৩০ বছর পর দেশে ফিরলেন নিখোঁজ আমির

দীর্ঘ ৩০ বছর পর প্রবাসজীবনের অজানা অন্ধকার পেরিয়ে অবশেষে দেশে ফিরেছেন আমির হোসেন। প্রায় তিন দশক পর স্বামীকে ফিরে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন স্ত্রী রোকেয়া বেগমসহ পরিবারের সদস্যরা। জানা যায়, শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চামটা ইউনিয়নের দিনারা গ্রামের বাসিন্দা আমির হোসেন ও রোকেয়া বেগম দম্পতির তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। অভাব-অনটনের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ১৯৯৬ সালে পারিবারিক জমি বিক্রি করে দালালের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান আমির হোসেন। সেখানে গিয়ে তিনি রংমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। প্রথম তিন বছর নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন ও টাকা পাঠাতেন। কিন্তু হঠাৎ করেই একসময় তার সঙ্গে পরিবারের সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর কেটে যায় দীর্ঘ ২৭ বছর। পরিবার জানত না তিনি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন। স্ত্রী রোকেয়া বেগম সন্তানদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেন। আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয়দের সহায়তায় কষ্টে-সৃষ্টে বড় করেন ছয় সন্তানকে। ঘটনার নাটকীয় মোড় আসে ছয় মাস আগে। মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের একটি জঙ্গলে একটি ছোট টিনের ঘরে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় আমির হোসেনকে দেখতে পান প্রবাসী দিপু ও প্রবাসী সাংবাদিক বাপ্পি কুমার দা

৩০ বছর পর দেশে ফিরলেন নিখোঁজ আমির
দীর্ঘ ৩০ বছর পর প্রবাসজীবনের অজানা অন্ধকার পেরিয়ে অবশেষে দেশে ফিরেছেন আমির হোসেন। প্রায় তিন দশক পর স্বামীকে ফিরে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন স্ত্রী রোকেয়া বেগমসহ পরিবারের সদস্যরা। জানা যায়, শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চামটা ইউনিয়নের দিনারা গ্রামের বাসিন্দা আমির হোসেন ও রোকেয়া বেগম দম্পতির তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। অভাব-অনটনের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ১৯৯৬ সালে পারিবারিক জমি বিক্রি করে দালালের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান আমির হোসেন। সেখানে গিয়ে তিনি রংমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। প্রথম তিন বছর নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন ও টাকা পাঠাতেন। কিন্তু হঠাৎ করেই একসময় তার সঙ্গে পরিবারের সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর কেটে যায় দীর্ঘ ২৭ বছর। পরিবার জানত না তিনি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন। স্ত্রী রোকেয়া বেগম সন্তানদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেন। আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয়দের সহায়তায় কষ্টে-সৃষ্টে বড় করেন ছয় সন্তানকে। ঘটনার নাটকীয় মোড় আসে ছয় মাস আগে। মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের একটি জঙ্গলে একটি ছোট টিনের ঘরে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় আমির হোসেনকে দেখতে পান প্রবাসী দিপু ও প্রবাসী সাংবাদিক বাপ্পি কুমার দাস। তাকে উদ্ধার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন তারা। সেই ভিডিও দেখে আমিরকে শনাক্ত করে তার পরিবার। পরে ভিডিও প্রকাশকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিবারের সদস্যরা ভিডিও কলে আমির হোসেনের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রথমে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে তার পরিচয় নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় তথ্য নড়িয়া উপজেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়। উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় জন্মনিবন্ধনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে দূতাবাসে পাঠানো হলে তাকে ট্রাভেল পাস প্রদান করা হয়। পরে মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে বাতিক এয়ারের (OD162) একটি ফ্লাইটে ঢাকায় পৌঁছান আমির হোসেন। বিমানবন্দরে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক), প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহায়তায় পরিবারের সদস্যরা তাকে গ্রহণ করেন। পরে তাকে ঢাকার কেরানীগঞ্জে ছোট ছেলে শহীদুল ইসলামের বাসায় নেওয়া হয়, যেখানে তিনি বর্তমানে বিশ্রামে রয়েছেন। স্বামীকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত রোকেয়া বেগম বলেন, ৬টি ছোট সন্তান রেখে তিনি বিদেশে গিয়েছিলেন। তিন বছর টাকা পাঠানোর পর হঠাৎ সব বন্ধ হয়ে যায়। ২৭ বছর ধরে তার কোনো খোঁজ পাইনি। ছয় মাস আগে একটি ভিডিও দেখে তাকে চিনতে পারি। এত বছর পর তাকে ফিরে পাব, কখনো ভাবিনি। এটি আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত। আমির হোসেনের ছেলে বাবু তালুকদার বলেন, বাবা যখন বিদেশে যান তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। তার কোনো স্মৃতি মনে নেই। মায়ের কষ্টে আমরা বড় হয়েছি। প্রবাসীদের সহায়তায় বাবাকে ফিরে পেয়েছি, যা আমাদের জন্য অকল্পনীয়। তিনি অসুস্থ, শিগগিরই চিকিৎসা দেওয়া হবে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, তাদের বড় ছেলে তিন বছর আগে মারা গেছেন। তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। বর্তমানে দুই ছেলে ঢাকায় শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, ৩০ বছর ধরে প্রবাসে থাকা এবং ২৭ বছর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এই ঘটনা প্রবাস জীবনের অনিশ্চয়তার একটি বাস্তব উদাহরণ। প্রযুক্তির এই যুগে প্রতিটি প্রবাসীর তথ্যভিত্তিক ডাটাবেজ থাকা জরুরি। নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল কাইয়ূম বলেন, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাঠানো তথ্য যাচাই করে আমরা পরিবারের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত করি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানোর পর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতেও তার যেকোনো প্রয়োজনে উপজেলা প্রশাসন পাশে থাকবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই ফিরে আসা শুধু একজন ব্যক্তির নয়, বরং একটি পরিবারের তিন দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে। এই আবেগঘন পুনর্মিলন এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow