৩০ বছরের বন্ধুত্ব, এক স্বপ্নের ঠিকানা ‘অ্যামিগোস’
বন্ধুত্ব শুধু স্মৃতির পাতায় আটকে থাকার বিষয় নয়, সত্যিকারের বন্ধুত্ব চাইলে হয়ে উঠতে পারে একটি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি, একটি স্বপ্নের ঠিকানা। সময়ের সঙ্গে অনেক বন্ধুত্ব হারিয়ে যায় ব্যস্ততার ভিড়ে, কিন্তু ময়মনসিংহের সাত বন্ধু দেখিয়েছেন ভিন্ন এক দৃষ্টান্ত। প্রায় তিন দশকের বন্ধুত্বকে তারা শুধু টিকিয়েই রাখেননি, বরং সেই বন্ধুত্বকে রূপ দিয়েছেন একটি সফল উদ্যোগে। তাদের হাত ধরেই গড়ে উঠেছে ‘অ্যামিগোস’ (Amigos) রেস্টুরেন্ট। ময়মনসিংহ নগরীর নতুন বাজার এলাকায় অবস্থিত এই রেস্টুরেন্টটি এখন শুধু সুস্বাদু খাবারের জন্যই নয়, বরং বন্ধুত্বের এক অনন্য প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। স্প্যানিশ ভাষার Amigos শব্দের অর্থ বন্ধুরা। সেই অর্থবহ নামটিই তারা বেছে নিয়েছেন নিজেদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে। সাত বন্ধুর পরিচয়ের শুরু শৈশবে। কেউ পড়েছেন ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে, কেউ গোহাইলকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ে। স্কুলজীবনের হাসি-কান্না, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পরীক্ষার চাপ, আড্ডা সবকিছুই তারা ভাগাভাগি করেছেন একসঙ্গে। সময়ের সঙ্গে সবাই উচ্চশিক্ষা শেষ করে ভিন্ন ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন। কেউ ব্যবসায়ী, কেউ চাকরিজীবী, আবার কেউ অন্য
বন্ধুত্ব শুধু স্মৃতির পাতায় আটকে থাকার বিষয় নয়, সত্যিকারের বন্ধুত্ব চাইলে হয়ে উঠতে পারে একটি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি, একটি স্বপ্নের ঠিকানা। সময়ের সঙ্গে অনেক বন্ধুত্ব হারিয়ে যায় ব্যস্ততার ভিড়ে, কিন্তু ময়মনসিংহের সাত বন্ধু দেখিয়েছেন ভিন্ন এক দৃষ্টান্ত।
প্রায় তিন দশকের বন্ধুত্বকে তারা শুধু টিকিয়েই রাখেননি, বরং সেই বন্ধুত্বকে রূপ দিয়েছেন একটি সফল উদ্যোগে। তাদের হাত ধরেই গড়ে উঠেছে ‘অ্যামিগোস’ (Amigos) রেস্টুরেন্ট।
ময়মনসিংহ নগরীর নতুন বাজার এলাকায় অবস্থিত এই রেস্টুরেন্টটি এখন শুধু সুস্বাদু খাবারের জন্যই নয়, বরং বন্ধুত্বের এক অনন্য প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। স্প্যানিশ ভাষার Amigos শব্দের অর্থ বন্ধুরা। সেই অর্থবহ নামটিই তারা বেছে নিয়েছেন নিজেদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে।
সাত বন্ধুর পরিচয়ের শুরু শৈশবে। কেউ পড়েছেন ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে, কেউ গোহাইলকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ে। স্কুলজীবনের হাসি-কান্না, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পরীক্ষার চাপ, আড্ডা সবকিছুই তারা ভাগাভাগি করেছেন একসঙ্গে।
সময়ের সঙ্গে সবাই উচ্চশিক্ষা শেষ করে ভিন্ন ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন। কেউ ব্যবসায়ী, কেউ চাকরিজীবী, আবার কেউ অন্য পেশায় প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু জীবনের ব্যস্ততা তাদের বন্ধুত্বের বন্ধনকে কখনো দুর্বল করতে পারেনি।
বন্ধুরা অনুভব করছিলেন, কর্মব্যস্ততার কারণে একসঙ্গে কাটানোর সময় দিন দিন কমে যাচ্ছে। তখনই তাদের মনে জন্ম নেয় নতুন একটি ভাবনা, এমন একটি উদ্যোগ নেওয়া যায় কি না, যেখানে ব্যবসাও হবে, আবার বন্ধুত্বও অটুট থাকবে। দীর্ঘ আলোচনা, পরিকল্পনা ও পারস্পরিক মতবিনিময়ের পর ২০২০ সালে অল্প পুঁজি নিয়ে শুরু হয় ‘এমিগোজ’ রেস্টুরেন্টের যাত্রা।
শুরুর পথ মোটেও সহজ ছিল না। সীমিত পুঁজি, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার অভাব এবং নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। তবে তারা বিশ্বাস হারাননি। একে অপরের প্রতি আস্থা, কঠোর পরিশ্রম, সততা এবং ঐক্যের শক্তিতে ধীরে ধীরে সব বাধা অতিক্রম করেন। সময়ের সঙ্গে স্থানীয়দের আস্থা অর্জন করে রেস্টুরেন্টটি আজ ময়মনসিংহের পরিচিত একটি আড্ডা ও খাবারের ঠিকানায় পরিণত হয়েছে।
বিশ্ব বন্ধু দিবসকে সামনে রেখে এই সাত বন্ধুর গল্প যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, বন্ধুত্ব শুধু একসঙ্গে ছবি তোলা বা আড্ডা দেওয়ার নাম নয়, বন্ধুত্ব মানে একে অপরের স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন হিসেবে ধারণ করা, প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো এবং একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার সাহস রাখা।
রেস্টুরেন্টে প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সের মানুষ আসেন। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ সহকর্মীদের নিয়ে সময় কাটাতে। সুস্বাদু খাবারের পাশাপাশি সাত বন্ধুর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের গল্প শুনেও অনেকেই অনুপ্রাণিত হন। অনেক তরুণ মনে করেন, বন্ধুত্বকে কেন্দ্র করেও একটি সফল ও ইতিবাচক উদ্যোগ গড়ে তোলা সম্ভব।
রেস্টুরেন্টটির অন্যতম উদ্যোক্তা ওয়াহিদ হিমেল বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকেই খুব বন্ধুপ্রিয়। একই এলাকায় বেড়ে উঠেছি, একসঙ্গে স্কুল-কলেজের সময় কাটিয়েছি। সময়ের সঙ্গে সবাই নিজ নিজ পেশায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেও বন্ধুত্বের টান কখনো কমেনি। তখন আমাদের মনে হলো, এমন কিছু করা দরকার, যা শুধু ব্যবসাই হবে না, বরং আমাদের বন্ধুত্বকেও আজীবন ধরে রাখবে।’
তিনি বলেন, ‘এই চিন্তা থেকেই আমরা সাত বন্ধু একসঙ্গে বসে আলোচনা করি। অনেক ভাবনাচিন্তার পর অ্যামিগোস নামে একটি রেস্টুরেন্ট করার সিদ্ধান্ত নিই। স্প্যানিশ ভাষায় Amigos শব্দের অর্থই হলো বন্ধুরা। নামের মধ্যেই আমাদের বন্ধুত্বের গল্প লুকিয়ে আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুরুতে অল্প পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও আমাদের লক্ষ্য ছিল একটাই বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী করা এবং মানুষের জন্য একটি সুন্দর আড্ডার জায়গা তৈরি করা। এখন শুধু আমরা সাতজনই নই, আমাদের পুরো বন্ধু মহল এখানে নিয়মিত একত্রিত হয়। সবাই মিলে আড্ডা দিই, স্মৃতিচারণ করি এবং ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে কিছু সুন্দর সময় কাটাই।’
মঈন রায়হান বলেন, ‘আমাদের কাছে এই রেস্টুরেন্ট শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি আমাদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের প্রতীক। শুরুতে অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু পারস্পরিক বিশ্বাস, পরিশ্রম এবং একে অপরের প্রতি আস্থার কারণে আমরা সব বাধা অতিক্রম করতে পেরেছি।’
তিনি বলেন, ‘আজ প্রায় ছয় বছর ধরে আমরা একসঙ্গে এই ব্যবসা পরিচালনা করছি। আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন ব্যবসার সফলতা নয়; বরং এত বছর পরও আমাদের বন্ধুত্ব আগের মতোই অটুট রয়েছে।’
এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত সাত বন্ধু হলেন- ওয়াহিদ হিমেল, মঈন রায়হান, সাব্বির হোসেন, রিয়াদুল আহসান, মারুফ রহমান, রাফিউল হক (ময়মনসিংহ জিলা স্কুল) এবং মুশরাফুল ইসলাম (গোহাইলকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়)।
ঠাঁই মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের ইন্টারন্যাশনাল সার্টিফায়েড অ্যাডিকশন প্রফেশনাল মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, কৈশোর ও তারুণ্যে একজন মানুষ সবচেয়ে বেশি বন্ধুদের প্রভাবে থাকে। তাই জীবনে ভালো বন্ধু নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত বন্ধু কখনো মাদক, অপরাধ বা ধ্বংসাত্মক কাজে উৎসাহিত করে না; বরং শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
তিনি বলেন, ‘অনেক তরুণ ভুল বন্ধুর প্রভাবে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। তাই মাদক প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, ইতিবাচক বন্ধুত্বের সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি। ময়মনসিংহের সাত বন্ধুর সফল উদ্যোগ প্রমাণ করে, সত্যিকারের বন্ধুত্ব মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “মাদক নয়, বন্ধুত্বই হোক জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।’
বিশ্ব বন্ধু দিবসে তাদের এই গল্প শুধু একটি ব্যবসার সাফল্যের কাহিনি নয়; এটি বিশ্বাস, ভালোবাসা, পারস্পরিক সম্মান ও দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে ধরে রাখার এক অনন্য উদাহরণ। তাদের উদ্যোগ প্রমাণ করে, সত্যিকারের বন্ধুত্ব যদি আস্থা ও আন্তরিকতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সেটি শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সমাজের জন্যও অনুকরণীয় একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
What's Your Reaction?