মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়া ঘাটে পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের ব্যাপক ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। পার্শ্ববর্তী জেলা, রাজধানী ঢাকা ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে ভ্রমণে আসছেন অনেক পর্যটক।
ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছেন। পদ্মা নদীর অপরূপ দৃশ্য ও পদ্মা সেতু একনজর দেখার জন্য পর্যটকদের আগ্রহের কোনো কমতি ছিল না।
ঢাকার মিরপুর থেকে আসা পর্যটক নাজমুল জাহিদ হাসান বলেন, সারা বছর ঢাকায় সিসাযুক্ত বাতাসে থেকে হাঁপিয়ে উঠেছি। সময় করতে পারিনা। তাই ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছি। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে শিমুলিয়া ঘাটে এসে খুব ভালো লাগছে। পদ্মা নদী ও পদ্মা সেতু কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।
ঈদকে ঘিরে ঘাট এলাকার হোটেল রেস্টুরেন্টগুলোতে বেড়েছে বেচাকেনা। অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকার বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মালিকরা।
চাপ সামলাও রেস্টুরেন্ট মালিক বলেন, ঈদের সময় ব্যবসা বেশ ভালো হচ্ছে। আমরা পর্যটকদের ভালো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
এছাড়া ঘাট এলাকায় গড়ে ওঠা ছোট ছোট দোকান, কাবাব ঘর ও শিশুদের খেলনার দোকানেও বিক্রি বেড়েছে কয়েকগুণ।
এদিকে, পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। ট্রলার ঘাটের ইজারাদার মোতালেব খান বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা নদী ভ্রমণে আসছেন। আমরা ট্রলার চালকদের নির্দেশনা দিয়েছি, তারা যেন সুরক্ষা বিধি মেনে চলেন এবং কোনো ঝুঁকি না নেন। ঈদের ছুটিতে শিমুলিয়া ঘাটে এমন প্রাণচাঞ্চল্য এলাকাটিকে উৎসবমুখর করে তুলেছে।
অপরদিকে, জৌলুস হারালেও দর্শনার্থীদের কাছে কদর কমেনি মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের শিমুলিয়া ঘাটের। প্রতিদিন পর্যটকদের কমবেশি আনাগোনা লেগেই আছে। বিশেষ করে বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার সন্ধ্যা হলেই এখানে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়ে যায়। শুধু দেশি পর্যটক নয়, এখানে বিদেশি পর্যটকদের দেখা পাওয়া যায়। পদ্মা পারের নির্মল বাতাস, ইলিশের জন্য বিখ্যাত ঘাটের রেস্টুরেন্ট পাড়া আর সেই সাথে পদ্মা পারে গড়ে উঠা দেশীয় পিঠা-পুলি, পানিপুরি, তান্দুরী চা, নাগরদোলাসহ নানা কিছু উপভোগ করতে পর্যটকরা এখন ছুটে আসছে শিমুলিয়া ঘাটে। ঘাটের এই ভ্রমটিকে স্মরণ করে রাখতে অনেকেই স্বজনদের সঙ্গে সেলফি তুলছেন।
পর্যটকদের আগমনে সরগরম হয়ে উঠেছে শিমুলিয়া ঘাট। পদ্মা সেতু চালুর পর পদচারণা ও কোলাহলযুক্ত এ ঘাটটি তার জৌলুস হারিয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার গাড়ি পারাপার, ফেরি ও লঞ্চ চলাচল, পুলিশ ও প্রশাসনের ব্যস্ততাসহ সব কিছুই যেন এখন স্মৃতি হয়ে আছে।
জৌলুস হারিয়ে ঘাটে পরিণত হয়েছে কোলাহল মুক্ত একটি জনপদ। জৌলুস হারালেও দর্শনার্থীদের কাছে এর কদর কমেনি। দিনের বেলায় এখানে দর্শনার্থীদের তেমন পদচারণা না থাকলেও সন্ধ্যার পর দর্শনার্থীদের আনাগোনা বেড়ে যায়।
এসব দর্শণাথী বা পর্যটকদের আনাগোনাকে কেন্দ্র করে শিমুলিয়া ৩ নং ফেরি ঘাটের কাছে গড়ে উঠেছে দেশীয় লোকজ মেলা। সেখানে বিক্রি হয় গরম গরম ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, আস্ত আলুর গরম তেলে ভাজা চিপস, মৌড়কা পিঠা, ভারতীয় আদলে পানি পুরি, তান্দুরী চা, কচি ডাব, শিশুদের খেলাধুলার নানা খেলনা, দেশীয় গরুর দুধের চা, সেই সাথে প্রায় শত প্রকার মসলা দিয়ে পান। আর রাতের ডিনারের জন্য রেস্টুরেন্ট পাড়ায় ইলিশের ভাজা খেতে ভিড় জমান এসকল দর্শনার্থীরা।
দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিমুলিয়া ঘাট বা মাওয়ার রেস্টুরেন্টের ইলিশ ভাজার কথা ইতোমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে দেশ ও দেশের বাইরে। সেই সঙ্গে ঘাটে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যায় পদ্মার নির্মল বাতাস, স্বচ্ছ পানি আর পদ্মা সেতু। ঢাকার সিসাযুক্ত বাতাস হতে একটু মুক্তি পেতেই পর্যটকরা ছুটে আসেন এই শিমুলিয়া ঘাটে।
কেউ আসেন পরিবার পরিজন নিয়ে, কেউবা আসেন প্রেমিক প্রেমিকা নিয়ে আবার আনেকেই আসেন বন্ধু বান্ধব মিলে। এরা ঘাটের কাছে পদ্মা পারে দাঁড়িয়ে পদ্মার নির্মল বাতাস শরীরে লাগিয়ে নেন। হাফ ছেড়ে উপভোগ করেন এক অন্যপদ স্বাদ।
নারায়নগঞ্জের চাষাঢ়ার বাসিন্দা আসাদুজ্জামান খান বলেন, এখানে তার স্বজনদের নিয়ে বেড়াতে এসেছেন। কাজের চাপে অনেক দিন স্বজনদের নিয়ে একসাথে চলা হয় না। তাই সবাইকে নিয়ে চলে এসেছি শিমুলিয়ার এই পদ্মা পারে। এখানে এসে বেশ ভালো লাগছে। দেশীয় পিঠা-পুলি খাওয়া হল, তান্দুরী চা ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করেছে খাবারের স্বাদ। রাতে রেস্টুরেন্টে ইলিশ ভাজা খেয়ে বাড়ি ফিরবো।
পানিপুরির দোকানি আরাফাত হোসেন জানান, বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার এখানে পর্যটকদের ভিড় বেশী থাকে। এ তিন দিন তার বেচাকেনা বেশ ভালো যায়। ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বিক্রি হয় ওই তিন রাতে। আর এখন ঈদের ছুটিতে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়ে বেচা-কেনা বেশ ভালো হচ্ছে।
তান্দুরী চায়ের দোকানদার বলেন, তার কাছে ৩০ থেকে ৯৫ টাকা দামের তান্দুরী চা রয়েছে। মাটির কাছে চায়ে পুড়িয়ে এই চা খেতে পর্যটকরা ভিড় করে।
পান দোকানদার আলতু মিয়া বলেন, ১০ থেকে ৫ শ টাকা পর্যন্ত পান রয়েছে তার কাছে। প্রায় শত পদের মশলা দিয়ে তৈরী করা হয় এসব পান। শৌখিন লোকজন শখ করেই এই পান খান। নিয়মিত পান খাওয়ার লোকজন এখানে তেমন একটা আসেনা। পর্যটকরাই এ পানের মূল ক্রেতা।
লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ববি মিতু জানান, ঘাটে এখন ফেরি পারাপার না থাকলেও পর্যটকদের আনাগোনা রয়েছে। রেস্টুরেন্টসহ ঘাটে পর্যটন কেন্দ্রিক বেশ কিছু দোকানপাট গড়ে উঠেছে। উন্মুক্ত রাখা হয়েছে পদ্মা পার। পর্যটকদের নিরাপত্তায় পর্যটন পুলিশ, থানা পুলিশ, সাদা পোশাকের পুলিশসহ প্রশাসন কাজ করছে।