হামে শিশুমৃত্যু ও শূন্যের ফেরিওয়ালা
গত এক মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে ৩০০ জনের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শত শত শিশুর শবযাত্রা দেখে একজন মানুষের কথাই মনে পড়ছে। তিনি ছিলেন কথার জাদুকর। কত কথা বলেছেন। কত আশা জুগিয়েছেন। শুধু জুগিয়েছেন—পালন করেননি একটিও। যেমন মেঘ ভেসে আসে বৃষ্টির প্রতিশ্রুতি নিয়ে, তারপর বিনা বৃষ্টিতে শুকিয়ে যায় বাতাসে, তেমনি তাঁর বাণী এসে লেগেছিল আমাদের চোখে-মুখে, কানে-মগজে। কিন্তু দিন শেষে আমরা বুঝেছি, শূন্যতাই রয়ে যায় শুধু। বাকি সব ফাঁকি। মায়া। কথার মায়া। ভোরের স্বপ্ন যার মধ্যাহ্ন পর্যন্ত টেকেনি। একদা এক জ্ঞানী বলেছিলেন— ‘স্বপ্ন দেখতে নেই, স্বপ্ন পূরণের জন্য কাজ করতে হয়।’ কিন্তু বাংলাদেশ বড়ই ভাগ্যবান—এখানে স্বপ্ন দেখাই এক ধরনের কর্মসূচি। কাজ নেই, ওয়ার্কশপ আছে। চাকরি নেই, সেমিনার আছে। উন্নয়ন নেই, উন্নয়নের পরিকল্পনার পরিকল্পনার পরিকল্পনা আছে। আর সেই কর্মসূচির প্রধান পরিকল্পনাকারী, সেই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা, সেই কথার জাদুকর—আমাদের প্রিয় ড. মুহাম্মদ ইউনূস। থ্রি জিরো তত্ত্বের মহাগুরু, নোবেলজয়ী সম্রাট, যাঁর হাতের ছোঁয়ায় সমস্যা অদৃশ্য হয়ে যায় শুধু বাক্যবাণে। কথা বললেই যেন মিলিয়ে যায় দারিদ্র্য, উধাও হয় বেকারত্ব,
গত এক মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে ৩০০ জনের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শত শত শিশুর শবযাত্রা দেখে একজন মানুষের কথাই মনে পড়ছে। তিনি ছিলেন কথার জাদুকর। কত কথা বলেছেন। কত আশা জুগিয়েছেন। শুধু জুগিয়েছেন—পালন করেননি একটিও। যেমন মেঘ ভেসে আসে বৃষ্টির প্রতিশ্রুতি নিয়ে, তারপর বিনা বৃষ্টিতে শুকিয়ে যায় বাতাসে, তেমনি তাঁর বাণী এসে লেগেছিল আমাদের চোখে-মুখে, কানে-মগজে। কিন্তু দিন শেষে আমরা বুঝেছি, শূন্যতাই রয়ে যায় শুধু। বাকি সব ফাঁকি। মায়া। কথার মায়া। ভোরের স্বপ্ন যার মধ্যাহ্ন পর্যন্ত টেকেনি।
একদা এক জ্ঞানী বলেছিলেন— ‘স্বপ্ন দেখতে নেই, স্বপ্ন পূরণের জন্য কাজ করতে হয়।’ কিন্তু বাংলাদেশ বড়ই ভাগ্যবান—এখানে স্বপ্ন দেখাই এক ধরনের কর্মসূচি। কাজ নেই, ওয়ার্কশপ আছে। চাকরি নেই, সেমিনার আছে। উন্নয়ন নেই, উন্নয়নের পরিকল্পনার পরিকল্পনার পরিকল্পনা আছে। আর সেই কর্মসূচির প্রধান পরিকল্পনাকারী, সেই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা, সেই কথার জাদুকর—আমাদের প্রিয় ড. মুহাম্মদ ইউনূস। থ্রি জিরো তত্ত্বের মহাগুরু, নোবেলজয়ী সম্রাট, যাঁর হাতের ছোঁয়ায় সমস্যা অদৃশ্য হয়ে যায় শুধু বাক্যবাণে। কথা বললেই যেন মিলিয়ে যায় দারিদ্র্য, উধাও হয় বেকারত্ব, অবলুপ্ত হয় কার্বন। কী চমৎকার এক কাণ্ড!
শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন নিঃসরণ—শুনতে এমন যে, মনে হয় জাতিসংঘের কনফারেন্স রুমে বসে পৃথিবীটাই নতুন করে ডিজাইন হয়ে যাচ্ছে। অক্সফোর্ডের গম্ভীর সেমিনার হল থেকে হার্ভার্ডের ক্যাম্পাস, এক্সেটার থেকে সোরবোন, সব জায়গায় একই সুর—সামাজিক ব্যবসা, মানবতার অর্থনীতি, তিন শূন্যের সোনালি ভবিষ্যৎ। বক্তৃতা শুনে শ্রোতারা এমনভাবে মাথা নাড়েন, যেন পরের দিন থেকেই পৃথিবী ইউটোপিয়া হয়ে যাবে। অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসে তাঁদের টুপি ওড়ার জোগাড়।
প্রশ্ন হলো, এই শূন্যগুলো কি বাস্তবের মাটিতে দাঁড়াতে পেরেছে, নাকি শূন্যের ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে? বাস্তবের লেন্স দিয়ে দেখলে ছবিটা একটু অন্যরকম। এই থ্রি জিরো আসলে তিনটি দার্শনিক বুদবুদ— ছুঁলেই ফুসস। আর সেই বুদবুদের ভেতর খুঁজে পাওয়া যায় বাংলাদেশের জনগণের করুণ পরিণতি।
প্রথম কথা হলো, দারিদ্র্যহীনতার জিরো। ইউনূসের ক্যানভাসে দারিদ্র্য যেন মায়াবী জাদুতে মুছে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে কী পেলাম? দারিদ্র্য যায়নি, বরং ‘দারিদ্র্য নিয়ে আলোচনা’ বেড়েছে। গরিব মানুষ এখনও গরিব, তবে এখন তারা অন্তত জানে যে তারা ‘সোশ্যাল বিজনেস মডেলের অংশগ্রহণকারী’। আগে ক্ষুধার্ত ছিল, এখন ক্ষুধার্ত প্লাস কনসেপ্টুয়ালি আপগ্রেডেড। মানবতার বাণী এসে ঠেকেছে এখানেই।
দ্বিতীয় জিরো—বেকারত্বহীনতা। আকাশ থেকে মুড়ি পড়ার মতো অলৌকিক এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবতা কী? কাজ নেই, তবে ওয়ার্কশপ আছে। চাকরি নেই, কিন্তু সেমিনার আছে। যুবকরা এখন আর বেকার নয়—তারা ‘সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ’ অথবা ‘স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের অংশ’। বেকারত্বকে শব্দ দিয়ে মেরে ফেলা—এ এক নতুন অর্থনৈতিক আবিষ্কার, যার পেটেন্ট নেওয়া উচিত।
তৃতীয় জিরো—কার্বন নিঃসরণ শূন্য। বাংলাদেশের উন্নয়নশীল শহরগুলোতে কলকারখানার ধোঁয়া, গাড়ির কালো কুয়াশা। অথচ এই তত্ত্বের জাদুতে কার্বন তো কমেনি, বরং কথার ধোঁয়া এত বেড়েছে যে আসল ধোঁয়াই চোখে পড়ে না।
অর্থাৎ, থ্রি জিরো এখন দাঁড়িয়েছে এভাবে: শূন্য বাস্তবতা, শূন্য জবাবদিহি, শূন্য ফলাফল। এই তিন শূন্য গুণ করলে ফল হয়—আরেকটি বিশাল শূন্য। অথচ দেশ সেই শূন্য ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।
যাঁরা একটু খোলা চোখে দেখতে পান, তাঁরা জানেন, ইউনূসের থ্রি জিরোর উল্টো পিঠে আঁকা রয়েছে আরেক ত্রয়ী—মব, সন্ত্রাস ও মিথ্যা। কী আশ্চর্য সমীকরণ! একদিকে সামাজিক ব্যবসার পোস্টার, অন্যদিকে রাস্তায় নামানো জনতা। এক দিকে মানবতার মৃদুভাষী প্রচারক, অন্যদিকে সংবিধান যেন শুকনো পাতা—যাকে ইচ্ছে উড়িয়ে দেওয়া যায়।
শূন্যতা সয়ে যায়, কিন্তু শিশুদের মৃত্যু সয়ে যায় না। টিকার অভাব যখন সেখানে সরকারি ব্যর্থতা, সেখানে তিন শূন্যের বুলি কেবল কুঠারাঘাত। ড. ইউনূস ও তাঁর পারিষদদের এই উপহারের মূল্য দিচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা। পরকালে হয়তো জিজ্ঞাসিত হবেন এই প্রশ্নে—তোমার থ্রি জিরো দিয়ে শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছ, না ফিরিয়ে দিয়েছ? উত্তরটা শূন্যই থাকবে। যেমন শূন্য রেখে গেছেন তিনি বাংলার প্রতিটি প্রতিশ্রুতিতে!
দেশের মানুষ যখন দেখল যে নিরপেক্ষতার নাম করে সরকারি কর্মচারীদের দিয়ে নির্দিষ্ট পক্ষের ‘হ্যাঁ ভোটে’র প্রচার চালানো হচ্ছে, তখন তারা বুঝতে পারল—এই গরুর গলায় আর ঘণ্টি পড়েনি, বরং ঘণ্টা বাজিয়ে পথ দেখানো হচ্ছে কীভাবে ন্যায়ের পথে হাঁটতে হয়। অথচ ইউনূস কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নন! সেজন্য তাঁর কথা ছিল নিরপেক্ষ থাকার। কিন্তু সেই নিরপেক্ষতা বর্জন করে তাঁর প্রশাসন পক্ষপাতের জ্বলন্ত উদাহরণ। বাংলার জনগণ কপাল চাপড়ে ভাবে—এ কীরূপ জাদু, যেখানে সরকারি কর্মচারীরা এক পক্ষের প্রচারক, আবার জনগণ সেটা মেনে নেয় নীরবে?
তবে সবচেয়ে নির্মম জিরোটি এসেছে শিশুদের জীবনে। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশের শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয়নি—এ তথ্য এখন আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে ইউনিসেফ। টিকা না দেওয়ায় প্রকল্পের বরাদ্দ বাতিল করায় হাম মহামারি আকার ধারণ করেছে। সেই শূন্য প্রয়াস শূন্য ব্যবস্থাপনার জেরে আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে নির্মল শিশুরা। বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। প্রতিদিন বহু শিশুর মৃত্যুতে ভরে উঠছে কবরস্থান। গোরস্তানের ছোট ছোট ঢিবি যেন এক একটি করে প্রশ্নবাণ—তোমাদের থ্রি জিরো দিয়ে ওদের জীবন ফিরে পাবে? তোমাদের সামাজিক ব্যবসার বুলিতে কি ওদের বুকে প্রাণ ফিরবে?
হামের টিকা একটি শিশুর মৌলিক প্রাপ্য। সেটুকুও যেখানে নিশ্চিত করতে পারেনি ড. ইউনূসের সরকার, সেখানে তিন শূন্যের স্বপ্নবিলাস শুধু হাস্যকরই নয়, বরং নিষ্ঠুর ব্যঙ্গ। ইউনিসেফ বরাদ্দ বাতিল করেছে, আর বাংলাদেশের শিশুরা বিনা টিকায় মরছে। এই এক একটি মৃত্যু যেন এক একটি সই—যিনি স্বাক্ষর করেছেন থ্রি জিরোর ফেরিওয়ালা নিজেই। আজ কবরস্থানের শূন্যসারি, শিশুশরীরের শূন্যতা, বাবা-মায়ের বুকের ফাঁকা জায়গা—এটাই বাস্তবের থ্রি জিরো। যা আসলে একটা শূন্যই বটে! ড. ইউনূস ও তাঁর পারিষদদের উপহার। শূন্য টিকা, শূন্য করুণা, শূন্য জবাবদিহি।
এদিকে নিজেকে নিজে ভিভিআইপি ঘোষণা করা একমাত্র ব্যক্তি ড. ইউনূস বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ‘বাংলাদেশ মডেল’ নামের পণ্য বিলিয়ে, আর দেশের ভেতর ফাঁকা কলসি বেজে চলেছে কর্কশভাবে। কী অসাধারণ এক পরিহাস!
সবচেয়ে দুঃখজনক পর্বটি আসে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে। ড. ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন এক চুক্তি করে গেছেন—নাম যার উন্নয়ন অংশীদারত্ব। অনেককাল যে চুক্তির খেসারত দেবে দেশ ও জনগণ। জনগণের চিৎকারের ভাষা এখন একটাই—এই চুক্তির হিসাব দিতে হবে। দেশ ও জনগণের স্বার্থবিরোধী এই সর্বনাশা চুক্তি পর্যালোচনা করে বাতিল করতে হবে। কারণ এটি আর বাণিজ্যের চুক্তি নয়, এ হলো রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ওপর বিষাদগ্রস্ত দলিল।
উপসংহারে এসে প্রশ্নটা বেশ সহজ হয়ে যায়—এই থ্রি জিরো তত্ত্ব থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি কী? উত্তরটা অনবদ্য: ইয়াব্বড় এক শূন্য। শান্তিতে শূন্য—যেখানে সংবিধানকে দগ্ধ করা হয় দিবালোকে। নিরাপত্তায় শূন্য—যেখানে আইনের শাসন টালমাটাল, আর জনগণ নিরাপত্তাহীনতায় জর্জরিত। অগ্রগতিতেও শূন্য—যেখানে অর্থনীতির চাকা খসে পড়ার উপক্রম। আর দেশের যুব সমাজ বেকারত্বের মিছিলে সামিল। স্বাস্থ্যে শূন্য—যেখানে হামের টিকা না পেয়ে শিশুরা মরছে নির্মমভাবে। এ চার শূন্য আমাদের উপহার। আইয়্যামে জাহেলিয়াত আমরা দেখি নাই, অথচ দেখতে বাধ্য হচ্ছি লাইভ টেলিকাস্টে।
ইতিহাস খুব নির্দয় জিনিস। সে বক্তৃতা শোনে না, স্লাইড দেখে না—সে শুধু ফলাফল দেখে। আর যদি ফলাফল সত্যিই শূন্য হয়, তাহলে ইতিহাস একদিন খুব ঠান্ডা হাতে লিখে দেবে— ‘একজন এলেন, তিনটি শূন্য দিলেন, আর রেখে গেলেন একটি বড় শূন্যতা। শেষরাতে তার কাঁধে ছিল অহংকার, আর পকেটে ভর্তি বন্ড ও ব্যবসার কাগজ। কিন্তু মানুষের হাতে ছিল শুধু খালি হাত আর শূন্যগর্ভ প্রত্যাশা।’
ততদিন পর্যন্ত দর্শকসারিতে বসে থাকুন, হাততালি দিন—কারণ ম্যাজিক শো এখনো চলছে। কবরের সারি বেড়ে চলেছে, হামের টিকাবঞ্চিত শত শিশুর লাশ দেখিয়ে ড. ইউনূস যেন বলছেন তাঁর বিখ্যাত বাণী—‘দেখুন, কিছুই নেই!’ আর আমরা মহাবিস্ময়ে বলছি—দেখছি স্যার, দেখছি। তিন শূন্যের রাজা দেশকে দিয়েছেন শুধু এক শূন্যতা। আর এ শূন্যতা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ‘থ্রি জিরোর মহাভোজ’ নামে—যেখানে প্রধান মেনু ছিল অলীক বুলি, অ্যাপেটাইজার ছিল টিকাবিহীন মহামারি, আর ডেজার্ট ছিল হতাশা।
শূন্যতা সয়ে যায়, কিন্তু শিশুদের মৃত্যু সয়ে যায় না। টিকার অভাব যখন সেখানে সরকারি ব্যর্থতা, সেখানে তিন শূন্যের বুলি কেবল কুঠারাঘাত। ড. ইউনূস ও তাঁর পারিষদদের এই উপহারের মূল্য দিচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা। পরকালে হয়তো জিজ্ঞাসিত হবেন এই প্রশ্নে—তোমার থ্রি জিরো দিয়ে শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছ, না ফিরিয়ে দিয়েছ? উত্তরটা শূন্যই থাকবে। যেমন শূন্য রেখে গেছেন তিনি বাংলার প্রতিটি প্রতিশ্রুতিতে!
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক। কলামিস্ট।
এইচআর/এমএস
What's Your Reaction?