হামের টিকা, শিশু মৃত্যু ও জনস্বাস্থ্য

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ টিকাদান কর্মসূচিতে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত একটি দেশ। এক সময় হাম নির্মূলের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি  অর্জন করেছিল দেশটি কিন্তু  বিগত কয়েকটি বছরে এর ভয়াবহতাকে কম গুরুত্ব দেওয়ায়  ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। দেশের প্রায় সব বিভাগ ও অধিকাংশ জেলায় (প্রায় ৫৮টি জেলায়) হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা। সত্যি এটা দুঃখজনক যে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে শতশত শিশুর মৃত্যু হচ্ছে যা - শুধুই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নয়, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মাত্র আড়াই মাসের মধ্যে (১৫মার্চ -৩০মে) দেশে ৬৩ হাজারের কাছাকাছি হামের সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং প্রায় ৬০০-এর মত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই মে মাসে  প্রতিদিন প্রায় এক হাজারের অধিক আক্রান্ত হয়েছে; সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্তের প্রায় ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং অধিকাংশ মৃত্যুই ঘটেছে টিকা না পাওয়া অথবা অসম্পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের মধ্যে। একটি কথা জানা দরকার হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে আক্রান্ত হতে

হামের টিকা, শিশু মৃত্যু ও জনস্বাস্থ্য

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ টিকাদান কর্মসূচিতে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত একটি দেশ। এক সময় হাম নির্মূলের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি  অর্জন করেছিল দেশটি কিন্তু  বিগত কয়েকটি বছরে এর ভয়াবহতাকে কম গুরুত্ব দেওয়ায়  ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। দেশের প্রায় সব বিভাগ ও অধিকাংশ জেলায় (প্রায় ৫৮টি জেলায়) হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা। সত্যি এটা দুঃখজনক যে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে শতশত শিশুর মৃত্যু হচ্ছে যা - শুধুই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নয়, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

মাত্র আড়াই মাসের মধ্যে (১৫মার্চ -৩০মে) দেশে ৬৩ হাজারের কাছাকাছি হামের সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং প্রায় ৬০০-এর মত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই মে মাসে  প্রতিদিন প্রায় এক হাজারের অধিক আক্রান্ত হয়েছে; সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্তের প্রায় ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং অধিকাংশ মৃত্যুই ঘটেছে টিকা না পাওয়া অথবা অসম্পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের মধ্যে।

একটি কথা জানা দরকার হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে আক্রান্ত হতে পারে  ১২ থেকে ১৮ জন। ফলে জনবহুল দেশ বাংলাদেশে টিকাদানের সামান্য ঘাটতিও বড় ধরনের সংক্রমণ হতে পারে। এই সংক্রমণের জন্য বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন- প্রথমত, ২০২৪ -২৫ সময়ে হাম-রুবেলা টিকার সরবরাহ সংকট দেখা দেয়। এর ফলে বহু শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হয়। দ্বিতীয়ত, করোনাকালীন করোনার টিকাকে অধিক  গুরুত্ব দিতে গিয়ে ২০২০ সালের পরদীর্ঘ সময় জাতীয় পর্যায়ে বড় আকারের সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান অভিযান হয়নি। ফলে বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়। তৃতীয়ত, শহরের বস্তি, দুর্গম গ্রামাঞ্চল এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকাদানের হার সব সময়ই  তুলনামূলক কম ছিল। এই বৈষম্য বর্তমান সংক্রমণ বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে। চতুর্থত, টিকা সম্পর্কে গুজব, অসচেতনতা এবং স্বাস্থ্য সেবার সীমিত প্রাপ্যতাও  এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কারণ। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে ঢাকা বিভাগ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এরপর রয়েছে রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগ। এর কারণ সহজেই অনুমেয় রাজধানী ঘনবসতিপূর্ণ, রাজধানীর মধ্যে আবার   ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর ও তেজগাঁও এলাকায় জনঘনত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি, তাই  সংক্রমণের হার, যা হাম জাতীয় সংক্রমণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। হামকে অনেকেই সাধারণ রোগ মনে করলেও বাস্তবে এটি নিউমোনিয়া , ডায়রিয়া, অপুষ্টি, অন্ধত্ব এবং মস্তিষ্কের জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষ করে অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়, যা দেখা যাচ্ছে।  বাংলাদেশে চলমান প্রাদুর্ভাবে মৃত শিশুদের বড় অংশই দুই বছরের কম বয়সী এবং টিকা না পাওয়া শিশু। অনেক ক্ষেত্রে রোগ শনাক্ত হওয়ার আগেই অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে। প্রতিদিনই নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। হামের প্রাদুর্ভাব শুধু একটি রোগের বিস্তার নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়। প্রথমত, হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছে। দ্বিতীয়ত, অন্যান্য জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তৃতীয়ত, অপুষ্টি ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে মৃত্যুহার বৃদ্ধির  সম্ভাবনা বেশি। চতুর্থত, ভবিষ্যতে ডিপথেরিয়া, রুবেলা বা পোলিওর মতো টিকা-প্রতিরোধযোগ্য রোগের পুনরুত্থানের আশঙ্কাও রয়েছে।

বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি দক্ষিণ এশিয়ায় একটি সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। ২০০০ সালের পর থেকে হামের টিকার আওতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। প্রথম ডোজ ও দ্বিতীয় ডোজ উভয়ের কভারেজ উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছায়। এর ফলে হামের প্রকোপ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকা সরবরাহ ঘাটতি, নিয়মিত কার্যক্রম বিঘ্ন এবং টিকাদানের আওতার বৈষম্য পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে,বর্তমান সংকট মূলত দীর্ঘদিনের সঞ্চিত স্বাস্থ্যখাতে অব্যবস্থাপনা ও ঘাটতির ফল।

প্রাদুর্ভাবের শুরুতেই বর্তমান সরকারের তড়িৎ পদক্ষেপ ও পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে জরুরি ভিত্তিতে হাম-রুবেলা টিকা সংগ্রহের যথাযথ ব্যবস্থা ও টিকাদান অভিযান শুরু করেছে। প্রথমে ১৮টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলার ৩০টি উপজেলায় কর্মসূচি চালু করা হয়। পরে তা সারা দেশে সম্প্রসারিত করা হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা , ইউনিসেফ ও গ্যাভি যৌথভাবে টিকা সরবরাহ, নজরদারি বৃদ্ধি, ল্যাব সক্ষমতা উন্নয়ন এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল গঠন করেছে। এছাড়া কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ব্যাপক টিকাদান পরিচালনা করা হয়েছে এবং ইতিমধ্যে লক্ষাধিক শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। তদুপরি সরকার শিশুদের মধ্যে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল বিতরণ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করেছে, যা  আশাব্যঞ্জক।

সরকারের আন্তরিকতা থাকলেও যেহেতু প্রতিদিন প্রায় সহস্রাধিক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, ফলে যে পর্যন্ত সকল শিশু দুই ডোজ টিকা না পাবে সে পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা খুব সহসাই কমবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন না। সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এক্ষেত্রে খুব দ্রুত সরকারের সার্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি শিশুকে দুই ডোজ হাম-রুবেলা টিকার আওতায় আনতে হবে; টিকা সরবরাহ ব্যবস্থাকে শতভাগ নিরবচ্ছিন্ন করতে হবে; বস্তি, চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি  দ্রুত চালাতে হবে; হামের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের বিষয়ে গণসচেতনতা বাড়াতে হবে। বিদ্যালয়, মসজিদ, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে; রোগ নজরদারি ব্যবস্থাকে আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর করতে হবে;  স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বৃদ্ধি এবং শিশুস্বাস্থ্যকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে তাহলেই এ প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

একটি শিশুর মৃত্যু শুধুই একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যতের অকাল সমাপ্তি। হামের মতো সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগে শত শত শিশুর মৃত্যু কোনো আধুনিক সমাজের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। টিকার ঘাটতি , ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কিংবা কারো দায়িত্ব পালনে অবহেলার ফলে যদি একটি শিশুর জীবনও হারিয়ে যায়, তবে তার দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। আজকের অবহেলা যেন আগামী দিনের আরেকটি শিশু মৃত্যুর কারণ না হয়, এই প্রত্যয়েই এগোতে হবে বাংলাদেশকে।

লেখক: অধ্যাপক ড. দিলীপ কুমার সাহা, সাবেক অধ্যক্ষ, সরকারি ভিকু মেমোরিয়াল কলেজ, মানিকগঞ্জ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow