নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো একমাত্র শ্মশান ঘাটের উন্নয়ন কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়সহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে। সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক দাহ চুল্লি, গোসল ঘর ও দ্বিতল অফিস ভবন নির্মাণের কাজ আদালতের স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস-কো) আদেশে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এ নিয়ে আদালতে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন ও পারটেক্স গ্রুপের( একটি শিল্পগোষ্ঠী) সহযোগী প্রতিষ্ঠান আম্বার পেপার মিলস।
বুধবার (১৭ জুন) বেলা সাড়ে ১১টায় নারায়ণগঞ্জের প্রথম যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ তাহমিনা আক্তার পিংকির আদালতে এ সংক্রান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। পারটেক্স গ্রুপের দায়ের করা মামলায় জারিকৃত ইনজাংশন ও স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস-কো) আদেশ বাতিলের আবেদন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন। শুনানিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান নিজেই উপস্থিত থেকে শ্মশানের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করেন এবং ইনজাংশন ও স্থিতাবস্থা আদেশ বাতিলের পক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও কাগজপত্র আদালতে দাখিল করেন। অন্যদিকে বিবাদীপক্ষ আম্বার পেপার মিলসের পক্ষ থেকে আইনজীবী সময়ের আবেদন করলে আদালত পরবর্তী শুনানির জন্য বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দিন ধার্য করেন।
শুনানি শেষে প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘হাট-ঘাট, মাঠ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান লিজ দেওয়ার কোন বৈধতা নেই। প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো একটি শ্মশানের সব বৈধ কাগজপত্র ও আদালতের পূর্ববর্তী রায় থাকার পরও একটি শিল্পগোষ্ঠী হাইকোর্টে রিট করে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা আদালতে প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র উপস্থাপন করেছি। আশা করছি, ন্যায়বিচার পাব।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৭৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শ্মশান ঘাট ও মন্দিরের অস্তিত্ব বিভিন্ন সরকারি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। সরকারি আইন অনুযায়ী মন্দির, মসজিদ, শ্মশান, রাস্তা-ঘাট বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা লিজ দেওয়া যায় না। একটি মিথ্যা দাবির ভিত্তিতে উন্নয়নকাজ আটকে রাখা হয়েছে। আদালতের রায় সত্য ও সাধারণ মানুষের পক্ষে আসবে বলে আমরা আশা করছি।’
জানা গেছে, সিদ্ধিরগঞ্জের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আজিবপুর এলাকায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী শ্মশান ঘাট ও মন্দিরটি ১৭৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি সিদ্ধিরগঞ্জের একমাত্র শ্মশান, যেখানে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ১ থেকে ১০ নম্বর ওয়ার্ডের পাশাপাশি সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুর ও মদনগঞ্জ এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ শবদাহ ও শেষকৃত্য সম্পন্ন করে থাকেন।
শ্মশানটি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নিবন্ধিত ও নিয়ন্ত্রণাধীন। এখানে একজন তত্ত্বাবধায়ক, পুরোহিত, ডোম ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট দূর করতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন কোভিড-১৯ বরাদ্দের অর্থ থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক দাহ চুল্লি, গোসল ঘর এবং দ্বিতল অফিস ভবন নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়।
২০২৫ সালের ১৯ জুন উন্নয়ন কাজ শুরু হয় এবং ৪৮টি পাইলিং পিলার নির্মাণও সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু পরে আম্বার পেপার মিলস পারটেক্স গ্রুপের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন মামলা দায়ের করা হলে আদালত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। এর ফলে গত প্রায় সাত মাস ধরে উন্নয়ন কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
শ্মশান কমিটির সভাপতি সুভাষ চন্দ্র তরফদার বলেন, ‘১৯৮৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পারটেক্স গ্রুপের আজিজ আল মাহমুদ ও শওকত আজিজ রাসেল জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করে ৬ দশমিক ৭৯ একর জমি স্থায়ী বন্দোবস্ত নেন। কিন্তু তাদের আবেদনপত্রে একই জমির মধ্যে থাকা শ্মশানের ৩১ শতাংশ জমির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। পরে এ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে আদালত শ্মশানের পক্ষে রায় দেন।’
তিনি আরও জানান, ২০-২৫ বছর আগেও শ্মশানের জমি দখলের চেষ্টা হয়েছিল। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় ও এলাকাবাসীর প্রতিরোধে সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরে আদালতও শ্মশানের জমির স্বীকৃতি দিয়ে রায় দেন। কিন্তু সম্প্রতি উন্নয়ন কাজ শুরু হওয়ার পর আবারও আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিম্ন আদালত থেকেও শ্মশানের পক্ষে রায় রয়েছে। অতীতে দখলের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরও সম্প্রতি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হলে নতুন করে আইনি বিরোধ দেখা দেয়। ফলে আধুনিক দাহ চুল্লি, গোসল ঘর ও দ্বিতল অফিস ভবন নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়।
শ্মশান কমিটির সদস্য শিশির ঘোষ (অমর) বলেন, “এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, হাজারো মানুষের শেষ বিদায়ের স্থান। আমরা চাই দ্রুত উন্নয়ন কাজ শুরু হোক। মানবতার প্রশ্নে এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন জরুরি।”
এলাকাবাসীরাও একই দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, সব ধর্মের ঊর্ধ্বে মানবতা। প্রাচীন এই শ্মশানটির উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হলে এবং ভবিষ্যতে এর অস্তিত্ব সংকটে পড়লে বৃহৎ হিন্দু জনগোষ্ঠী চরম দুর্ভোগে পড়বে। অন্যদিকে পারটেক্স গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আম্বার পেপার মিলসের ইনচার্জ নজরুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় বিস্তারিত মন্তব্য করতে চান না। তবে শ্মশানে দাহ কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং আদালতের নির্দেশনা শুধুমাত্র ভবন নির্মাণসংক্রান্ত বিষয়ে রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি জনকল্যাণমূলক ও মানবিক প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে আইনি জটিলতায় আটকে আছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে বরাদ্দকৃত অর্থ ফেরত যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এ অবস্থায় দ্রুত সমাধান চান তারা।
এদিকে শ্মশান কমিটির দাবি, জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে শ্মশানের ৩১ শতাংশ জমি চূড়ান্তভাবে সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন কাজের সব বাধা দূর করা হোক। অতীতে জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, পারটেক্স গ্রুপ ও শ্মশান কমিটির মধ্যে আলোচনায় শ্মশানের জমি শ্মশানের কাছেই থাকবে বলে সমঝোতা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তারা।
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সব ধর্মের মানুষের মধ্যেই ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের প্রত্যাশা, আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই বিরোধের অবসান হবে এবং সিদ্ধিরগঞ্জের প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো শ্মশান ঘাটের উন্নয়ন কাজ দ্রুত পুনরায় শুরু হবে।