প্রায় চার দশক আগে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এক নারীর ফিরে আসায় আবেগে ভাসছে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের শাহাপাড়া গ্রাম। দীর্ঘ ৪০ বছর পর ভারতের পাঞ্জাব থেকে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে জন্মভিটায় ফিরেছেন মোছা. জাহানারা, যাকে একসময় হারিয়েই ফেলেছিল তার পরিবার।
গত ২৭ এপ্রিল সকালে গ্রামে পা রাখতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন জাহানারা। বাড়ির উঠানে পা দিয়েই একে একে ভাই-বোন, স্বজনদের জড়িয়ে ধরেন তিনি। দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদের যন্ত্রণা যেন মুহূর্তেই অশ্রুধারায় গলে যায়। পুরো গ্রামজুড়ে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।
জাহানারা মৃত তমিজ উদ্দিনের মেয়ে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, ছোটবেলায় তিনি হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। একপর্যায়ে পরিবার ধরে নেয়, তিনি আর বেঁচে নেই।
জানা গেছে, গত ২৬ এপ্রিল গভীর রাতে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে পৌঁছান। সঙ্গে ছিলেন তার ছেলে মানজিদার সিং (৩০)। প্রথমে তিনি সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের পীরবাড়ি গ্রামে তার বোনের বাড়িতে ওঠেন। পরদিন সকালে নিজ গ্রাম শাহাপাড়ায় গেলে তাকে দেখতে ভিড় করেন শত শত মানুষ।
জাহানারার ভাই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, প্রায় ৪০ বছর আগে আমাদের পাশের বাড়ির এক আত্মীয় কৌশলে আমার বোনকে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয়। আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। অনেক খুঁজেছি, কিন্তু কোনো সন্ধান পাইনি। আজ বোনকে ফিরে পেয়ে মনে হচ্ছে, আল্লাহ আমাদের ঘরে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
আরেক ভাই বলেন, এত বছর পরও তাকে দেখে চিনতে কোনো ভুল হয়নি। মনে হচ্ছে সময় যেন থেমে গেছে।
ভাতিজি সুমাইয়া আক্তার বলেন, ছোটবেলা থেকে ফুপুকে নিয়ে গল্প শুনেছি। আজ তাকে সামনে পেয়ে মনে হয়েছে, হারানো জীবনের একটা অংশ ফিরে পেয়েছি।
প্রতিবেশী আবদুল করিম বলেন, পুরো গ্রাম আজ আনন্দে ভাসছে। কিন্তু এত বছর একজন মানুষ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন— এটা ভাবলে কষ্টও লাগে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ভারতে গিয়ে জাহানারা নতুন নাম গ্রহণ করেন এবং পাঞ্জাবের তাংতারা এলাকায় বিয়ে করেন। বর্তমানে তিনি চার সন্তানের জননী এবং তার সংসার সেখানেই।
জাহানারা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আমি কখনো ভাবিনি আবার এই বাড়িতে ফিরতে পারব। আমার শৈশব, আমার পরিবার— সব আজ চোখের সামনে।
তার ছেলে মানজিদার সিং বলেন, মায়ের মুখে সবসময় তার গ্রামের কথা শুনেছি। আজ সেই গ্রামে এসে আমি খুবই আবেগাপ্লুত।
তবে আনন্দের এই মিলনক্ষণ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সেদিনই বিকেলে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন, সেখান থেকে আবার ভারতে ফিরে যাবেন। বিদায়ের মুহূর্তে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা।
শাহাপাড়ার এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, এমন দৃশ্য জীবনে খুব কমই দেখা যায়। আজ আনন্দও আছে, আবার বিদায়ের বেদনাও আছে।