িত্বশীল পর্যায়ে চলছে ইঁদুর-বিড়াল খেলা। দায় চাপানোর প্রবণতা চোখে পড়ার মতো। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) কোনো উদ্যোগ নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব কেন্দ্র করে বিভিন্ন মাধ্যমে নানান আলোচনা চলছে। প্রাদুর্ভাব কেন ঘটলো তার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং কীভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায় এই প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনাই এই মুহূর্তে সবচাইতে জরুরি। কিন্তু এই আলোচনাকে পাশ কাটিয়ে কেউ কেউ হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবের জন্য আগের সরকারের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। এমনকি মারা যাওয়া অনেক শিশু এত শতাংশ টিকা পায়নি বলেও প্রচার করছে। কিন্তু টিকা না পাওয়া এই সংখ্যার বয়স কত প্রশ্ন করলে সদুত্তর দিচ্ছে না। টিকা পাওয়ার বয়সের আগেই আক্রান্ত হচ্ছে কেন, সমাধানে কী কী উদ্যোগ প্রয়োজন, এসব নিয়ে গবেষণা জরুরি। আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন জাগো নিউজকে
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব প্রকট। প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছে শিশু। টিকা সংকটের কথা বলছে অনেকে। অথচ, টিকা পাওয়ার উপযুক্ত হওয়ার আগেও আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন গবেষণা এবং সে আলোকে কার্যকরী পদক্ষেপ। কিন্তু না, দায়িত্বশীল পর্যায়ে চলছে ইঁদুর-বিড়াল খেলা। দায় চাপানোর প্রবণতা চোখে পড়ার মতো। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) কোনো উদ্যোগ নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব কেন্দ্র করে বিভিন্ন মাধ্যমে নানান আলোচনা চলছে। প্রাদুর্ভাব কেন ঘটলো তার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং কীভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায় এই প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনাই এই মুহূর্তে সবচাইতে জরুরি। কিন্তু এই আলোচনাকে পাশ কাটিয়ে কেউ কেউ হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবের জন্য আগের সরকারের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। এমনকি মারা যাওয়া অনেক শিশু এত শতাংশ টিকা পায়নি বলেও প্রচার করছে। কিন্তু টিকা না পাওয়া এই সংখ্যার বয়স কত প্রশ্ন করলে সদুত্তর দিচ্ছে না। টিকা পাওয়ার বয়সের আগেই আক্রান্ত হচ্ছে কেন, সমাধানে কী কী উদ্যোগ প্রয়োজন, এসব নিয়ে গবেষণা জরুরি।
আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রাদুর্ভাবে আমরা কিছু কাজ করেছি। উল্লেখ করার মতো তেমন গবেষণা করিনি। এটা তো আমাদের বিষয় নয়, এক্সপান্ডেড প্রোগ্রাম অন ইমিউনাইজেশনের (ইপিআই) কাছে জিজ্ঞেস করুন।’
আরও পড়ুন
হামে একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ মা–বাবা
অর্থাভাবে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে, হাম উপসর্গ নিয়ে শিশুর মৃত্যু
হামের উপসর্গ নিয়ে ৪ জনের মৃত্যু
চুয়াডাঙ্গায় হামে আরেক শিশুর মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৪
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেবল বাংলাদেশ নয়, প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ছয় মাসে ভারতে ১৫ হাজার ৭৫০ জন, ইয়েমেনে ১১ হাজার ৮৫ জন, পাকিস্তানে ৮ হাজার ৭২১ জন, মেক্সিকোতে ৮ হাজার ৫ জন, অ্যাঙ্গোলাতে ৭ হাজার ৩৭৩ জন, ইন্দোনেশিয়ায় ৫ হাজার ৮২২ জন, কাজাখস্তানে ৫ হাজার ৫৯৯ জন, ক্যামেরুনে ৫ হাজার ১০৯ জন, সুদানে ৩ হাজার ৬৮৯ জন এবং লাওসে ৩ হাজার ৩০৪ জন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত হামের প্রাদুর্ভাবে শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ছিল না।
বাংলাদেশে হামের চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩৫ জনে। এ সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ২১৮ জন। পাশাপাশি সন্দেহভাজন হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৯ হাজার ৩২৫ জন। এছাড়া হাম সন্দেহে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৬ হাজার ৯১১ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে ২৩ হাজার ২২৫ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে।
টিকা দেওয়ার হারে বাংলাদেশের অবস্থান
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হামের টিকার প্রথম ডোজের কাভারেজ ছিল ৯২ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের ৯০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০২৪ সালের হামের টিকার প্রথম ডোজের কাভারেজ ছিল ৯৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের ৯৬ দশমিক ১৫ শতাংশ।
২০২৩ সালের হামের টিকার প্রথম ডোজের কাভারেজ ছিল শতভাগ। দ্বিতীয় ডোজের কাভারেজ ৯৮ দশমিক ০৮ শতাংশ, যা পরে পরিচালিত কাভারেজ ইভ্যালুয়েশন সার্ভে অনুযায়ী ৮৬ দশমিক ১ এবং ৮০ দশমিক ৭ শতাংশ পাওয়া যায়। অর্থাৎ ২০২৩ সালে ইপিআই কর্মসূচির প্রদর্শিত ক্রুড কাভারেজের সঙ্গে কাভারেজ ইভ্যালুয়েশন সার্ভের ডাটায় হামের টিকার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য আছে।
কিছু আলোচনায় বিগত সময়ের তথ্য-উপাত্ত সামনে এনে তার সঙ্গে টিকা কাভারেজের তুলনা করা হচ্ছে। অথচ এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, ওই সময়কালে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি তথ্য-উপাত্ত অতিরঞ্জিত আকারে প্রকাশ করা হয়েছে; যা ইপিআই বা টিকাদান কর্মসূচির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
হামের ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটির থ্রেসহোল্ড ৯৫ শতাংশ। কাভারেজ ইভ্যালুয়েশন সার্ভে অনুসারে, দুঃখজনক হলেও সত্য যে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত কখনই হামের হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করতে পারেনি।
আরও পড়ুন
২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৯ জনের মৃত্যু
হামের টিকাদান কর্মসূচিতে ডিএনসিসির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে রেড ক্রিসেন্ট
গত ছয় বছর হামের ক্যাম্পেইন করা হয়নি: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
টিকার কাভারেজ নিয়ে দুই রকমের তথ্য
টিকার কাভারেজ হিসাবের জন্য সরকারি তথ্যই, অর্থাৎ ‘ডিএইআইএস২’ আপাতত নির্ভরযোগ্য ও প্রাথমিক উৎস। সাধারণত সারাদেশে ইপিআই কার্যক্রমে নিয়োজিত স্বাস্থ্য সহকারীরাই টিকাদানের তথ্য আপলোড করেন।
২০২৫ সালের জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর এই চার মাস স্বাস্থ্য সহকারীরা তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে ধর্মঘট করেন। সে সময় তারা আন্দোলনের অংশ হিসেবে টিকাদানের তথ্য নিয়মিত আপডেট করেননি। তারা শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি জিম্মি করে অনিয়মিত রিপোর্ট বা কমপ্লিট শাটডাউনের মতো কর্মসূচি পালন করেন। অনলাইন রিপোর্টদানে বিরত থাকার ফলে ড্যাশবোর্ডে টিকার কাভারেজের অসম্পূর্ণ তথ্যই দেখা যাচ্ছিল। পরে এই অসম্পূর্ণ তথ্যই একাধিক গণমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।
কী কারণে স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলন!
টিকা না পাওয়ার সংকট নয়, কিছু মানুষের অসচেতনতার কারণে টিকাদান বন্ধ ছিল। এছাড়া কর্মীরা বেশকিছু দিন আন্দোলন করে টিকা কার্যক্রম ব্যাহত করেন। বেতন গ্রেড উন্নীতকরণের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই হাজার হাজার স্বাস্থ্য সহকারী দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাদের এই বেতন বৃদ্ধির দাবি বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের কর্মচারীদের মধ্যে বেতন-বৈষম্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অথবা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে কখনই ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা সম্ভব হয়নি। যে কারণে স্বাস্থ্য সহকারীরা শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম জিম্মি করে আন্দোলন শুরু করলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে বাধ্য হয়। এই সমঝোতার পর তারা টাইফয়েড টিকার ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ করে। যদিও এই আন্দোলন এখন নেই।
তৎকালীন সরকারের অনেকের দাবি, এটি তখনকার রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের ওপর চাপ দিতে বিভিন্ন খাতের লোকজনকে দাবি আদায়ে মাঠে নামায়।
তারা বলছেন, শুধু শিশুদের টিকাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার স্বার্থে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এ ধরনের জটিল দাবির বিষয়ে প্রথমবারের মতো ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলন প্রত্যাহারে রাজি করিয়েছে। তবু, স্বাস্থ্য সহকারীদের মধ্যে কয়েকজন নেতা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সরকারকে জিম্মি করে নিজেরা টিকাদান থেকে বিরত থেকেছেন এবং অন্য সহকর্মীদেরও বিরত থাকতে বাধ্য করেন। ফলে স্থায়ীকেন্দ্রগুলোতে টিকাদান কার্যক্রম চললেও মাঠ পর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম ক্ষেত্রবিশেষে তিন থেকে ছয়বার ব্যাহত হয়েছে। এই প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সরকারের একান্ত প্রচেষ্টায় ৯০ শতাংশের ওপর হামের টিকাদান সম্ভব হয়েছে।
আরও পড়ুন
শুধু টিকা দিয়েই শিশুদের হাম প্রতিরোধ সম্ভব
হামের উপসর্গ নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেলে আরও এক শিশুর মৃত্যু
কুমিল্লায় হামের প্রকোপ বাড়ছে, আরও এক শিশুর মৃত্যু
কুষ্টিয়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে একদিনে হাসপাতালে ভর্তি ২৮
টিকাদানে উপযুক্ত হওয়ার আগেই আক্রান্ত!
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) হামের টিকা শিশুর ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। তবে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিককালে আক্রান্ত শিশুদের শতকরা প্রায় ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম।
অর্থাৎ হামের টিকা নেওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠার আগেই তারা হামে আক্রান্ত হয়েছে। হামের টিকা নেওয়ার বয়সের আগেই আক্রান্ত হওয়ার কারণ মায়েদের যথেষ্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকা, মায়েদের কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে যথেষ্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্থানান্তর না হওয়া, হার্ড ইমিউনিটি থ্রেসহোল্ড অর্জিত না হওয়া এবং শিশুদের অপুষ্টি ও ভিটামিন ঘাটতি দুষছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ বিষয়ে গবেষণার দাবি থাকলেও কার্যত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
টিকা আছে পর্যাপ্ত, ক্যাম্পেইন হয়নি কেন?
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, হামের টিকার ক্যাম্পেইন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় টিকা সময়মতো দেশে এসেছে। ক্যাম্পেইন পরিচালনার জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল জুন ২০২৬, যা পরিস্থিতির কারণে এগিয়ে এপ্রিলে নিয়ে আসা হয়েছে। ক্যাম্পেইনের টিকা সাধারণত গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অব ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের (জিএভিআই) অর্থায়নে ও তত্ত্বাবধানে ইউনিসেফের মাধ্যমে ক্যাম্পেইন তারিখের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সরবরাহ করা হয়। সে কারণে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী হামের টিকা ক্যাম্পেইনের জন্য প্রয়োজনীয় টিকার প্রথম শিপমেন্ট ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখ এবং সর্বশেষ শিপমেন্ট ১৩ মার্চ বাংলাদেশে এসেছে।
বর্তমানে দেশে ২ কোটি ৯ লাখ ডোজ হামের টিকা আছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেই চূড়ান্ত করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই উদ্যোগের ফলে টিকা দেশে থাকার কারণেই ৫ এপ্রিল থেকে জরুরি ভিত্তিতে ক্যাচ-আপ টিকাদান শুরু করা সম্ভব হয়েছে।
এমনকি সে কারণেই ২০ এপ্রিল থেকে জাতীয় পর্যায়ে হামের টিকার ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। ক্যাম্পেইন পরিচালনায় আরও প্রায় ১ কোটি টিকার প্রয়োজন হবে, যেগুলো পূর্বনির্ধারিত শিডিউল অনুযায়ী মে মাসের মাঝামাঝি এসে দেশে পৌঁছানোর কথা।
আরও পড়ুন
অর্ধশত শিশুর মৃত্যু, হাম নয় তবে কী?
হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু
বান্দরবানে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকা আমদানি করা হয়নি: প্রধানমন্ত্রী
টিকা কেনায় কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে সরকার?
সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার টিকা কিনতে আগের তুলনায় অনেক বেশি বরাদ্দ দিয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২২৭ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৪০ কোটি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৬২ কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার টিকা ক্রয়খাতে বরাদ্দ করে ১ হাজার কোটি টাকা অর্থাৎ দ্বিগুণেরও বেশি।
এর মধ্যে ৮৪২ কোটি টাকা শুধু ইপিআইয়ের টিকাগুলো কিনতে বরাদ্দ করা হয়। ইপিআইয়ের টিকা কেনায় বরাদ্দ করা অর্থের মধ্যে ৪১৯ কোটি টাকা ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ‘সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটি’ কর্তৃক অনুমোদিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।
একইসঙ্গে জিএভিআই ট্রান্সন্যাশনাল প্ল্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সরকারের কো-ফিন্যান্সিংয়ে নির্ধারিত দায়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩৬৬ কোটি টাকা)। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিজস্ব অর্থায়নের মাধ্যমে ২১ মিলিয়ন ডলার এবং বাকি অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাজনিত জটিলতা এড়ানোর জন্য ইউনিসেফের কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রি-ফাইনান্সিং সহায়তায় ৯ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজস্বখাত থেকে নিজস্ব অর্থ, ব্যাংক ও দাতা সংস্থা থেকে প্রাপ্ত ঋণের অর্থ দিয়ে ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টিকা ক্রয় কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে।
টিকা সংগ্রহ/ক্রয় প্রক্রিয়ায় কী হয়েছিল?
টিকা সংগ্রহ/ক্রয় প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের পরিবর্তন হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইপিআইয়ের সব টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমেই সংগ্রহ/ক্রয় করেছে। ইপিআইয়ের টিকা কেনার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে ‘উন্মুক্ত টেন্ডার পদ্ধতি’ অনুসরণ করার জন্য যে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হয় সে সময় হাতে না থাকায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের পরিবর্তন করা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে চলমান প্রক্রিয়ায়ই সব টিকা কেনা হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের রাজস্বখাতের বরাদ্দ করা অর্থের বাকি টাকা (প্রায় ৪২৩ কোটি) এবং এডিবি থেকে করোনার টিকা কেনার জন্য এশিয়া প্যাসিফিক ভ্যাকসিন অ্যাক্সেস ফ্যাসিলিটির (এপিভিএক্স) ঋণের অর্থ একই উদ্দেশ্যে প্রায় ৬১০ কোটি টাকার ইপিআইয়ের টিকাও একই প্রক্রিয়ায় ইউনিসেফের মাধ্যমে ক্রয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তবে আগে জিএভিআইসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার অনুদান, সাহায্য বা ঋণের টাকায় টিকা সংগ্রহ/ক্রয় করা হলেও বর্তমানে জিএভিআই ট্র্যান্সন্যাশনাল প্ল্যান অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে সরকারকে নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ বাড়াতে হচ্ছে বিধায় হয়তো আগামীতে রাষ্ট্রীয় অর্থের নিয়মিত ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করে যথাযথ ও সময়োপযোগী পদ্ধতি অনুসরণ করতে হতে পারে। ইপিআইয়ের টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার বিষয় কখনই কোথাও উপস্থাপন করা হয়নি বা কোনো ধরনের আলোচনাও করা হয়নি। এই প্রক্রিয়ায় শুধু জিএভিআই, ইউনিসেফ, এডিবি, ওয়ার্ল্ড, হু এ ধরনের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোই যুক্ত।
যা বলছে কর্তৃপক্ষ
এ বিষয়ে সদ্য সাবেক স্বাস্থ্য সচিব মো. সাইদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘টিকা ক্রয়ের কোনো ফাইল আমরা আটকাইনি। বরং এসব বিষয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হয়েছে। আমার দায়িত্বের সময় টিকার কোনো সংকটের কথাও শুনিনি। ক্রয়, সরবরাহ এবং মাঠ পর্যায়ে টিকাদান; সব কিছুই নিয়ম মেনে হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মীদের আন্দোলনের বাইরে কোথাও ব্যত্যয়ও ঘটেনি।’
এ বিষয়ে বর্তমান স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরীর বক্তব্য নিতে তার মুঠোফোনে চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
গত ৩০ এপ্রিল রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে হামের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আশ্বস্ত করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাম ও ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। ভ্যাকসিনসহ মানবসম্পদে কোনো কিছুরই সংকট নেই। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শতভাগ শিশু টিকার আওতায় আসবে। শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে একটু সময় লাগে। কাজেই শিগগির হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করি।
তাহলে সমস্যাটা আসলে কোথায়? এমন প্রশ্নের জবাবে ইপিআইয়ের এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, সমস্যা মানুষের, যারা সচেতন নয়। তারা টিকা দেয়নি (সন্তানদের), দেয় না। আর কিছু আছে, আজকে গিয়ে কোনো কারণে টিকা পায়নি, পরে আর গিয়ে গরজ করে টিকা দিয়ে নেয়নি। এরকম অসাবধানতা ছাড়া কোনো সমস্যা ছিল না।
তিনি বলেন, আমাদের বেশিরভাগ টিকাদান কেন্দ্রে টিকার ঘাটতি ছিল না। এখনও নেই। তবে, অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রে কর্মসূচির দিন পরিকল্পনা মতো হয়ত ৩০০ শিশুর প্রস্তুতি নিয়ে গেছে, কোনো কারণে ৫০টি শিশু বেশি আসছে। তখন হয়তো তাদের ফিরে যেতে হয়েছে। পরের সপ্তাহে এটা রিকভার করা হয়েছে বা তাদের স্থায়ী কেন্দ্রে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তার দাবি, টিকা সরবরাহ আগেও স্বাভাবিক ছিল। এখনও স্বাভাবিক আছে। এ নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। টিকাদান কার্যক্রমেও ঘাটতি হয়নি। কোথাও টিকা নেই এমন ঘটনাও নেই। হ্যাঁ, রাস্তাঘাটের ব্যাপার, সরবরাহে এক-দুদিন দেরি হতে পারে। কিন্তু কোথাও সংকট ছিল না।
আরও পড়ুন
চিকেনপক্স ও হাম কি একই? দেখতে এক রকম হলেও পার্থক্য জানুন
মহামারি থেকে প্রজন্মকে রক্ষায় সরকার অনেক আগেই কার্যক্রম শুরু করেছে
হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া উদ্বেগজনক: সড়ক প্রতিমন্ত্রী
হামের প্রাদুর্ভাব রোধে ঘরে ঘরে গিয়ে টিকার তথ্য দেওয়ার আহ্বান
ইপিআইয়ের উপপরিচালক ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার আগে জাগো নিউজকে বলেছিলেন, টিকার কোনো সংকট নেই। সরবরাহ স্বাভাবিক।
এনিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ইপিআইয়ের টিকা ক্রয় পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি; আগের মতোই সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট ২০২৬ অনুসরণ করে ক্রয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। হামের টিকাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টিকা সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে কেনা হয়, আর কিছু টিকার ক্ষেত্রে জিএভিআইর সঙ্গে যৌথ অর্থায়ন থাকে। জরুরি প্রয়োজনে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড (ডিটিএম) ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হলেও এটি ছিল আইনি কাঠামোর মধ্যেই একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা—স্থায়ী কোনো নীতিগত পরিবর্তন নয়। একই সঙ্গে এডিবি ঋণের অর্থ পুনর্বিন্যাস করেও ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে, যা বিদ্যমান নিয়মের মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।
ডা. সায়েদুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে একই জরুরি পদ্ধতি ব্যবহার করলে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, তাই ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক ও আইনসম্মত পদ্ধতি—যেমন ওপেন টেন্ডার মেথড (ওটিএম) বা লং টার্ম অ্যাগ্রিমেন্ট অনুসরণ করা যৌক্তিক হবে। তবে বাস্তবে এখন পর্যন্ত কোনো টিকাই ওটিএম পদ্ধতিতে কেনা হয়নি এবং নতুন কোনো টেন্ডার প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়নি। বরং সরকার টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাজেট বাড়িয়েছে এবং জিএভিআইয়ের সঙ্গে চুক্তির আওতায় ক্যাম্পেইন চালিয়ে গেছে, যা সরকারের টিকাদান কর্মসূচির প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, মাঠ পর্যায়ে টিকার সংকট নেই। ইপিআই বলছে, টিকার সংকট নেই। আগের সরকারের দায়িত্বে থাকা লোকজনও বলছে, টিকা ক্রয় স্বাভাবিক ও চলমান পক্রিয়ায় হয়েছে। কোথাও ব্যত্যয় ঘটেনি। তাহলে দায় চাপানোর হেতু কী? সমস্যার গভীরে কী?
এসইউজে/এমআরএম/এমএমএআর/এমএফএ
What's Your Reaction?