আমাদের বউ কেমন হবে?
পুরাতন কর্ণফুলী ব্রিজের একটু আগে একটা দোতলা বিল্ডিং ছিলো। সেই বিল্ডিংয়ের দেওয়ালে একটা চিকা মারা ছিরেঅ- ‘আমাদের বউ কেমন হবে?’ এই চিকা কে বা কারা লিখেছেন? কেন লিখেছেন আমরা জানি না! আমি যখন চাঁদের গাড়িতে করে আনোয়ারা যেতাম। তখন ব্রিজ পার হওয়ার আগে এই চিকা দেখতাম। ব্রিজের এপার থেকে আনোয়ারা গহিরা রুটে (রাজাখালি) পুরাতন জিপ চলাচল করতো। পার্বত্য অঞ্চলে এইসব জিপকে চাঁদের গাড়ি বলে। তাই আমি গহিরা রুটের জিপকে চাঁদের গাড়ি বলি। আমাদের বউ কেমন হবে? এই চিকা আমাকে ভাবাতো। কারণ, তখন আমি অবিবাহিত তরুণ- যে লিখেছে বা যারা লিখেছে নিশ্চয়ই কোনো কারণ ছিলো। সে অজানা ‘কারণ’ আমার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এক সময় সেই ‘কারণ’ আমার জীবন থেকে হারিয়ে যায়। হারিয়ে যাওয়ারও একটি কারণ ছিলো। সে হলো, যখন পথে-ঘাটে বা মহল্লায় মায়াবতী তরুণী দেখতাম। মনে মনে আনন্দিত হতাম, এদের মাঝে কোনো একজন মায়াবতী আমার বউ হবে! কার বউ কেমন হবে সেটা তো ভাগ্যের ব্যাপার। কোনো এক মনীষী বলেছিলেন- ‘বিয়ে করো, স্ত্রী যদি ভালো হয় তাহলে তুমিও ভালো স্বামী হবে। আর স্ত্রী যদি মন্দ হয়, তুমি দার্শনিক হবে। উভয়ই লাভ!’ ভালো খারাপ তো কোনো পাত্রীর কপালে
পুরাতন কর্ণফুলী ব্রিজের একটু আগে একটা দোতলা বিল্ডিং ছিলো। সেই বিল্ডিংয়ের দেওয়ালে একটা চিকা মারা ছিরেঅ- ‘আমাদের বউ কেমন হবে?’ এই চিকা কে বা কারা লিখেছেন? কেন লিখেছেন আমরা জানি না!
আমি যখন চাঁদের গাড়িতে করে আনোয়ারা যেতাম। তখন ব্রিজ পার হওয়ার আগে এই চিকা দেখতাম। ব্রিজের এপার থেকে আনোয়ারা গহিরা রুটে (রাজাখালি) পুরাতন জিপ চলাচল করতো। পার্বত্য অঞ্চলে এইসব জিপকে চাঁদের গাড়ি বলে। তাই আমি গহিরা রুটের জিপকে চাঁদের গাড়ি বলি।
আমাদের বউ কেমন হবে? এই চিকা আমাকে ভাবাতো। কারণ, তখন আমি অবিবাহিত তরুণ- যে লিখেছে বা যারা লিখেছে নিশ্চয়ই কোনো কারণ ছিলো। সে অজানা ‘কারণ’ আমার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এক সময় সেই ‘কারণ’ আমার জীবন থেকে হারিয়ে যায়। হারিয়ে যাওয়ারও একটি কারণ ছিলো। সে হলো, যখন পথে-ঘাটে বা মহল্লায় মায়াবতী তরুণী দেখতাম। মনে মনে আনন্দিত হতাম, এদের মাঝে কোনো একজন মায়াবতী আমার বউ হবে!
কার বউ কেমন হবে সেটা তো ভাগ্যের ব্যাপার। কোনো এক মনীষী বলেছিলেন- ‘বিয়ে করো, স্ত্রী যদি ভালো হয় তাহলে তুমিও ভালো স্বামী হবে। আর স্ত্রী যদি মন্দ হয়, তুমি দার্শনিক হবে। উভয়ই লাভ!’
ভালো খারাপ তো কোনো পাত্রীর কপালে লেখা থাকে না। ঘর-সংসার করার পর বোঝা যায় কে মন্দ আর কে ভালো।
তবে আমার খুব দার্শনিক হওয়ার শখ ছিল আবার চাইতাম আমার হবু স্ত্রী যেন ভালো হয়- মানে গাছেরটা খাওয়া আবার তলেরটাও চাওয়া আরকি!
ওই মনীষীর কথা যদি সত্য হয় তাহলে ভালো স্বামী আর দার্শনিক একসাথে হয় না- আমি মনে মনে বললাম।
একসময় এইসব ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দেই। স্ত্রী যেমনই হোক আমি ভালো স্বামী হবো। কিন্তু একসময় আবারো ‘আমাদের বউ কেমন হবে?’ এর কারণ, আমার বউ কেমন হবে? চিন্তায় রূপান্তর হয়! আর এই চিন্তার কারণ, নূরু মিস্ত্রীর বউ!
আমি যখন ৪২ নাম্বার আইচফ্যাক্টরি রোডে অবস্থিত নাহার হার্ডওয়্যার স্টোরের সেলসম্যান ছিলাম। তখন থেকে নূরু মিস্ত্রীর সাথে পরিচয়। নূর মিস্ত্রী সোফা মিস্ত্রী ছিলো। নাহার হার্ডওয়্যারের পাশেই নূরু মিস্ত্রীর দোকান। নাহার হার্ডওয়্যার স্টোর বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও, নূরু মিস্ত্রীর সাথে আমার দেখা-সাক্ষাৎ...
যদিও বয়সে আমার চেয়ে বড় কিন্তু আমরা বন্ধুর মতো ছিলাম। আমরা অনেক সময় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করতাম।
নূরু মিস্ত্রীর প্রতিদিন আয় হতো ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। আর আমার প্রতিদিন আয় হতো ৪০ থেকে ৫০ টাকা। তারপরও আমার কাছ থেকে তিনি প্রায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা ধার-কর্জ নিতেন।
একবার নিলে সহজে শোধ করতে পারতেন না। দিনের পর দিন একই পোশাক পরতেন। অসুখ-বিসুখ হলে ডাক্তার দেখাতেন না। মাথায় তেল দিতেন না। চা আর হাড্ডি বিস্কুট দিয়ে নাস্তা করতেন। কম দামি বিড়ি খেতেন।
আমি মনে মনে ভাবতাম আর অবাক হতাম। মাসে যার ৯ থেকে ১২ হাজার টাকা আয়, তার এমন করুণ দশা কেন?
একদিন আমি নূরু মিস্ত্রীকে মনের ভাবনা বলি। আমি জানতে চাই, এই করুণ অবস্থার কারণ!
আমি যখন কারণ জানতে চাইলাম। তখন তিনি বললেন-কারণ বললে হয়তো বিশ্বাস করবেন না। কারণ সচক্ষে দেখতে হবে। আর তা দেখতে হলে আপনি আমার বাসায় নিয়মিত ছয় মাস যাওয়াআসা করতে হবে।
ছয় মাস না, আমি তিনমাসেই কারণগুলো দেখতে পাই।
নূরু মিস্ত্রীর দম্পতির এক ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে সংসার। ছেলের বয়স দশ বছর আর মেয়ের বয়স সাত বছর। ভাবি (নূরু মিস্ত্রী-র স্ত্রী) সুন্দরী এবং সৌখিন। আমি তখন অবিবাহিত তরুণ। আমার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট আর দশ বছরের বড় সব নারীদের সুন্দরী মনে হতো।
আর আমার বয়স তখন একুশ বছর।
তাই ভাবীকেও সুন্দরী মনে হতো। ভাবির একটা বোন ছিলো। গালে প্রচুর ব্রণের দাগ। আর এই ব্রণের দাগের কারণে বিয়ে হচ্ছিলো না। সেই ব্রণের দাগওয়ালিকেও সুন্দরী মনে হতো। মনে হতো সিনেমার নায়িকা। মাঝেমাঝে স্বপ্নেও আসতো।
একদিন নূরু মিস্ত্রীকে বলি- ভাই, আপনার শালি আমার স্বপ্নে আসে। তিনি বললেন- যা করার স্বপ্নে করেন। বাস্তবে করার কথা স্বপ্নেও ভাববেন না। তাহলে জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যাবেন।
ভাবি ছিলো ১০০% খাঁটি সৌখিন ও বিলাসী নারী! তিনি প্রতিটি বিয়ের দাওয়াতে নতুন শাড়ি পরে যেতেন। একবার যে শাড়ি পরে কোনো বিয়েতে গেছেন- পরে সেই শাড়ি পরে অন্য বিয়েতে যেতেন না। কারণ, সবাই শাড়ি দেখে ফেলেছে; তাই সেটা পুরাতন হয়ে গেছে। আরেক বিয়েতে অবশ্যই আরেকটি নতুন শাড়ি চাই। বছরে দু'তিনটি বিয়ের দাওয়াতে যেতে হয়।
বিয়ের দাওয়াতে যাওয়া ছিল ওনার কাছে মান-ইজ্জ্বতের প্রশ্ন।
ঈদের সময় বান্ধবীরা শাড়ি কেনার পর নিজে কিনবে। অবশ্যই শাড়ি হতে সব বান্ধবীদের চেয়ে দামি। আর সন্তানদের জন্য চাই, প্রতিবেশীর সন্তানদের চেয়ে দামি পোশাক। পরিচিত কেউ উনার চেয়ে দামি শাড়ি যদি পরে তাহলে ইজ্জ্বতের বারোটা বাজবে!
শুধু যে দামি শাড়ি পরবেন তা না, অন্যদের কাছে শাড়ির দাম দ্বিগুণ বলা একটি শখও!
আমি ভাবির রান্নাঘরে যেয়ে প্রথমে মনে করেছিলাম- অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিলের দোকানে এসেছি। আসলে তা না। না রকমের নানা ডিজাইনের হাঁড়ি-পাতিল কিনে তাক সাজিয়ে রেখেছেন। অনেক হাঁড়িপাতিলে কখনো রান্নাবাড়া করেননি। শুধু কিনে রান্নাঘরে সাজিয়ে রেখেছেন। ভাবির সাথে আলাপ করে জানতে পারি ভাবির খুব শখের হাঁড়িপাতিল এইসব।
লেডিস জুতার মেলা দেখে আমার অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা। তের জোড়া জুতা ছিলো জুতার রেকে! হিলওয়ালা, হিল ছাড়া, নানারকম- নানা ডিজাইনের জুতা।
শোকেস দেখে মনে হয়েছিলো -আমি চুড়ি, নাকফুল, চুলের কাঁটা, ঝুমকা, টিপ, লকেট এর পাইকারি দোকানে এসেছও- আসলে তা না, এইসব ভাবির কালেকশন!
ভাবি নিজেই বলেছে এইসবের মূল্য লাখ টাকার কাছাকাছি। ভাগ্যিস ওসব স্বর্ণের নয়। স্বর্ণের হলে নূরু মিস্ত্রীকে বন্দুকধারী একজন পাহারাদার রাখতে হতো।
নূরু মিস্ত্রী বলেছে আমায়, আমি দেখিনি- তিনি বলেছেন- আমার স্ত্রীর কাছে যতো ডিজাইনের যত ব্রা আছে তা বিক্রি করলে আপনার একমাসের আয়ের সমান হবে। আমার আয় তখন ১৫০০ টাকা। আর উন্নতমানের একটা ব্রা তখন ত্রিশ থেকে চল্লিশ টাকা।
ভাবির ব্রাগুলো দেখার খুব শখ ছিল। শখের কথা প্রকাশ করার সাহস পাইনি- আসলে শখ ছিল না আমার মনে ঘুমিয়ে থাকা নোংরা মনের ইচ্ছে ছিল জানি না!
মেহমান আসলে সাত-আট পদের রান্না করা চাই। যেমন- মুরগির মাংসের ঝাল তরকারি- মুগরীর ঠ্যাং চামড়া দিয়ে ছোলার ডাল- যে কোনো মাছ ভাজি- ঝোলঝোল করে মাছের তরকারি।
গরু মাংস ভুনা। ছোটছোট চিংড়ি দিয়ে সবজি।
তিনি অনেক পদের রান্না করতে পারতেন। তবে রান্ন খুব সুস্বাদু হতো। যতবার নূরু মিস্ত্রীর বাসায় খেয়েছি- লাজ-শরমের মাথা খেয়ে প্লেট চেটে চেটে খেয়েছি।
একবার ভাবিকে জিজ্ঞেস করি তালতো বোনও কি আপনার মতো রাঁধে নাকি?
ভাবি বললেন- আরে না ও এখনো বাচ্চা। ও রান্নার কী বুঝে! কেন জানতে চান?
-মানে একটু ঝুঁকি নিতে চাইছিলাম আরকি!
-কীসের ঝুঁকি?
-মানে নূরু ভাইকে ভায়রা বানাতে চাইছিলাম।
-এতে ঝুঁকি কীসের! বিয়ে তো নেয়ামত।
-হ্যাঁ! নেয়ামত! নূরু ভাইকে দেখে বুঝতে পারলাম।
-আপনার নূরু ভাইর কপাল ভালো আমার মতো মেয়ে পাইছে।
আমাদের খান্দানের নামডাক আছে। কথায় আছে না -
নদীর পানি ঘোলা ভালো, জাতের মাইয়া কালাও ভালো।
-ভাবি আপনিতো কালো না। হেমা মালিনীর মতো।
-যাহ..... কীসব বলেন!
আমি নূরু মিস্ত্রীর কাছে জানতে চাই- আপনি এতো টর্চার সহ্য করেন কীভাবে? তিনি বললেন- না করে উপায় নাই। ঘরে শান্তি বজায় রাখতে সব হজম করি। না হয় আমার বাচ্চাদের জীবনে ঝড় বয়ে আসবে। তারা বাবা অথবা মা হারাবে।
এরপর থেকে আমার বউ কেমন হবে? এই চিন্তা করতে করতে হঠাৎ দেখি আমার মাথার দুটি চুল সাদা। অথচ বয়স তখন আমার মাত্র একুশ...
What's Your Reaction?