ইরান যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেবে হুথিদের অংশগ্রহণ?

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে ইরান যুদ্ধে যোগ দিয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। তবে তাদের এই অংশগ্রহণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা নির্ভর করছে হুথিদের কৌশলের ওপর। তারা কি দূর থেকে ইসরায়েলের দিকে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে লোহিত সাগর কার্যত বন্ধ করে দেবে— তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সেই বিখ্যাত উক্তি—‘একটি রাষ্ট্রের নীতি তার ভূগোলের মধ্যেই নিহিত’—বর্তমান পরিস্থিতিতে হুথিদের ক্ষেত্রে চরম সত্য হয়ে ধরা দিচ্ছে। অদম্য এক বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিরা শিয়া মতাদর্শভিত্তিক একটি সংগঠন, যারা ২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনের রাজধানীসহ বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। সংগঠনটি জটিল হলেও টিকে থাকার ক্ষেত্রে বেশ সক্ষম। ২০২৫ সালের আগস্টে ইসরায়েল হুথিদের প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান ও কয়েকজন মন্ত্রীকে হত্যা করলেও তাদের নেতা আবদুল মালিক আল-হুথিকে এখনো খুঁজে পায়নি। যদিও তারা ইরানের প্রক্সি হিসেবে পরিচিত, তবুও নিজেদের স্বার্থ ও আঞ্চলিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে হুথি বিদ্রোহীরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলছে। যুদ্ধবিরতি ও কৌশলগত অব

ইরান যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেবে হুথিদের অংশগ্রহণ?

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে ইরান যুদ্ধে যোগ দিয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। তবে তাদের এই অংশগ্রহণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা নির্ভর করছে হুথিদের কৌশলের ওপর। তারা কি দূর থেকে ইসরায়েলের দিকে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে লোহিত সাগর কার্যত বন্ধ করে দেবে— তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সেই বিখ্যাত উক্তি—‘একটি রাষ্ট্রের নীতি তার ভূগোলের মধ্যেই নিহিত’—বর্তমান পরিস্থিতিতে হুথিদের ক্ষেত্রে চরম সত্য হয়ে ধরা দিচ্ছে।

অদম্য এক বিদ্রোহী গোষ্ঠী

হুথিরা শিয়া মতাদর্শভিত্তিক একটি সংগঠন, যারা ২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনের রাজধানীসহ বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। সংগঠনটি জটিল হলেও টিকে থাকার ক্ষেত্রে বেশ সক্ষম। ২০২৫ সালের আগস্টে ইসরায়েল হুথিদের প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান ও কয়েকজন মন্ত্রীকে হত্যা করলেও তাদের নেতা আবদুল মালিক আল-হুথিকে এখনো খুঁজে পায়নি।

যদিও তারা ইরানের প্রক্সি হিসেবে পরিচিত, তবুও নিজেদের স্বার্থ ও আঞ্চলিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে হুথি বিদ্রোহীরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলছে।

যুদ্ধবিরতি ও কৌশলগত অবস্থান

২০২৫ সালের মে মাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হুথিদের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, যা ওমানের মধ্যস্থতায় হয়েছিল। এর ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজে হামলা বন্ধ হয়। তবে হুথিরা স্পষ্ট জানায়, এই যুদ্ধবিরতি ইসরায়েলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এবং পরবর্তীতে কিছু হামলা চালানোও হয়।

এই যুদ্ধবিরতির পেছনে ইরানের একটি কৌশল ছিল—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনার আগে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে আনা। পরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতির পর হুথিরা ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও কিছুটা সংযত হয়।

তবে বড় বড় জাহাজ কোম্পানিগুলো ধীরে ধীরে আবার লোহিত সাগর ব্যবহার শুরু করলেও অনেকেই এখনো দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বিকল্প পথে চলাচল করছে।

দুই জলপথের দ্বিমুখী চাপ

ইরান তার আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করার যে কৌশল নিয়েছে, সেটি ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। তেহরান এরই মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। এখন যদি হুথিরা লোহিত সাগরে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়, তবে তার প্রভাব হবে বিধ্বংসী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাব আল-মান্দেব সবসময়ই হুথিদের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ছোট নৌকা হামলার ঝুঁকিতে থাকে। হুথিরা যদি দীর্ঘ সময় ধরে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে, তাহলে পরিবহন খরচ বাড়বে, তেলের দাম বাড়বে এবং এরই মধ্যে চাপে থাকা বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংক চ্যাথাম হাউজের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ফারিয়া আল-মুসলিমী সতর্ক করে বলেন, ‘এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে বিঘ্ন ঘটলে জাহাজ ভাড়া ও তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যা ভঙ্গুর বিশ্ব অর্থনীতিকে খাদের কিনারে ঠেলে দেবে।’

সৌদি আরবের ভূমিকা ও অভ্যন্তরীণ সংকট

হুথিরা যুদ্ধের ময়দানে সক্রিয় হলেও তারা পর্দার আড়ালে সৌদি আরবের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধার প্রত্যাশা করছে। বর্তমানে ইয়েমেনের দক্ষিণে সৌদি আরবের একক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তারা চায় না লোহিত সাগরে নতুন কোনো সংঘাত শুরু হোক। এ অবস্থায় রিয়াদ সম্ভবত হুথিদের সঙ্গে কোনো গোপন চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে যাতে তাদের তেলের বাজার ও শিপিং লাইন সুরক্ষিত থাকে।

তবে হুথিরাও সতর্কভাবে এগোতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করা—শুধু ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া নয়।

তবে এতে ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। দেশটিতে এক দশকের বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে।

জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করে বলেন, এই উত্তেজনা ইয়েমেনকে আঞ্চলিক যুদ্ধে টেনে নিতে পারে। এতে সংকট সমাধান আরও জটিল হবে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হবে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হবে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
কেএএ/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow