কারওয়ান বাজারের শ্রমিকরা বিনোদন খোঁজেন ক্যারামের বোর্ডে

ঢাকার কারওয়ান বাজারের রাত অন্যরকম। শহরের অধিকাংশ মানুষ যখন দিনের কাজ শেষে ঘুমের প্রস্তুতি নেয়, তখন কারওয়ান বাজার জেগে ওঠে নতুন ব্যস্ততায়। ট্রাকের পর ট্রাক ঢোকে সবজি, মাছ, ফল আর নানা কাঁচাপণ্য নিয়ে। মানুষের হাঁকডাক, মালামাল ওঠানামার শব্দ, দর-কষাকষি আর ছুটে চলার আওয়াজে জমে ওঠে পুরো এলাকা। প্রতিরাতে হাজার হাজার ব্যবসায়ী, আড়তকর্মী, পরিবহন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কিংবা শ্রমিকদের আনাগোনায় মুখর হয় বাজার। সারারাত চলে কাজ। কেউ পণ্য নামান, কেউ আড়তে হিসাব করেন, কেউ মাথায় কিংবা কাঁধে বোঝা বহন করেন। এদের অনেকেই কারওয়ান বাজারে থাকেন-খান-ঘুমান। যেন স্থায়ী বসবাসের একটি জীবন। ভোরের আলো ফুটতেই ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে থাকে ব্যস্ততা। ক্লান্ত শরীর তখন বিশ্রাম চায়। কিন্তু মানুষের জীবন কি শুধু কাজ, খাওয়া আর ঘুমের মধ্যে আটকে থাকে? কারওয়ান বাজারের অনেক শ্রমিকের কাছে সেই প্রশ্নের উত্তর একটি ‘কাঠের বোর্ডে’। সেটি ক্যারাম। ঢাকার ব্যস্ততম বাজারের কোলাহলের মাঝখানে কিছু মানুষের নীরব আশ্রয় হয়ে উঠেছে ক্যারাম ঘরের ছোট্ট সেই কাঠের বোর্ড। তাই তো সেখানেই মাঝেমধ্যেই গুটি ছুঁড়ে দিয়ে কিছুটা আনন্দ খুঁজে নেন কারওয়ান বাজারের শ্র

কারওয়ান বাজারের শ্রমিকরা বিনোদন খোঁজেন ক্যারামের বোর্ডে

ঢাকার কারওয়ান বাজারের রাত অন্যরকম। শহরের অধিকাংশ মানুষ যখন দিনের কাজ শেষে ঘুমের প্রস্তুতি নেয়, তখন কারওয়ান বাজার জেগে ওঠে নতুন ব্যস্ততায়। ট্রাকের পর ট্রাক ঢোকে সবজি, মাছ, ফল আর নানা কাঁচাপণ্য নিয়ে। মানুষের হাঁকডাক, মালামাল ওঠানামার শব্দ, দর-কষাকষি আর ছুটে চলার আওয়াজে জমে ওঠে পুরো এলাকা।

প্রতিরাতে হাজার হাজার ব্যবসায়ী, আড়তকর্মী, পরিবহন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কিংবা শ্রমিকদের আনাগোনায় মুখর হয় বাজার। সারারাত চলে কাজ। কেউ পণ্য নামান, কেউ আড়তে হিসাব করেন, কেউ মাথায় কিংবা কাঁধে বোঝা বহন করেন। এদের অনেকেই কারওয়ান বাজারে থাকেন-খান-ঘুমান। যেন স্থায়ী বসবাসের একটি জীবন।

jagonewsভোরের আলো ফুটতেই ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে থাকে ব্যস্ততা। ক্লান্ত শরীর তখন বিশ্রাম চায়। কিন্তু মানুষের জীবন কি শুধু কাজ, খাওয়া আর ঘুমের মধ্যে আটকে থাকে? কারওয়ান বাজারের অনেক শ্রমিকের কাছে সেই প্রশ্নের উত্তর একটি ‘কাঠের বোর্ডে’। সেটি ক্যারাম। ঢাকার ব্যস্ততম বাজারের কোলাহলের মাঝখানে কিছু মানুষের নীরব আশ্রয় হয়ে উঠেছে ক্যারাম ঘরের ছোট্ট সেই কাঠের বোর্ড। তাই তো সেখানেই মাঝেমধ্যেই গুটি ছুঁড়ে দিয়ে কিছুটা আনন্দ খুঁজে নেন কারওয়ান বাজারের শ্রমিকরা।

ক্যারাম ঘর বলতে মূলত এমন একটি স্থান, যেখানে ক্যারাম খেলার বোর্ড, গুটি, স্ট্রাইকার ও বোরিক পাউডার সব প্রস্তুত রাখা হয়। এখানকার ক্যারাম ঘরের আলাদা কোনো জাঁকজমক নেই। নেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ কিংবা চকচকে সাজসজ্জা। সাজসজ্জার খুব দরকারও হয় না। কারণ, বাজারের শ্রমিকদের একটু মানসিক শান্তির প্রয়োজনেই এসব ক্যারাম ঘর ব্যবহৃত। শ্রমিকদের আন্তরিকতা, উল্লাস আর উপভোগ্য ভালোবাসার কাছে সাজসজ্জা কিংবা অতি আধুনিক পরিবেশও যেন হার মেনে যায় প্রতিদিন। শ্রমিকদের উপস্থিতি আর প্রাণবন্ত অংশগ্রহণই জায়গাগুলোকে জীবন্ত করে তোলে। এসব জরাজীর্ণ ঘরের ক্যারাম আজ শ্রমিকদের জীবনযাত্রার অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সংকীর্ণ একটি গলির ভেতরে ছোট্ট, পুরোনো দুই-চারটি ঘর। দেয়ালে সময়ের ক্ষয়ের ছাপ। ওপরে ঝুলছে কয়েকটি সাদা বাতি। সেই আলোয় কাঠের বোর্ডের ওপর ছড়িয়ে আছে বোরিক পাউডার। সাদা, কালো আর রঙিন গুটিগুলো যেন অপেক্ষা করছে নতুন কোনো খেলার। বোর্ডের চারপাশে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন। কেউ খেলছেন, কেউ গভীর মনোযোগে খেলা দেখছেন। কারো চোখ গুটির দিকে, কারো মুখে উত্তেজনা, আবার কারো চোখেমুখে ক্লান্তির ভেতরেও স্বস্তির আভাস। এখানে এসে বোঝা যায়, এটি শুধু খেলার জায়গা নয়; বরং শ্রমজীবী মানুষের ছোট্ট এক সামাজিক জগৎ। এই ক্যারাম ঘরগুলো কেবল অবসরের জায়গা নয়; অনেকের কাছে এটি আড্ডা, পরিচয় আর সম্পর্ক তৈরিরও স্থান।

jagonewsএক বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন হাসিবুর রহমান (৩৫)। বাড়ি কিশোরগঞ্জে। পেশায় একজন আড়তকর্মী। কাজের প্রয়োজনে পরিবার ছেড়ে কারওয়ান বাজারেই থাকেন। আর একটু মানসিক শান্তির আশায় তিনি বারবার ছুটে আসেন এমন ক্যারাম ঘরে। ক্যারাম বোর্ডের দিকে তাকিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘সারারাত কাজ করি। মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষ শুধু কাজের মেশিন হয়ে গেছে। এখানে এসে দুই-একটা গেম খেলি, মানুষের সঙ্গে কথা হয়, হাসি-ঠাট্টা হয়। তখন মনে হয় একটু শান্তি পাই।’

কারওয়ান বাজারে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যাদের জীবন প্রায় পুরোটা সময় বাজারকেন্দ্রিক। গ্রামে পরিবার রেখে মাসের পর মাস শহরে থাকেন তারা। কাজ শেষ করে কেউ চায়ের দোকানে বসেন, কেউ মোবাইলে সময় কাটান, আর অনেকে ছুটে আসেন এই ক্যারাম ঘরগুলোতে। রাতে যে হাত শত কেজির বস্তা তোলে, সকাল হলে সেই হাতই স্ট্রাইকার ছুঁড়ে দেয় গুটির দিকে। যে কেউ এসে খেলতে পারেন। বোর্ড শেষ হওয়ার পর নতুন সিরিয়াল পেতে কিছুক্ষণ অপেক্ষাও করতে হতে পারে। কারণ বোর্ডের চেয়ে খেলোয়াড়ের সংখ্যা প্রায়ই বেশি।

এই ক্যারাম ঘরগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ছোট একটি অর্থনীতিও। ক্যারাম ঘরের মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি বোর্ডে চারজন খেলোয়াড়ের কাছ থেকে মোট ৮০ টাকা নেওয়া হয়। বিজয়ী দুইজন তাদের দেওয়া টাকা ফেরত পেলেও পরাজিত দুইজনের ৪০ টাকা থাকে ঘরের আয়ের অংশ হিসেবে। দিনে কতগুলো খেলা হয়, তা নির্ভর করে ভিড়ের ওপর। ব্যস্ত দিনে একটি বোর্ডে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি খেলা পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে এই আয়ের পুরোটাই লাভ নয়। ঘরের ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, বোরিক পাউডার, বোর্ডের রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন খরচ বাদ দেওয়ার পর যা থাকে, সেটিই মালিকদের প্রকৃত আয়।

একটি বোর্ডে খেলেন চারজন। কিন্তু খেলাটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকেন আরও অন্তত ৮ থেকে ১০ জন দর্শক। কখনো কখনো দর্শকের সংখ্যাই খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। দেখতে দেখতে একটি সাধারণ খেলা যেন ছোট্ট এক জনসমাগমে রূপ নেয়। এভাবে প্রতিদিন মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। এ এক অন্যরকম উন্মাদনা।

jagonews

গুটি পকেটে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে শোনা যায় উচ্ছ্বাস- ‘হইছে!’, ‘এইটা মিস করলা কেমনে?’, ‘এখন দেখো শট!’।

বোর্ডের ওপর শেষ গুটিটা পকেটে পড়তেই চারপাশে আবারও উল্লাস। কয়েক ঘণ্টা পরই হয়তো এই মানুষগুলো আবার ব্যস্ত হয়ে পড়বেন ট্রাক, বস্তা আর হিসাবের খাতায়। তবে এই মুহূর্তে তাদের পৃথিবী আটকে আছে ছোট্ট একটি কাঠের বোর্ডেই।

কারওয়ান বাজারের এই ক্যারাম সংস্কৃতি ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে, তার নির্দিষ্ট কোনো লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে দীর্ঘদিন ধরে বাজারে কাজ করা শ্রমিক ও ক্যারাম ঘরের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দশক ধরেই বাজারের শ্রমজীবী মানুষের অবসর সময়ের অন্যতম সঙ্গী হয়ে আছে এই খেলা। প্রবীণ শ্রমিকদের ভাষ্য, প্রায় ১০-১৫ বছর আগেও ক্যারাম ঘরগুলোতে বেশ ভিড় থাকত। তখন বিনোদনের মাধ্যমও ছিল সীমিত। সময়ের সঙ্গে মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল বিনোদনের প্রসার ঘটলেও ক্যারামের জনপ্রিয়তা পুরোপুরি কমেনি। এখন এই বাজারকেন্দ্রিক ৪টি ক্যারাম ঘরে প্রায় ২০টি ক্যারাম বোর্ড রয়েছে। শ্রমিকদের কাছে এটি এখনো মুখোমুখি আড্ডা, সম্পর্ক আর সাময়িক মানসিক স্বস্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়ে আছে।

কারওয়ান বাজারের একটি ক্যারাম ঘরের মালিক মশিউর রহমান বলেন, যে জুটি জিতেন, তারা কেবল বিনা পয়সায় স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগের সুযোগটা পান। আর যে দুজন হেরে যান, তাদের দেওয়া চল্লিশ টাকা মালিক হিসেবে আমরা পেয়ে থাকি। এই চল্লিশ টাকা দিয়ে ঘরের খরচ, বিদ্যুতের খরচ, বোরিকের খরচসহ অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে যা থাকে তা আমাদের আয়।

তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এখানকার ক্যারাম ঘরে কোনো ধরনের জুয়া কিংবা বাজি খেলার ব্যবস্থা নেই। অনেকে ভুল বোঝেন। আসলে এটা বিনোদনের জায়গা। এখানে মানুষ একটু সময় কাটাতে আসেন।

ক্যারাম ঘরগুলোতে বয়সের কোনো সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ে না। যুবক, মধ্যবয়সী, এমনকি বয়স্ক মানুষও এখানে সময় কাটান। দেখা যায়, একদিকে তরুণ খেলোয়াড় শট দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অন্যদিকে সাদা দাড়িওয়ালা প্রবীণ ব্যক্তি মনোযোগ দিয়ে খেলা দেখছেন। প্রজন্মের পার্থক্য যেন এখানে হারিয়ে যায়।

সাদা দাড়িওয়ালা এক বৃদ্ধ উপভোগ করছিলেন ক্যারাম খেলা। কথা বলতে জানা গেল, ইয়াকুব হাওলাদার নামের ওই বৃদ্ধের বয়স ৮০ পেরিয়েছে। এখনো তিনি কারওয়ান বাজারে কাজ করেন। কারওয়ান বাজারে আছেন প্রায় ১৫ বছর হলো। এই ১৫ বছরের অগণিত দিনের সঙ্গী এই ক্যারাম ঘর। অনেক সময় তিনি খেলেন, অনেক সময় খেলা দেখেন। জানালেন, এই ক্যারাম ঘর বাজারের শ্রমিকদের কাছে একটি মানসিক আশ্রয়ের জায়গা। ভালো থাকলেও শ্রমিকরা এখানে আসেন, আবার ভালো না থাকলেও একটু শান্তির জন্য এসব জায়গায় আসতে হয়।

বোর্ডের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন কিশোর বয়সী এক শ্রমিক। আশি পেরোনো ওই প্রবীণ শ্রমিকের থেকে তার বয়স আলাদা, কিন্তু আগ্রহ একই। মাল নামানোর কাজ শেষ করে প্রায় প্রতিদিনই খেলা দেখতে আসেন আলমগীর। তিনি বলেন, ‘খেলি না, কিন্তু খেলা দেখতে ভালো লাগে। হাসি-ঠাট্টা হয়, সময়ও কেটে যায়।’

শ্রমজীবী মানুষের জন্য বিনোদন শুধু আনন্দের বিষয় নয়, এটি মানসিক স্বাস্থ্যেরও একটি প্রয়োজনীয় অংশ। কারণ জীবনের ভার সবসময় কাঁধে বহন করা যায় না। সারাদিন বা সারারাতের কঠোর পরিশ্রমের পর মানুষের কিছুটা অবসর, কিছুটা সামাজিক যোগাযোগ এবং কিছুটা হাসির প্রয়োজন হয়। কারওয়ান বাজারের এই ক্যারাম ঘরগুলো হয়তো সেই কাজটিই করে। রাতভর শ্রমে ক্লান্ত মানুষগুলোর কাছে এই ক্যারাম বোর্ড শুধু একটি খেলার জায়গা নয়; এটি কিছুটা স্বস্তি, কিছুটা সঙ্গ আর কিছুটা মানসিক আশ্রয়ের নাম।

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow