অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠছে থাইল্যান্ড, বাড়ছে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য

এক সময় কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশ ছিল থাইল্যান্ড। তবে কয়েক দশকের ধারাবাহিক সংস্কার, শিল্পায়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে দেশটি আজ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। কৃষি, উৎপাদনশিল্প, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা ও ডিজিটাল অর্থনীতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে থাইল্যান্ডের উন্নয়নের ভিত্তি। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে আধুনিক শিল্প ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে থাইল্যান্ড একটি সফল উদাহরণ। তবে বৈশ্বিক অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তন, জনসংখ্যার বার্ধক্য, বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া এবং উৎপাদনশীলতার স্থবিরতার মতো নতুন চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উদ্ভাবন, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে দেশটি। এ লক্ষ্য সামনে রেখে ‘বিল্ডিং থাইল্যান্ডস ফিউচার টুডে’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৬ সালে ব্যাংককে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভাকে সামনে রেখে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হবে। দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০ থে

অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠছে থাইল্যান্ড, বাড়ছে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য

এক সময় কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশ ছিল থাইল্যান্ড। তবে কয়েক দশকের ধারাবাহিক সংস্কার, শিল্পায়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে দেশটি আজ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। কৃষি, উৎপাদনশিল্প, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা ও ডিজিটাল অর্থনীতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে থাইল্যান্ডের উন্নয়নের ভিত্তি।

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে আধুনিক শিল্প ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে থাইল্যান্ড একটি সফল উদাহরণ। তবে বৈশ্বিক অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তন, জনসংখ্যার বার্ধক্য, বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া এবং উৎপাদনশীলতার স্থবিরতার মতো নতুন চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উদ্ভাবন, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে দেশটি।

এ লক্ষ্য সামনে রেখে ‘বিল্ডিং থাইল্যান্ডস ফিউচার টুডে’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৬ সালে ব্যাংককে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভাকে সামনে রেখে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হবে।

দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডের অর্থনীতি গড়ে বছরে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। এশীয় আর্থিক সংকটের পর প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমলেও দেশটির অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে এগিয়েছে।

১৯৮০ সালে যেখানে মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৭৪০ মার্কিন ডলার, ২০১৯ সালে তা বেড়ে ৭ হাজার ৮০ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসে। ২০১১ সালে থাইল্যান্ড উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন করে।

তবে ২০১০ সালের পর থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে এসেছে। বর্তমানে কৃষিতে এখনও প্রায় ৩০ শতাংশ শ্রমশক্তি কাজ করলেও জিডিপিতে এ খাতের অবদান ১০ শতাংশেরও কম। জনসংখ্যার বার্ধক্য, বিনিয়োগের ধীরগতি, রাজধানী ব্যাংককের যানজট এবং ব্যবসায়িক বিধিনিষেধ অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন>
চীনে ফল রপ্তানিতে থাইল্যান্ড-ভিয়েতনামের রাজত্ব, বাংলাদেশের বড় সুযোগ
ফল রপ্তানিতে চাঙা হচ্ছে আফগানিস্তানের অর্থনীতি, ডালিম-আঙুরে বাজিমাত

বৈষম্যও রয়েছে

অর্থনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি আয় ও সম্পদ বৈষম্যও থাইল্যান্ডের বড় সমস্যা। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশটির ১০ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ আন্তর্জাতিক উচ্চ-মধ্যম আয়ের দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেছে। অন্যদিকে দেশের মোট সম্পদের অর্ধেকেরও বেশি রয়েছে শীর্ষ ১০ শতাংশ পরিবারের হাতে। রাজধানী ব্যাংকক ও আশপাশের অঞ্চল তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ হলেও উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অনেক এলাকা এখনও পিছিয়ে রয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগের আঞ্চলিক কেন্দ্র

বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম সফল দেশ থাইল্যান্ড। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল নীতি, সহজ ব্যবসা পরিবেশ এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর উদ্যোগ দেশটিকে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে।

বিশেষ করে থাইল্যান্ডের বিনিয়োগ বোর্ড (বিওআই) বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নানা ধরনের কর-সুবিধা ও প্রণোদনা দিয়ে থাকে। অধিকাংশ খাতই বিদেশি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত।

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (আইএমডি) জরিপে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো, প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন ব্যয় এবং উন্মুক্ত অর্থনীতিকে থাইল্যান্ডের প্রধান শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিনিয়োগ ও জীবনযাপনের জন্যও আকর্ষণীয়

শুধু ব্যবসাই নয়, বসবাস ও দূরবর্তীভাবে কাজ করার ক্ষেত্রেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে থাইল্যান্ড। ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক জরিপে বিশ্বের সেরা ‘ওয়ার্কেশন’ শহর হিসেবে নির্বাচিত হয় ব্যাংকক। জীবনযাত্রার তুলনামূলক কম ব্যয়, উন্নত অবকাঠামো, ভালো ইন্টারনেট সুবিধা এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি এ স্বীকৃতির অন্যতম কারণ।

২০২৫ সালে দেশটির জিডিপির আকার দাঁড়ায় ৫৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মাথাপিছু জিডিপি ছিল ৮ হাজার ২০০ ডলার। বেকারত্বের হার মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ছিল ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশ।

উৎপাদন ও রপ্তানিতে শক্তিশালী অবস্থান

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মোটরগাড়ি রপ্তানি করে থাইল্যান্ড। এছাড়া হার্ড ডিস্ক ড্রাইভ উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয় এবং বায়োডিজেল উৎপাদনে আসিয়ানের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে দেশটি।

২০২৪ সালে দেশটির প্রধান রপ্তানি পণ্য ছিল কম্পিউটার, টেলিফোন, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট, মোটরগাড়ি এবং পণ্য পরিবহন ট্রাক। রপ্তানির প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়া।

বিশ্বে প্রাকৃতিক রাবার রপ্তানিতে এখনও শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে থাইল্যান্ড। এছাড়া ফলমূল, প্রক্রিয়াজাত মাংস, স্টার্চ ও ডেক্সট্রিন রপ্তানিতেও দেশটি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারকদের মধ্যে রয়েছে।

অন্যদিকে, দেশটির প্রধান আমদানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট, স্বর্ণ, পেট্রোলিয়াম গ্যাস এবং টেলিফোন। আমদানির প্রধান উৎস চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তাইওয়ান।

আরও পড়ুন>
চীনে ফল রপ্তানিতে থাইল্যান্ড-ভিয়েতনামের রাজত্ব, বাংলাদেশের বড় সুযোগ
ফল রপ্তানিতে চাঙা হচ্ছে আফগানিস্তানের অর্থনীতি, ডালিম-আঙুরে বাজিমাত

স্বাস্থ্য ও উদ্ভাবনেও অগ্রগতি

স্বাস্থ্য নিরাপত্তায়ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে থাইল্যান্ড। ২০২১ সালের গ্লোবাল হেলথ সিকিউরিটি সূচকে দেশটির অবস্থান ছিল বিশ্বে পঞ্চম। রোগ শনাক্তকরণ, দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতার দিক থেকে অনেক উন্নত দেশের চেয়েও ভালো অবস্থানে রয়েছে থাইল্যান্ড।

দেশজুড়ে ২৩টি আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাশাপাশি গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড বাণিজ্য

২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ডে ৮৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাকই ছিল প্রধান রপ্তানি পণ্য। গত পাঁচ বছরে এ রপ্তানি গড়ে বছরে শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ হারে বেড়েছে।

অন্যদিকে একই বছরে থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে ১ দশমিক ০৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে ছিল পরিশোধিত জ্বালানি তেল, সিমেন্ট এবং কৃত্রিম স্ট্যাপল ফাইবার।

২০২৪ সালে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি ছিল ৫৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে থাইল্যান্ডের রপ্তানি ছিল ৩৪০ বিলিয়ন ডলার। অর্থনৈতিক জটিলতা সূচকেও থাইল্যান্ড বাংলাদেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শক্তিশালী শিল্পভিত্তি, রপ্তানিমুখী উৎপাদন, বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার মাধ্যমে থাইল্যান্ড যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বৈষম্য কমানো এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

সূত্র: বিশ্ব ব্যাংক, ওইসি, থাইল্যান্ড বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট

এমএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow