অস্তিত্ব সংকটে ‘নগর-বানর’

ছোট আকারের ‘বানর আশ্রয়কেন্দ্র’ গড়ে তোলা প্রয়োজন নির্দিষ্ট স্থানে নিয়মিত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা বুড়িগঙ্গা ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন সরকারি জায়গায় ফলদ ও দেশীয় গাছ লাগানো বৈদ্যুতিক তার ও অবকাঠামো নিরাপদ করা বানর নির্যাতন বন্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি নগর পরিকল্পনায় বন্যপ্রাণীর জন্য ‘গ্রিন করিডোর’ সংযুক্ত করা পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার। সারি সারি পুরোনো বাড়ি, সরু গলি আর বহু বছরের ইতিহাসে ঘেরা একটি জনপদ। সম্প্রতি সংবাদ সংগ্রহের কাজে সেখানে গিয়ে দেখা গেল ভিন্ন এক দৃশ্য। পুরোনো বাড়িগুলোর বারান্দা, ছাদ আর কার্নিশজুড়ে বসে আছে কয়েকটি বানর। কেউ কেউ ঘরের জানালা দিয়েও খাবার দিচ্ছে। আর নিচে চলাচল করা গাড়ি কিংবা পথচারীদের দিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু বানর অপেক্ষা করছে খাবারের জন্য। কেউ কেউ রিকশা থামিয়ে এবং প্রধান সড়কের পাশের ব্যবসায়ীরা বিস্কুট কিংবা ফল ছুড়ে দিচ্ছেন। মুহূর্তেই এক ভবন থেকে আরেক ভবনের ছাদে লাফিয়ে যাচ্ছে বানরের ছোট ছোট দল। শাঁখারীবাজারের একটি মুদি দোকানের ব্যবসায়ী মো. আবুল কাশেম জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিদিনই ওরা আসে। সকাল আর বিকেলের দিকে বেশি দেখা যায়। এলাকার অনেক মানুষ ওদের খাবার দেয়।

অস্তিত্ব সংকটে ‘নগর-বানর’
  • ছোট আকারের ‘বানর আশ্রয়কেন্দ্র’ গড়ে তোলা প্রয়োজন
  • নির্দিষ্ট স্থানে নিয়মিত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা
  • বুড়িগঙ্গা ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন সরকারি জায়গায় ফলদ ও দেশীয় গাছ লাগানো
  • বৈদ্যুতিক তার ও অবকাঠামো নিরাপদ করা
  • বানর নির্যাতন বন্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি
  • নগর পরিকল্পনায় বন্যপ্রাণীর জন্য ‘গ্রিন করিডোর’ সংযুক্ত করা

পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার। সারি সারি পুরোনো বাড়ি, সরু গলি আর বহু বছরের ইতিহাসে ঘেরা একটি জনপদ। সম্প্রতি সংবাদ সংগ্রহের কাজে সেখানে গিয়ে দেখা গেল ভিন্ন এক দৃশ্য। পুরোনো বাড়িগুলোর বারান্দা, ছাদ আর কার্নিশজুড়ে বসে আছে কয়েকটি বানর। কেউ কেউ ঘরের জানালা দিয়েও খাবার দিচ্ছে। আর নিচে চলাচল করা গাড়ি কিংবা পথচারীদের দিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু বানর অপেক্ষা করছে খাবারের জন্য। কেউ কেউ রিকশা থামিয়ে এবং প্রধান সড়কের পাশের ব্যবসায়ীরা বিস্কুট কিংবা ফল ছুড়ে দিচ্ছেন। মুহূর্তেই এক ভবন থেকে আরেক ভবনের ছাদে লাফিয়ে যাচ্ছে বানরের ছোট ছোট দল।

শাঁখারীবাজারের একটি মুদি দোকানের ব্যবসায়ী মো. আবুল কাশেম জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিদিনই ওরা আসে। সকাল আর বিকেলের দিকে বেশি দেখা যায়। এলাকার অনেক মানুষ ওদের খাবার দেয়। না দিলে ওরা অনেক সময় খাবারের খোঁজে বাসাবাড়ির দিকে যায়।’

একই এলাকার বাসিন্দা রেখা রানী দাস বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে বানর দেখছি। আগে অনেক বেশি ছিল। এখন সংখ্যায় কমে গেছে। তারপরও যখন ওদের দেখি, মনে হয় পুরান ঢাকার একটা ঐতিহ্য এখনো বেঁচে আছে।’

আরও পড়ুন
শহরের দেয়ালে বনের গল্প
বঙ্গভবনে বেড়েছে বানরের উৎপাত
‘খাঁচার বানর বাইরে আইলো কেমনে?’
পুরান ঢাকায় বানরদের খাবার দেওয়ার দাবি

শাঁখারীবাজারের পাশেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবন, হল এবং শিক্ষক ডরমেটরিতেও প্রায়ই দেখা মেলে বানরদের। খাবারের সন্ধানে তারা কখনো রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে, কখনো ভবনের ছাদে উঠে পানির ট্যাংকের ঢাকনা খোলার চেষ্টা করে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মী মো. সোহেল মিয়া বলেন, ‘খাবার পেলেই নিয়ে যায়। অনেক সময় ছাত্রদের রাখা ফল বা খাবারও নিয়ে যায়। কিন্তু ওদের দেখলে মায়াও লাগে। মনে হয় খাবারের জন্যই এসব করছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারহানা আক্তার বলেন, ‘অনেক সময় বানরগুলোকে খুব দুর্বল লাগে। আগে শুনতাম পুরান ঢাকায় অনেক বানর ছিল। এখন মনে হয় তারা শুধু টিকে থাকার লড়াই করছে।’

শুধু শাঁখারীবাজার নয়, সূত্রাপুর, বংশাল, কোতোয়ালি, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, নারিন্দাসহ আশপাশের এলাকায়ও মাঝেমধ্যে দেখা যায় এসব বানর। মানুষের ভিড়, যানজট, শব্দদূষণ এবং কংক্রিটের জঙ্গলের মধ্যে কীভাবে তারা টিকে আছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গত কয়েকদিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা হয়েছে।

অস্তিত্ব সংকটে ‘নগর-বানর’ঢাকার গেন্ডারিয়া কবরস্থানে খাবারের সন্ধানে বানর, ছবি: জাগো নিউজ

ঐতিহ্যের অংশ থেকে আশ্রয়হীন প্রাণী

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরান ঢাকার বানরগুলো মূলত ‘রেসাস ম্যাকাক’ প্রজাতির। একসময় এই অঞ্চলের পুরোনো দালান, গাছপালা, বাগান এবং খোলা পরিবেশ ছিল তাদের নিরাপদ আবাসস্থল। কিন্তু দ্রুত নগরায়ণের ফলে সেই পরিবেশ এখন প্রায় বিলীন।

গেন্ডারিয়ার বাসিন্দা মো. নুরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে গাছে গাছে বানর দেখা যেত। এখন গাছই নাই। তাই ওরা ছাদে, বারান্দায় আর বৈদ্যুতিক তারে ঘুরে বেড়ায়।’

তার স্ত্রী শিউলি বেগম বলেন, ‘অনেক সময় ওরা বাসার জানালায় আসে। আমরা ভয় পাই না, তবে বুঝতে পারি খাবারের জন্যই আসে।’

আরও পড়ুন
‘ঝরনার রানী’কে পাহারা দিচ্ছে একদল বানর
মোংলায় পর্যটক দেখলেই দলবেঁধে ছুটে আসছে বানর
খাবার সংকটে বানর, বসতবাড়িতে দিচ্ছে হানা

খাবারের খোঁজে শহরময় ঘুরে বেড়ানো

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মহিউদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, পুরান ঢাকার বানরগুলো মূলত গেন্ডারিয়া কবরস্থান এবং আশপাশের অল্প কিছু সবুজ এলাকায় অবস্থান করে। কিন্তু পর্যাপ্ত গাছপালা ও নিরাপদ আবাসস্থল না থাকায় তারা খাবারের সন্ধানে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, ‘ওদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো খাদ্যসংকট এবং স্থায়ী আবাসস্থলের অভাব। গাছপালা কমে যাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে মানুষের বসতিতে আসে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ডরমেটরিতেও খাবারের সন্ধানে আসতে দেখা যায়।’

ড. মহিউদ্দিনের মতে, সিটি করপোরেশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় নিয়মিত খাবার ও পানির ব্যবস্থা করে, তাহলে বানরগুলো ধীরে ধীরে সেই এলাকাগুলো নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করবে।

তিনি বলেন, ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক, রায়সাহেব বাজার এলাকা কিংবা গেন্ডারিয়ার কিছু সরকারি জায়গায় ছোট আকারের আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা যেতে পারে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার দিলে তারা সেখানেই জড়ো হবে।’

অস্তিত্ব সংকটে ‘নগর-বানর’গেন্ডারিয়া কবরস্থানে বানরকে খাবার দিচ্ছে এক শিশু, ছবি: জাগো নিউজ

নগরায়ণের চাপে হারিয়ে যাচ্ছে বাস্তুতন্ত্র

বিশেষজ্ঞদের মতে, বানর শুধু একটি প্রাণী নয়; নগর-বাস্তুসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গাছপালা, পাখি, কীটপতঙ্গ, কাঠবিড়ালি ও অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে মিলেই গড়ে ওঠে একটি সুস্থ পরিবেশগত ভারসাম্য।

ড. মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমরা কংক্রিট দিয়ে শহর ঢেকে ফেলেছি। খাল, জলাশয় ও সবুজ এলাকা কমে গেছে। ফলে শুধু বানর নয়, বহু প্রজাতির প্রাণীই তাদের আবাস হারাচ্ছে। বুড়িগঙ্গার দুই পাড়জুড়ে দেশীয় ফলদ ও ফুলগাছ লাগানো গেলে নতুন একটি নগর-বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠতে পারে।’

তার মতে, হাতিরঝিলের মতো পরিকল্পিত সবুজায়ন পুরান ঢাকার বিভিন্ন অংশেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এতে যেমন নগরের তাপমাত্রা কমবে, তেমনি প্রাণীকুলের জন্যও নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

আরও পড়ুন
খাবারের খোঁজে ভারতের বানর বাংলাদেশে, দিশেহারা সীমান্তের কৃষকরা
বনে খাবারের অভাব, দলবেঁধে লোকালয়ে ছুটছে বানর
বানরের প্রতিশোধ!

মানুষের খুব কাছের প্রাণী

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাসুদ জাগো নিউজকে বলেন, মানুষের সঙ্গে আচরণগত ও জৈবিক দিক থেকে বানরের অনেক মিল রয়েছে। তাই বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও বানর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তিনি বলেন, ‘পুরান ঢাকার বানরগুলো অত্যন্ত বুদ্ধিমান। তারা দরজা খুলতে পারে, রান্নাঘরে ঢুকতে পারে, এমনকি খাবারের পাত্রের ঢাকনাও খুলে ফেলতে পারে। কিন্তু এই বুদ্ধিমত্তাই অনেক সময় মানুষের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’

তার মতে, কুকুর বা বিড়ালের মতো বানরদের জন্য সংগঠিত স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম দেখা যায় না। ফলে খাদ্যসংকট ও আবাসন সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।

‘ঢাকা শহরে বর্তমানে হয়তো ১০০ থেকে ২০০টির মতো বানর রয়েছে। সংখ্যাটি খুব বেশি নয়। চাইলে সিটি করপোরেশন কিংবা স্থানীয় জনগণ যৌথভাবে তাদের খাবার ও পানির ব্যবস্থা করতে পারে,’ বলেন তিনি।

অস্তিত্ব সংকটে ‘নগর-বানর’গেন্ডারিয়া কবরস্থান ও এর আশপাশে এখনো বানরদের দেখা যায়, ছবি: বিপ্লব দিক্ষিৎ

রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা কতটা?

প্রাণিবিদরা বলছেন, প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে রোগ সংক্রমণের ঘটনাকে ‘জুনোটিক ডিজিজ’ বলা হয়। তবে পুরান ঢাকা বা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বানর থেকে মানুষের মধ্যে কোনো বড় ধরনের রোগ ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘মানুষ সাধারণত বানরের খুব কাছাকাছি যায় না। ফলে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকিও তুলনামূলক কম। তবে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা সবসময়ই প্রয়োজন।’

নির্যাতন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া ও অপুষ্টি

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাবারের খোঁজে লোকালয়ে ঢুকলে অনেক সময় বানর তাড়াতে ঢিল ছোড়া হয়। আবার বৈদ্যুতিক তারে চলাচলের সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপুষ্টি বর্তমানে নগর-বানরদের সবচেয়ে বড় সংকট। পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়ায় অনেক বানর বয়সের তুলনায় অস্বাভাবিক রকমের শীর্ণ হয়ে পড়ছে।

আরও পড়ুন
বানর-রাজ্যে একদিন
একশো বছর ধরে বানরের বাস পুরান ঢাকায়
পুরান ঢাকায় বানর রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন

বাঁচাতে হলে যা করতে হবে

স্থানীয় ও বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরান ঢাকার বানরদের অস্তিত্ব রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে রাজধানী থেকে এই প্রাণী প্রায় সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যেতে পারে। তাদের মতে, সংরক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গেন্ডারিয়া, সূত্রাপুর, শাঁখারীবাজারসহ যেসব এলাকায় এখনো বানরের বিচরণ রয়েছে, সেখানে ছোট আকারের আশ্রয়কেন্দ্র বা নির্দিষ্ট নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে তোলা প্রয়োজন। এসব স্থানে নিয়মিত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হলে বানরগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে লোকালয়ে ঘোরাফেরা না করে নির্দিষ্ট এলাকায় অবস্থান করতে অভ্যস্ত হবে। এতে যেমন তাদের খাদ্যসংকট কিছুটা লাঘব হবে, তেমনি মানুষের সঙ্গে সংঘাতও কমবে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রাণীদের টিকিয়ে রাখতে হলে পুরান ঢাকার পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই। এজন্য বুড়িগঙ্গা নদীর তীরসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন সরকারি খালি জায়গায় ফলদ ও দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে বানরদের প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎস তৈরি হবে, অন্যদিকে নগরীর জীববৈচিত্র্যও সমৃদ্ধ হবে। পাশাপাশি বর্তমানে বৈদ্যুতিক তার ও বিভিন্ন অবকাঠামোর কারণে বানরের মৃত্যুর যে ঝুঁকি রয়েছে, তা কমাতে নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ ও বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি বলে মনে করেন তারা।

তাদের মতে, শুধু অবকাঠামোগত উদ্যোগ নিলেই হবে না, জনসচেতনতাও বাড়াতে হবে। অনেক সময় খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে প্রবেশ করায় বানর নির্যাতনের শিকার হয়। তাই তাদের প্রতি সহনশীল আচরণ ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনায় বন্যপ্রাণীর জন্য ‘গ্রিন করিডোর’ বা সবুজ সংযোগপথ অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, নগর উন্নয়ন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে একসঙ্গে বিবেচনায় এনে পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে থাকা এই বানরগুলো বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

অস্তিত্ব সংকটে ‘নগর-বানর’গেন্ডারিয়া কবরস্থানে বানরের দল, ছবি: জাগো নিউজ

নৈতিকতারও প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু একটি প্রাণী সংরক্ষণের নয়। এটি নগরের মানবিকতা ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতারও প্রশ্ন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘মানুষ নিজেকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব বলে। তাহলে অন্য প্রাণীদের টিকে থাকার সুযোগ করে দেওয়াও মানুষের দায়িত্ব। বানর প্রকৃতির সৌন্দর্যের অংশ, শহরের ইতিহাসের অংশ।’

পুরান ঢাকার শত বছরের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই বানরগুলো আজ কংক্রিটের নগরে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে। মানুষের জন্য যেমন শহর প্রয়োজন, তেমনি এই শহরের প্রাণ-প্রকৃতিরও বেঁচে থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় একদিন হয়তো পুরান ঢাকার অলিগলিতে ইতিহাস থাকবে, থাকবে দালানকোঠা কিন্তু থাকবে না সেই চিরচেনা বানরের দল।

উদ্যোগের আশ্বাস মিললেও বাস্তবায়ন হয়নি

স্থানীয় সমাজসেবী ও মাদকবিরোধী সংগঠন ‘প্রত্যাশা’র সাধারণ সম্পাদক হেলাল আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, পুরান ঢাকার অসহায় বানরগুলোর জন্য অতীতে মাঝেমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই সেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আমরা ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ইশরাক হোসেনের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলাম। ভোট প্রচারণার সে সময় তিনি বানরগুলোর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে সেটি আর বাস্তবায়ন হয়নি।’

অস্তিত্ব সংকটে ‘নগর-বানর’গেন্ডারিয়া কবরস্থানে বানরের ব্যস্ততা, ছবি: জাগো নিউজ

হেলাল আহমেদ জানান, বর্তমান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের কাছেও বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। তিনি মৌখিকভাবে ৪০, ৪৫ ও ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডে থাকা বানরগুলোর জন্য প্রতিদিন দুই হাজার টাকা করে খাদ্য বরাদ্দ দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তবে সেই উদ্যোগও বাস্তব রূপ পায়নি।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে কিছু ব্যক্তি উদ্যোগে বানরগুলোর খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সেটি প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। খাদ্যসংকটের কারণে প্রাণীগুলোকে প্রতিনিয়ত লোকালয়ে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে।’

হেলাল আহমেদ জানান, এই অসহায় প্রাণীগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা মানুষের সঙ্গে সহাবস্থান করে নিরাপদে বেঁচে থাকতে পারে এবং বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে স্থানীয় বাসিন্দারা বানরগুলোর জন্য খাদ্য সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি পুনরায় সরকারি উদ্যোগ গ্রহণের দাবিতে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা নিয়েছেন।

নগর-বানরদের সংরক্ষণে কোনো কার্যকর উদ্যোগ রয়েছে কি না এবং স্থানীয়দের উত্থাপিত দাবির বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি), স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ঢাকা বন বিভাগের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এমডিএএ/এমএমএআর/এমএফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow