ইশার নামাজ কখন পড়া উত্তম, সর্বশেষ সময় কখন
দিনভর ব্যস্ততার পর যখন পৃথিবী ধীরে ধীরে নিস্তব্ধতার চাদরে ঢেকে যায়, তখন মুমিনের হৃদয়েও শুরু হয় এক ভিন্ন আহ্বান। চারপাশের কোলাহল স্তব্ধ হয়ে এলে মানুষ যেন নিজের ভেতরটাকে নতুন করে খুঁজে পায়। আর সেই নীরব, গভীর ও প্রশান্ত মুহূর্তে আল্লাহর দরবারে দাঁড়ানোর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুযোগ হলো ইশার নামাজ। এটি শুধু একটি ফরজ ইবাদত নয়; বরং দিনের শেষ প্রহরে রবের সঙ্গে বান্দার একান্ত সম্পর্ক নবায়নের মুহূর্ত। ইশার নামাজকে ঘিরে ইসলামে রয়েছে বিশেষ ফজিলত, রয়েছে আধ্যাত্মিক প্রশান্তির এক অনন্য বার্তা। রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো তা ওয়াক্তের শুরুতে আদায় করেছেন, আবার কখনো কিছুটা বিলম্ব করেছেন। ফলে বহু মুসল্লির মনেই প্রশ্ন জাগে, ইশার নামাজ আদায়ের সর্বোত্তম সময় কোনটি? প্রথম ওয়াক্তে পড়া বেশি উত্তম, নাকি রাত গভীর হলে বিলম্ব করে আদায় করা অধিক ফজিলতের? চলুন তাহলে হাদিস, ফিকহ ও আলেমদের ব্যাখ্যার আলোকে এ বিষয়ে ইসলামের দিকনির্দেশনা জেনে নিই— ইশার নামাজ জামাতে আদায় ইশার নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করার ফজিলত সম্পর্কে হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জামা
দিনভর ব্যস্ততার পর যখন পৃথিবী ধীরে ধীরে নিস্তব্ধতার চাদরে ঢেকে যায়, তখন মুমিনের হৃদয়েও শুরু হয় এক ভিন্ন আহ্বান। চারপাশের কোলাহল স্তব্ধ হয়ে এলে মানুষ যেন নিজের ভেতরটাকে নতুন করে খুঁজে পায়। আর সেই নীরব, গভীর ও প্রশান্ত মুহূর্তে আল্লাহর দরবারে দাঁড়ানোর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুযোগ হলো ইশার নামাজ। এটি শুধু একটি ফরজ ইবাদত নয়; বরং দিনের শেষ প্রহরে রবের সঙ্গে বান্দার একান্ত সম্পর্ক নবায়নের মুহূর্ত।
ইশার নামাজকে ঘিরে ইসলামে রয়েছে বিশেষ ফজিলত, রয়েছে আধ্যাত্মিক প্রশান্তির এক অনন্য বার্তা। রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো তা ওয়াক্তের শুরুতে আদায় করেছেন, আবার কখনো কিছুটা বিলম্ব করেছেন। ফলে বহু মুসল্লির মনেই প্রশ্ন জাগে, ইশার নামাজ আদায়ের সর্বোত্তম সময় কোনটি? প্রথম ওয়াক্তে পড়া বেশি উত্তম, নাকি রাত গভীর হলে বিলম্ব করে আদায় করা অধিক ফজিলতের? চলুন তাহলে হাদিস, ফিকহ ও আলেমদের ব্যাখ্যার আলোকে এ বিষয়ে ইসলামের দিকনির্দেশনা জেনে নিই—
ইশার নামাজ জামাতে আদায়
ইশার নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করার ফজিলত সম্পর্কে হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জামাতের সঙ্গে ইশার নামাজ আদায় করল, সে যেন অর্ধেক রাত পর্যন্ত নফল নামাজ আদায় করল। আর যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করল, সে যেন সারা রাত নামাজ আদায় করল।’ (মুসলিম: ৬৫৬)
জামাতে ইশার নামাজ পড়ার এই ফজিলত ওয়াক্তের শুরুতে হোক বা শেষে—সর্বদাই প্রযোজ্য। তবে নামাজের সময় নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনায় কিছুটা বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়, যা উম্মতের জন্য রহমত স্বরূপ।
বিলম্ব করার ফজিলত
ইশার নামাজ কিছুটা বিলম্বে আদায় করার মাঝে একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক রহস্য ও ফজিলত নিহিত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বহু হাদিসে ইশাকে কিছুটা দেরিতে পড়ার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার উম্মতের জন্য যদি কষ্টসাধ্য মনে না হতো, তবে আমি তাদের ইশার নামাজ রাতের এক-তৃতীয়াংশ বা অর্ধেক রাত পর্যন্ত বিলম্ব করে আদায় করার নির্দেশ দিতাম।’ (তিরমিজি: ১৬৭)
এই হাদিসটি থেকে প্রতীয়মান হয়, আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ ও সওয়াবের বিচারে ইশার নামাজ বিলম্বে পড়া বেশি উত্তম। দিনের কাজ শেষ করে, সংসার ও সামাজিক ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে যখন মানুষ গভীর রাতে স্রষ্টার সামনে দাঁড়ায়, তখন একাগ্রতা বা ‘খুশু-খুজু’ বেশি অর্জিত হয়। কিন্তু উম্মতের কষ্ট হবে ভেবে রাসুলুল্লাহ (সা.) একে বাধ্যতামূলক করেননি। বরং নামাজের ওয়াক্তকে প্রশস্ত রাখা হয়েছে। (আতিয়্যাহ সাকার, ফাতাওয়া আল-আজহার, ৭/৪৩৩, আল-মাজমাউল ইসলামি, কায়রো, ১৯৯৯)
ইশার নামাজের উত্তম ও সর্বশেষ সময় কখন?
তালীমুল ইসলাম ইনস্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার,ঢাকা’র পরিচালক লুৎফুর রহমান ফরায়েজী বলেন, ইশার নামাজের সময় পশ্চিমাকাশের লালিমা দূরীভূত হয়ে যে সাদা আভা দেখা দেয়, তা দূরীভূত হবার পর থেকে নিয়ে রাতের তিন ভাগের এক ভাগের মাঝে পড়া মুস্তাহাব। তিনভাগ অতিক্রান্ত হবার পর থেকে নিয়ে অর্ধেক রাত পর্যন্ত পড়া জায়েজ। এতে কোনো কারাহাত নেই।
আর অর্ধেক রাত থেকে নিয়ে সুবহে সাদিক পর্যন্ত পড়া মাকরূহের সাথে জায়েজ। অর্থাৎ নামাজ আদায় হয়ে যাবে। বাকি বিলম্ব করার কারণে মাকরূহ হবে। (হেদায়া: ১/৫০-৫১, শরহে নুকায়া: ১/৫৩-৫৫, কাবীরী: ২২৯-২৩৫, তামহীদ: ৮/৯২)
উদাহরণত: (মাসআলাটি বুঝার জন্য উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে যা বর্তমান সময়ের সাথে মিলিয়ে নিতে হবে) সূর্য ডুবে যায় সন্ধ্যা ৭টায়। আর সূর্য ডুবার পর পশ্চিমাকাশের সাদা আভা দূরীভূত হয় ৭টা ৪৫ মিনিটে। আর সুবহে সাদিক শুরু হয় ৪টায়। এবার আপনি বের করুন যে সূর্য অস্ত যাওয়া থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত রাত কয় ঘণ্টা, নিশ্চয় ৯ ঘণ্টা। তাহলে রাতের তিন ভাগের একভাগ তথা এক তৃতিয়াংশ সময় হচ্ছে ১০ টা। অর্ধেক রাত হবে সাড়ে এগারোটা। আর সুবহে সাদিক তো জানাই আছে।
এবার দেখুন মাসআলাটি বুঝতে সহজ হবে। উপরিউক্ত সময় অনুপাতে ইশার নামাজ ৭টা পয়তাল্লিশ মিনিট থেকে নিয়ে রাত ১০টার মাঝে পড়া মুস্তাহাব। আর ১০টা থেকে নিয়ে রাত সাড়ে এগারোটার মাঝে পড়া মাকরূহ হওয়া ছাড়াই জায়েজ। আর রাত সাড়ে এগারোটা থেকে রাত ৪টার মাঝে পড়া মাকরূহের সাথে জায়েজ।
রাসুল কখন ইশা আদায় করতেন?
রাসুল (সা.) ইশার নামাজের সময় নির্ধারণে সর্বদা সাহাবিদের উপস্থিতির ওপর নজর রাখতেন। তিনি কখনো ইশা জলদি পড়তেন, আবার কখনো বিলম্ব করতেন।
জাবির (রা.) এ প্রসঙ্গে একটি চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন, আল্লাহর রাসুল কখনো ইশার নামাজ জলদি পড়তেন, আবার কখনো বিলম্ব করতেন। যখন তিনি দেখতেন যে সাহাবিগণ দ্রুত সমবেত হয়েছেন, তখন তিনি জলদি নামাজ আদায় করতেন। আর যখন দেখতেন তারা আসতে দেরি করছেন, তখন তিনি নামাজ বিলম্ব করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬০)
সুতরাং, যদি কোনো সমাজ বা মহল্লার মানুষ মনে করে যে, তারা ইশার নামাজ কিছুটা দেরিতে পড়লে সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে জামাতে শরিক হতে পারবে, তবে দেরি করা উত্তম। আর যদি জলদি পড়লে মানুষের উপস্থিতি বেশি হয়, তবে সেটিই সেই পরিস্থিতির জন্য শ্রেষ্ঠ।
What's Your Reaction?