১৭৩ বছরের গৌরবের আড়ালে ধুঁকছে মেধার বাতিঘর
প্রায় দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার অন্যতম আলোকবর্তিকা বগুড়া জিলা স্কুল। ১৮৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠ শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, দেশের ইতিহাস, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধান বিচারপতি, ভাষাসৈনিক থেকে খ্যাতিমান সাহিত্যিক, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার থেকে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা অসংখ্য কৃতী মানুষের শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়েছে এই স্কুলে। প্রতি বছর এসএসসি পরীক্ষার ফল, মেধা তালিকা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমেও প্রতিষ্ঠানটি জেলার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে। কিন্তু ঐতিহ্য, সাফল্য আর গৌরবের এই উজ্জ্বল আবরণের আড়ালে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে আরেকটি বাস্তবতা। ডিজিটাল শিক্ষা ও স্মার্ট বাংলাদেশের যুগে আধুনিক প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং সময়োপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতিতে ধুঁকছে দেশের অন্যতম এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ। প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র একটি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম। দুই শিফটে পাঠদান পরিচালনা করতে গিয়ে ৪০ মিনিটের ক্লাস কমিয়ে ৩৫ মিনিটে নামিয়ে আনতে হয়েছে। আধুনিক কোডিং বা স্টেম শিক্ষা তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে মৌলিক প্রযুক্তিনির্
প্রায় দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার অন্যতম আলোকবর্তিকা বগুড়া জিলা স্কুল। ১৮৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠ শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, দেশের ইতিহাস, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধান বিচারপতি, ভাষাসৈনিক থেকে খ্যাতিমান সাহিত্যিক, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার থেকে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা অসংখ্য কৃতী মানুষের শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়েছে এই স্কুলে। প্রতি বছর এসএসসি পরীক্ষার ফল, মেধা তালিকা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমেও প্রতিষ্ঠানটি জেলার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে।
কিন্তু ঐতিহ্য, সাফল্য আর গৌরবের এই উজ্জ্বল আবরণের আড়ালে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে আরেকটি বাস্তবতা। ডিজিটাল শিক্ষা ও স্মার্ট বাংলাদেশের যুগে আধুনিক প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং সময়োপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতিতে ধুঁকছে দেশের অন্যতম এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ। প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র একটি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম। দুই শিফটে পাঠদান পরিচালনা করতে গিয়ে ৪০ মিনিটের ক্লাস কমিয়ে ৩৫ মিনিটে নামিয়ে আনতে হয়েছে। আধুনিক কোডিং বা স্টেম শিক্ষা তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে মৌলিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাও কাঙ্ক্ষিতভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
সাফল্যের শীর্ষে বগুড়া জিলা স্কুল
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই শিক্ষা ও সংস্কৃতির ধারক হিসেবে বগুড়া জিলা স্কুল দেশের অন্যতম সেরা সরকারি বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। ১৯৬০-এর দশকে প্রধান শিক্ষক মইন উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে শুরু হয় প্রতিষ্ঠানের স্বর্ণযুগ। ১৯৬৪ সালে রাজশাহী বোর্ডে প্রথম স্থান, ১৯৬৫ সালে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় স্থান অর্জন, ১৯৯৬ সালে অবিনাশ রায়ের সর্বমেধায় প্রথম স্থানসহ একাধিক কৃতিত্ব স্কুলটির ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও ধারাবাহিকভাবে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের মেধা তালিকায় স্থান করে নিয়েছে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
সবশেষ ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা মিলিয়ে ২২০ জন পরীক্ষার্থীর সবাই উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগের ২১৯ জনের মধ্যে ২১৭ জন জিপিএ-৫ অর্জন করে। এর আগের বছর ২৩৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৩০ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল। জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষাতেও ৪৭ জন ট্যালেন্টপুলসহ মোট ৮৭ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি লাভ করে।
শুধু ফলাফল নয়, দেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই প্রতিষ্ঠানের নাম। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, ভাষাসৈনিক গাজীউল হক, সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ, কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ, সাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শিক্ষাবিদ ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম, ক্রিকেটার তানজিদ হাসান তামিম, সার্কের সাবেক মহাসচিব কিউ এ এম এ রহিমসহ অসংখ্য গুণিজন এই বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী।
সফলতায় মোড়ানো সংকট
এই সাফল্যের ধারাবাহিকতার বিপরীতে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বর্তমানে তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত আটটি শ্রেণিতে মোট ১ হাজার ৯২৪ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি শ্রেণিকক্ষ কিংবা পাঠদানের সময়। ফলে শিক্ষার্থীদের চাপ সামলাতে বহু বছর ধরেই চালু রয়েছে প্রভাতি ও দিবা দুই শিফট।
প্রভাতি শিফট চলে সকাল ৭টা ১৫ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত, আর দিবা শিফট দুপুর ১২টা ১০ মিনিট থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। দুই শিফটের মাঝখানে বিরতি মাত্র ১০ মিনিট। সময়ের এই সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিটি ক্লাসের সময় ৪০ মিনিট থেকে কমিয়ে ৩৫ মিনিট করা হয়েছে। অন্যান্য অনেক বিদ্যালয়ে যেখানে ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার টিফিন বিরতি থাকে, সেখানে এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা মাত্র ২০ মিনিট সময় পায়।
শিক্ষকদের ভাষ্য, এই স্বল্প সময়ে উপস্থিতি নেওয়া, পাঠদান, শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং পাঠ শেষ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও ব্যবহারিক বিষয়গুলোতে সময়ের সংকট সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ১৭৩ বছরের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠান এখনো সুনামের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দুই শিফটের কারণে সময়ের বড় সংকট তৈরি হয়েছে। বাধ্য হয়ে ৪০ মিনিটের ক্লাস ৩৫ মিনিটে নামিয়ে আনতে হয়েছে। সাতমাথার যানজটের কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদেরও ভোগান্তি পোহাতে হয়। বর্তমান অবকাঠামোয় আর শিক্ষার্থী বাড়ানোর সুযোগ নেই। বরং বগুড়ার মতো জেলায় আরও সরকারি বিদ্যালয় প্রয়োজন।
প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা
বিদ্যালয়ের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদানে। প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর জন্য পুরো বিদ্যালয়ে রয়েছে মাত্র একটি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম। ফলে সব শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়মিত প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান সম্ভব হয় না। ডিজিটাল কনটেন্টভিত্তিক শিক্ষা এখনো অনেকাংশে সীমাবদ্ধ।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল রায়ান জানায়, ‘আমাদের শিক্ষকরা খুব ভালো পড়ান। আমরা আমাদের স্কুল নিয়ে গর্ব করি। কিন্তু প্রযুক্তির দিক থেকে আরও উন্নতি দরকার। বায়োলজি ল্যাবের কাজ দীর্ঘদিন ধরে চলছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসও নিয়মিত হয় না।’
আরেক শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল সাদ রিশাদ জানায়, ‘আইসিটি বিষয়ে আমরা তাত্ত্বিক জ্ঞান পাই, কিন্তু ব্যবহারিক সুযোগ সীমিত। সবাই একসঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে না।’
শিক্ষক সংকট
বর্তমানে বিদ্যালয়ে অনুমোদিত ৫৩টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৫১ জন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা এখন বাধ্যতামূলক হলেও বিদ্যালয়ে আইসিটি বিষয়ের কোনো অনুমোদিত শিক্ষক পদ নেই। ফলে অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে সেই দায়িত্ব পালন করছেন।
বগুড়া জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রমজান আলী আকন্দ বলেন, বগুড়া জিলা স্কুল দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকা কাম্য নয়। নতুন একাডেমিক ভবনের সঙ্গে দুটি আধুনিক আইসিটি ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানে উচ্চমাধ্যমিক স্তর চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত।
রোবটিক্সের যুগে পুরোনো কম্পিউটার
২৭টি কম্পিউটারের মধ্যে সচল মাত্র ১৭টি, নেই কোডিং ক্লাব, স্মার্টবোর্ড কিংবা আধুনিক ডিজিটাল ল্যাব। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য সামনে রেখে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদানের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্স, কোডিং, স্টেম শিক্ষা ও ডিজিটাল দক্ষতা এখন বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অন্যতম শর্ত। অথচ উত্তরাঞ্চলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বগুড়া জিলা স্কুলে এখনো প্রায় ১৫ বছর আগের কম্পিউটার দিয়েই চলছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) শিক্ষা। অধিকাংশ যন্ত্রপাতি পুরোনো, নেই আধুনিক ডিজিটাল ল্যাব, নেই কোডিং ক্লাব কিংবা স্মার্টবোর্ড। ফলে তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করলেও ব্যবহারিক দক্ষতায় পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্কুলটিতে একটি মাত্র কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে। সেখানে থাকা ২৭টি কম্পিউটারের মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র ১৭ থেকে ১৮টি। বাকি অন্তত ১০টি দীর্ঘদিন ধরেই অচল। বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, কম্পিউটারগুলো ২০১২ সালের দিকে কেনা হয়েছিল। সে সময়ের প্রযুক্তি অনুযায়ীও এগুলো সর্বাধুনিক ছিল না। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে বর্তমানে যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রপাতি পাওয়া যায় না। অনেক কম্পিউটার চালু করতেই কয়েক মিনিট সময় লেগে যায়। ফলে নির্ধারিত ক্লাসের বড় একটি অংশ চলে যায় শুধু যন্ত্র চালু করতেই।
প্রতিটি শাখায় ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও সচল কম্পিউটারের সংখ্যা ১৭টির বেশি নয়। ফলে একটি কম্পিউটারে দুই থেকে তিনজন শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে বসে কাজ করতে হয়। এতে প্রত্যেকে আলাদাভাবে অনুশীলনের সুযোগ পায় না। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক শুধু প্রজেক্টরে দেখিয়ে পাঠ শেষ করতে বাধ্য হন।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল সাদ রিশাদ জানায়, ‘আমাদের ক্লাসে প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু সচল কম্পিউটার ২০টিরও কম। এক কম্পিউটারে দুই-তিনজন বসতে হয়। কম্পিউটার অন করতেই অনেক সময় চলে যায়। ফলে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ খুবই সীমিত।’
নেই আইসিটি শিক্ষক
বিদ্যালয়ের বর্তমান বাস্তবতায় প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সঙ্গে জাতীয় শিক্ষানীতির লক্ষ্যগুলোরও বড় ধরনের ফারাক দেখা যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি এখন আবশ্যিক বিষয় হলেও বিদ্যালয়ে আইসিটি বিষয়ের কোনো অনুমোদিত শিক্ষক পদ নেই। অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিয়ে কম্পিউটার ক্লাস পরিচালনা করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার গুণগত মানের জন্য উদ্বেগজনক।
কম্পিউটার ল্যাবের দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষক মো. শাজাহান আলী বলেন, কম্পিউটারগুলো ২০১২ সালের দিকে কেনা হয়েছিল। তখনও খুব উন্নত কনফিগারেশনের ছিল না। এখন র্যাম, স্টোরেজ, প্রসেসর সবই পুরোনো। বাস্তবে এগুলো দিয়ে আধুনিক সফ্টওয়্যার চালানো কঠিন। অনেক সময় শুধু ডেমো দেখিয়েই ক্লাস শেষ করতে হয়। কারণ ৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য পর্যাপ্ত কম্পিউটার নেই।
শুধু কম্পিউটার ল্যাবই নয়, বিজ্ঞান শিক্ষা ক্ষেত্রেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের জন্য আলাদা ল্যাব থাকলেও অনেক যন্ত্রপাতিই বহু বছরের পুরোনো। আধুনিক পরীক্ষণ সরঞ্জামের অভাবে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারছে না।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, কম্পিউটারগুলো অনেক পুরোনো। নতুন কম্পিউটার ও আধুনিক ল্যাবের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে যে বাজেট পাওয়া যায়, তা দিয়ে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন সম্ভব হয় না।
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরাও মনে করেন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। বগুড়া জিলা স্কুল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী সদস্য কে এ এম মাছুদুর রহমান বাপ্পী বলেন, এই বিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বগুড়ার গর্ব। অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন সবসময় শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। তবে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ উন্নয়নে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
তবে দীর্ঘদিনের এই সংকট নিরসনে বড় একটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ চলছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে ছয়তলা আধুনিক একাডেমিক ভবন। ভবনটিতে থাকবে ২৭টি কক্ষ, ছয়টি আধুনিক ল্যাবরেটরি, কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়াম, শিক্ষক কক্ষ, লিফট, র্যাম্প এবং প্রতিটি তলায় পৃথক ওয়াশরুম। পাশাপাশি পুরোনো অডিটোরিয়াম ও মসজিদ সংস্কারের কাজও চলছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ভবনের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। নতুন ভবন চালু হলে শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাব সংকট অনেকটাই দূর হবে। শিক্ষার্থীরা আধুনিক পরিবেশে পাঠদানের সুযোগ পাবে।
তবে শিক্ষাবিদদের মতে, নতুন ভবন নির্মাণ অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু শুধু ভবন নির্মাণ করলেই সব সংকটের সমাধান হবে না। পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, প্রধান শিক্ষক পদে দ্রুত নিয়োগ, আইসিটি শিক্ষক সৃষ্টি, আধুনিক ল্যাব সরঞ্জাম, স্মার্ট ক্লাসরুম, উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তিনির্ভর সহশিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করতে না পারলে অবকাঠামোর উন্নয়নও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
এই স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী চিকিৎসক সিরাজুল ইসলাম ফাইন বলেন, ১৭৩ বছরের ঐতিহ্য, শতভাগ পাসের গৌরব, অসংখ্য কৃতী শিক্ষার্থীর জন্ম দেওয়া এই বিদ্যাপীঠ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। নতুন ভবন হয়ত শ্রেণিকক্ষের সংকট কমাবে, কিন্তু আগামী দিনের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন আরও বড় বিনিয়োগ মানসম্মত শিক্ষক, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সময়োপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা। ঐতিহ্যের গৌরব ধরে রাখতে হলে এখন সেই পরিবর্তনের অপেক্ষাতেই বগুড়া জিলা স্কুল।
এফএ/এএসএম
What's Your Reaction?



