আয়-ব্যয়ে ভারসাম্য রাখা ইসলামের শিক্ষা

বিশ্বজুড়েই বর্তমানে বিরাজ করছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। মুদ্রাস্ফীতি, যুদ্ধের প্রভাব, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের ঊর্ধ্বমূল্য এবং অর্থনৈতিক মন্দা সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলেছে। উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। মুমিন হিসেবে বাজেটের সময় আমাদের অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা কেবল বস্তুগত হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানবিক ও আধ্যাত্মিক মানদণ্ডেও বিচার করা প্রয়োজন। ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত উপাসনার ধর্ম নয়, বরং একটা পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যেখানে অর্থনীতিকে জীবনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আরবিতে অর্থনীতিকে বলা হয় ‘ইকতিসাদ’, যার মূল অর্থ হলো ‘মধ্যপন্থা’। অর্থাৎ, আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হলো প্রকৃত ইসলামি অর্থনীতি। নতুন বাজেট সামনে রেখে জাতীয় সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ইসলামের এই চিরন্তন শিক্ষাগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা সময়ের দাবি। কোরআনের আলোকে মুমিনের বাজেট বাজেটের হিসাব বর্তমানে আলোচিত হলেও পবিত্র কোরআনের পাতায় এর ঐতিহাসিক ও সফল প্রয়োগের দৃষ্টান্ত রয়েছে। হজরত ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা আমাদের সে শিক্ষাই দেয়। প্রাচীন মিশরে একবার জ

আয়-ব্যয়ে ভারসাম্য রাখা ইসলামের শিক্ষা

বিশ্বজুড়েই বর্তমানে বিরাজ করছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। মুদ্রাস্ফীতি, যুদ্ধের প্রভাব, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের ঊর্ধ্বমূল্য এবং অর্থনৈতিক মন্দা সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলেছে। উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। মুমিন হিসেবে বাজেটের সময় আমাদের অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা কেবল বস্তুগত হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানবিক ও আধ্যাত্মিক মানদণ্ডেও বিচার করা প্রয়োজন। ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত উপাসনার ধর্ম নয়, বরং একটা পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যেখানে অর্থনীতিকে জীবনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আরবিতে অর্থনীতিকে বলা হয় ‘ইকতিসাদ’, যার মূল অর্থ হলো ‘মধ্যপন্থা’। অর্থাৎ, আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হলো প্রকৃত ইসলামি অর্থনীতি। নতুন বাজেট সামনে রেখে জাতীয় সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ইসলামের এই চিরন্তন শিক্ষাগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা সময়ের দাবি।

কোরআনের আলোকে মুমিনের বাজেট

বাজেটের হিসাব বর্তমানে আলোচিত হলেও পবিত্র কোরআনের পাতায় এর ঐতিহাসিক ও সফল প্রয়োগের দৃষ্টান্ত রয়েছে। হজরত ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা আমাদের সে শিক্ষাই দেয়। প্রাচীন মিশরে একবার জাতীয় দুর্যোগ দেখা দিলে মিসরের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয় হজরত ইউসুফ (আ.)-কে। মিসরের বাদশা যখন দুর্ভিক্ষের আগাম সংকেত পেয়ে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন, তখন ইউসুফ (আ.) কেবল সমস্যা চিহ্নিতই করেননি, বরং এর উত্তরণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রদান করেছিলেন। এর থেকে আমরা জাতীয় বাজেটের ধারণা পাই। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ইউসুফ (আ.) সাত বছরের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং পরবর্তী সাত বছরের দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস দিয়ে বললেন, ‘তোমরা সাত বছর উত্তমরূপে চাষাবাদ করবে। অতঃপর যা কাটবে, তার মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা খাবে তা ছাড়া অবশিষ্ট শস্য শীষসমেত রেখে দেবে’ (সুরা ইউসুফ : ৪৭-৪৯)। ইউসুফ (আ.)-এর এই সুদূরপ্রসারী চিন্তার মধ্যে দুটি বড় বিষয় ছিল—১. উদ্বৃত্ত সম্পদ সঞ্চয় করা এবং ২. অপচয় রোধ করা। একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে তিনি যখন নিজেকে ‘বিশ্বস্ত রক্ষক ও জ্ঞানবান’ (সুরা ইউসুফ : ৫৫) হিসেবে পরিচয় দিয়ে ধনভান্ডারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন তিনি সততা ও দক্ষতার যে মেলবন্ধন তৈরি করেছিলেন, তা আজকের জাতীয় বাজেট প্রণয়নে আমাদের জন্য বড় শিক্ষা। রাষ্ট্রের সম্পদ কেবল ভোগের বিষয় নয়, বরং এটা একটা আমানত, যা যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতির থাকা প্রয়োজন।

আয়-ব্যয়ে ভারসাম্য রাখা জরুরি

ইসলামী অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ হলো ব্যয়ের পরিমিতিবোধ। ইসলাম ‘ইসরাফ’ (প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয়) এবং ‘তাবযির’ (অবৈধ বা অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয়) এই উভয়কেই কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। কুরআন কারিমে আল্লাহ তায়ালা পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা আহার করবে ও পান করবে, কিন্তু অপচয় করবে না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না’ (সুরা আরাফ : ৩১)। অন্যদিকে, যারা অপব্যয় করে, তাদের শয়তানের ভাই বলে সম্বোধন করা হয়েছে (সুরা বনি ইসরাইল : ২৭)। জাতীয় বাজেটের ক্ষেত্রে অপচয় রোধ একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। সরকারি দপ্তরে বিলাসবহুল আসবাবপত্র, বিদেশ ভ্রমণ, অদরকারি প্রকল্প গ্রহণ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অপব্যবহার বাজেটের বিশাল অংশকে গিলে খায়। বাজেট ঘাটতি মেটাতে কেবল কর বাড়ানোর চিন্তা না করে, যদি সরকারি স্তরে প্রতিটি অর্থ খরচের ক্ষেত্রে ‘ইকতিসাদ’ বা মিতব্যায়িতার নীতি অনুসরণ করা হয়, তবে জাতীয় কোষাগারের ওপর চাপ অনেক লাঘব হবে। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের সম্পদের সুরক্ষা করা যেমন কর্তব্য, তেমনি নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব হলো জনগণের কষ্টের উপার্জিত অর্থ যেন কোনোভাবেই অপচয়ের অতলে হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা।

দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা

অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম বড় কারণ হলো দুর্নীতি। সমাজদেহে দুর্নীতি যেন একটি মরণব্যাধির মতো। ইসলাম শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সততার কথা বলে না, বরং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়। আর্থিক দুর্নীতি ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়কেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। যারা জনগণের হক মেরে খায়, তাদের পরকালীন পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন অনেকে নামাজ-রোজা নিয়ে আসবে কিন্তু অন্যের সম্পদ ভোগ করার কারণে তার নেকি নিঃশেষ হয়ে যাবে’ (মুসলিম : ৬৭৪৪)। রাষ্ট্রের জাতীয় বাজেটে দুর্নীতির ছিদ্রপথ বন্ধ করা গেলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অহেতুক চাপ পড়বে না। ঘুষ, সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়ানো, এবং জবরদখলের মতো বিষয়গুলো বন্ধ করতে পারলে অর্থনীতির চাকা স্বাভাবিক গতিতে সচল থাকবে। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখা বা অসাধু উপায়ে তা আহরণ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। প্রতিটি আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা এবং ‘হালল’ ও ‘হারাম’-এর বাছবিচার থাকলে অর্থনীতিতে বরকত আসে। বরকত কেবল গাণিতিক হিসাব নয়; বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক রহমত, যা স্বল্প সম্পদকেও পর্যাপ্ত করে দেয়।

অর্থের সুষম প্রবাহের মাধ্যম জাকাত

ইসলামী অর্থনীতিতে জাকাত কেবল একটি ধর্মীয় ইবাদত নয়, বরং এটা একটা সামাজিক সুরক্ষা বলয় বা সোশ্যাল সেফটি নেট। ধনীদের সম্পদের ওপর গরিবের যে হক রয়েছে, জাকাত প্রদানের মাধ্যমে তা পূরণ হয়। বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ধনী-গরিবের বৈষম্য একটা বড় সমস্যা। বাজেটের বড় অংশ জনকল্যাণে ব্যয় করতে হয়। যদি দেশের সব সম্পদশালী ব্যক্তি সঠিকভাবে জাকাত প্রদান করে এবং সেই জাকাতের অর্থকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সুপরিকল্পিত উপায়ে গরিব ও অসহায়দের স্বাবলম্বী করার কাজে ব্যবহার করা হয়, তবে সরকারের বাজেটের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে আসবে। জাকাত অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার করে। এটা অর্থ প্রবাহকে স্থবির করে না, বরং গরিবের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে বাজার ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখে। পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী, দানে সম্পদের ঘাটতি হয় না বরং বৃদ্ধি পায় (সুরা সাবা : ৩৯)। অতএব, জাতীয় বাজেট প্রণয়নে জাকাত ও সাদকার মতো ইসলামী অর্থনৈতিক বিষয়গুলো আরও গুরুত্বসহকারে মূল্যায়ন করা যেতে পারে, যা বৈষম্য কমিয়ে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক হবে।

ব্যক্তিজীবনে পরিমিতবোধ ঠিক রাখা

জাতীয় বাজেট কেবল সরকারের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রতিটি নাগরিকের জীবন। রাষ্ট্রের অর্থনীতির ভিত্তি হলো নাগরিকের সামষ্টিক সঞ্চয় ও ব্যয়। প্রতিটি পরিবার যদি ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করে, অর্থাৎ সাধ্যের বাইরে গিয়ে বিলাসিতা বর্জন করে, তবে পুরো দেশের ওপর অর্থনীতির চাপ কমে আসে। রাসুল (সা.)-এর একটি বাণীতে রয়েছে, ‘যে ব্যক্তি ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে, সে কখনও অভাবগ্রস্ত হয় না’ (মুসনাদে আহমাদ : ৪২৬৯)। বাজেট উপলক্ষে আমাদের প্রতিটি নাগরিকের শপথ হওয়া উচিত, আমরা অপচয় কমাব, দেশি পণ্যের ব্যবহার বাড়াব এবং অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা ত্যাগ করব। যখন একজন নাগরিক তার সীমিত আয়ে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করে, তখন তার সঞ্চয় জাতীয় বিনিয়োগে ভূমিকা রাখে। এভাবে প্রতিটি পরিবারের অর্থনৈতিক সচেতনতা সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। কোরআন কারিমে মুমিনের পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘তারা ব্যয় করার সময় অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না; বরং তারা মধ্যপন্থা অবলম্বন করে’ (সুরা ফুরকান : ৬৭)। এই মধ্যপন্থা বা ভারসাম্যই জীবনে অনেক বরকত বহন করে আনে।

মোটকথা, জাতীয় বাজেট যেন কেবল একটা ‘রাষ্ট্রীয় সংখ্যা গণনার সংবাদ’ না হয়; বরং আমাদের ব্যক্তিজীবনেও নতুন করে ভাবার সুযোগ হয়। ইসলাম আমাদের শেখায়, অর্থনীতি কেবল লাভ-ক্ষতির বিষয় নয়, বরং এটা আমাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্বও। আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় যদি সততা, স্বচ্ছতা, অপচয় রোধ এবং ন্যায়ভিত্তিক বণ্টনের মতো ইসলামি নীতিগুলোর প্রতিফলন ঘটে, তবেই আমরা একটি স্বাবলম্বী ও সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে টিকে থাকতে পারব। বিশ্বমন্দার এই কঠিন সময়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এবং তার নির্দেশিত পথে আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করে চলা আমাদের জন্য অনিবার্য হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্র যদি তার সম্পদের আমানত রক্ষা করে এবং নাগরিকরা যদি দায়িত্বশীল ও মিতব্যয়ী হয়, তবেই আমরা শত সংকটেও উন্নয়নের পথে অবিচল থাকতে পারব। আল্লাহ তায়ালা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে বরকত দান করুন এবং আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে দেশ ও জাতির কল্যাণে কবুল করে নিন।

লেখক: মুহাদ্দিস ও ইসলামী চিন্তাবিদ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow