হাড়কাঁপানো শীতেও বর্ষার ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া ছড়াচ্ছে আতঙ্ক
মশাবাহিত রোগের মৌসুম হিসেবে সাধারণত বিবেচনা করা হয় বর্ষাকালকে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা দিচ্ছে ভিন্ন তথ্য। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, প্রকৃতিতে শীতের তীব্রতা বাড়লেও কমছে না ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার রোগী। এতদিন ডেঙ্গুকে বর্ষাকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে দেখা হলেও সেই ধারণা অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। জানুয়ারিতে এসে হাড়কাঁপানো শীতেও চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন জনপদে শনাক্ত হচ্ছে ডেঙ্গু রোগী। বর্ষা শেষে সংক্রমণ কমার পরিবর্তে বিদায়ী বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরেও আশঙ্কাজনক হারে ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে দেখা গেছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার সাতটি ওয়ার্ড ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার হটস্পট হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এলাকাগুলো হলো— কোতোয়ালি, বাকলিয়া, ডবলমুরিং, আগ্রাবাদ, চকবাজার, হালিশহর ও পাঁচলাইশ। এসব এলাকায় সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে বেশি বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়েও সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে সীতাকুণ্ড, বোয়ালখালী ও আনোয়ারা উপজেলায় ডে
মশাবাহিত রোগের মৌসুম হিসেবে সাধারণত বিবেচনা করা হয় বর্ষাকালকে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা দিচ্ছে ভিন্ন তথ্য।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, প্রকৃতিতে শীতের তীব্রতা বাড়লেও কমছে না ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার রোগী। এতদিন ডেঙ্গুকে বর্ষাকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে দেখা হলেও সেই ধারণা অনেকটাই ভেঙে পড়েছে।
জানুয়ারিতে এসে হাড়কাঁপানো শীতেও চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন জনপদে শনাক্ত হচ্ছে ডেঙ্গু রোগী। বর্ষা শেষে সংক্রমণ কমার পরিবর্তে বিদায়ী বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরেও আশঙ্কাজনক হারে ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে দেখা গেছে।
এর মধ্যে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার সাতটি ওয়ার্ড ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার হটস্পট হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এলাকাগুলো হলো— কোতোয়ালি, বাকলিয়া, ডবলমুরিং, আগ্রাবাদ, চকবাজার, হালিশহর ও পাঁচলাইশ। এসব এলাকায় সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে বেশি বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়েও সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে ছড়াচ্ছে।
বিশেষ করে সীতাকুণ্ড, বোয়ালখালী ও আনোয়ারা উপজেলায় ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও এআরএফের যৌথ উদ্যোগে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়া সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র নিরূপণ এবং ভবিষ্যৎ জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর কৌশল প্রণয়নের লক্ষ্যে এই গবেষণা পরিচালিত হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, যে সময় ডেঙ্গু সংক্রমণ কমে যাওয়ার কথা, সেই সময়েই চলতি বছর সংক্রমণ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘ সময় উষ্ণ আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং নগর এলাকায় পানি জমে থাকার প্রবণতাকে দায়ী করছেন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে এডিস মশার প্রজননকাল দীর্ঘ হয়েছে।
ফলে ডেঙ্গু কার্যত সারা বছরের রোগে পরিণত হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রামে গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৮৮৭ জন এবং মারা গেছেন ৩১ জন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৯ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বরাদ্দ থাকলেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। বরাদ্দের বড় অংশই কীটনাশক কেনা, ফগিং ইউনিট পরিচালনা ও স্প্রে সরঞ্জামে ব্যয় হচ্ছে। নগরের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত কীটনাশক স্প্রে করা হলেও মশার বিস্তার রোধ করা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ গ্রহণে চসিক এবং সীমান্তবিহীন চিকিৎসক দল (এমএসএফ) ভবিষ্যতে যৌথভাবে কাজ করবে। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া মোকাবিলায় এখন বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।’ নগরবাসীর জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমরা বছরব্যাপী মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করছি।’
চট্টগ্রামের সুপ্রতিষ্ঠিত কয়েকটি হাসপাতালের যৌথ ওই গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, চিকুনগুনিয়া এখন আর স্বল্পমেয়াদি জ্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিসন্ধির ব্যথা, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত রোগীর প্রায় ৬০ শতাংশের ক্ষেত্রে তীব্র অস্থিসন্ধির ব্যথা তিন মাসেরও বেশি সময় স্থায়ী হয়েছে। ভুল রোগ নির্ণয়, পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভাব এবং দুর্বল রিপোর্টিং ব্যবস্থার কারণে প্রকৃত রোগভার অনেকাংশেই অজানা থেকে যাচ্ছে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
এই গবেষণায় চট্টগ্রামের ১ হাজার ১০০ জন চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত এবং ১ হাজার ৭৯৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর ক্লিনিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকরা বলছেন, শুধু ডেঙ্গুকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ কৌশল দিয়ে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব নয়। সমন্বিত রোগ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত নজরদারি এবং ব্যাপক জনসচেতনতা কার্যক্রম জরুরি।
গবেষণার নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী, রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আবুল ফয়সাল মোহাম্মদ নুরুদ্দিন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আদনান মান্নান।
রিসার্চ প্রজেক্টের টিম লিডার অধ্যাপক ডা. আদনান মান্নান কালবেলাকে বলেন, ‘ভাইরাসের জিনগত বিশ্লেষণে আমরা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নতুন মিউটেশন শনাক্ত করেছি, যা এই অঞ্চলে রোগের বিস্তার ও তীব্রতার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। ভবিষ্যৎ চিকিৎসা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ কৌশল নির্ধারণে এসব তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
এসপেরিয়া হেলথ কেয়ার লিমিটেডের সহযোগিতায় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, ইউএসটিসি, অ্যাপোলো ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল, ডিজিজ বায়োলজি অ্যান্ড মলিকুলার এপিডেমিওলজি রিসার্চ গ্রুপ এবং নেক্সট জেনারেশন রিসার্চ, সিকুয়েন্সিং অ্যান্ড ইনোভেশন ল্যাব চিটাগংয়ের (এনরিচ) গবেষকদের তত্ত্বাবধানে এটি পরিচালিত হয়।
What's Your Reaction?