কেন রেকর্ড তাপপ্রবাহে পুড়ছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া?

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে বা তা অতিক্রম করেছে। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কয়েকশ কোটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চলে তীব্র গরম নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয় জরুরি সেবা বিভাগের তথ্যমতে, পাকিস্তানে তাপজনিত জটিলতায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভারতেও তাপপ্রবাহে একাধিক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষা-পূর্ব মৌসুমে তাপপ্রবাহ নতুন কিছু নয়। তবে এবারের তাপপ্রবাহের তীব্রতা, স্থায়িত্ব ও বিস্তার অতীতের তুলনায় অনেক বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের চরম আবহাওয়া আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে বলেও সতর্ক করেছেন তারা। কেন এত তীব্র তাপপ্রবাহ? ভারতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভারতি ইনস্টিটিউট অব পাবলিক পলিসির গবেষণা পরিচালক অঞ্জল প্রকাশের মতে, উচ্চচাপ বলয় গরম বাতাসকে ভূমির কাছাকাছি আটকে রাখছে। এতে বাতাস ওপরে উঠে ঠান্ডা হতে পারছে না। বরং নিচের দিকে নেমে এসে আরও উত্তপ্ত হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া দুর্বল বর্ষা-পূর্ব বৃষ্টি এবং এল নিনো পরিস্থিতিও তাপ

কেন রেকর্ড তাপপ্রবাহে পুড়ছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া?

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে বা তা অতিক্রম করেছে। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কয়েকশ কোটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চলে তীব্র গরম নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

স্থানীয় জরুরি সেবা বিভাগের তথ্যমতে, পাকিস্তানে তাপজনিত জটিলতায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভারতেও তাপপ্রবাহে একাধিক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষা-পূর্ব মৌসুমে তাপপ্রবাহ নতুন কিছু নয়। তবে এবারের তাপপ্রবাহের তীব্রতা, স্থায়িত্ব ও বিস্তার অতীতের তুলনায় অনেক বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের চরম আবহাওয়া আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে বলেও সতর্ক করেছেন তারা।

কেন এত তীব্র তাপপ্রবাহ?

ভারতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভারতি ইনস্টিটিউট অব পাবলিক পলিসির গবেষণা পরিচালক অঞ্জল প্রকাশের মতে, উচ্চচাপ বলয় গরম বাতাসকে ভূমির কাছাকাছি আটকে রাখছে। এতে বাতাস ওপরে উঠে ঠান্ডা হতে পারছে না। বরং নিচের দিকে নেমে এসে আরও উত্তপ্ত হয়ে পড়ছে।

এ ছাড়া দুর্বল বর্ষা-পূর্ব বৃষ্টি এবং এল নিনো পরিস্থিতিও তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, চলতি বছরের মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি এল নিনো সৃষ্টি না করলেও এর প্রভাবকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো
 

ভারত

ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি) সতর্ক করে জানিয়েছে, দেশটির অধিকাংশ অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকতে পারে। পশ্চিমাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে তীব্র তাপপ্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে।

উত্তর-পশ্চিম ও মধ্য ভারতের কয়েকটি অঞ্চলে তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। মহারাষ্ট্রের আকোলা ও অমরাবতীতে প্রায় ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে হিটস্ট্রোকে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে।

পাকিস্তান

প্রতিবেশী পাকিস্তানেও তাপপ্রবাহ ভয়াবহ আকার নিয়েছে। করাচিতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, যা ২০১৮ সালের পর সর্বোচ্চ।

পাকিস্তানের আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, সিন্ধু অঞ্চলে তাপপ্রবাহ আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। নাগরিকদের দিনের বেলায় সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা এবং পর্যাপ্ত পানি পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ

বাংলাদেশেও গত কয়েক বছরে তাপপ্রবাহের তীব্রতা বেড়েছে। রাজধানী ঢাকা, ফরিদপুর, রাজশাহী ও পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৩৭ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের এপ্রিলে দেশে ২৪ দিন তাপপ্রবাহ ছিল, যা গত ৭৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। কয়েকটি জেলায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসও অতিক্রম করে।

কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মিত্তল সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের গবেষক কার্তিকা ভাটোটিয়ার মতে, নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

তার ভাষ্য, দীর্ঘ সময় গরমের মধ্যে কাজ করার কারণে শ্রমিকদের আয় কমে যায়। এতে পুষ্টি, চিকিৎসা ও ওষুধপ্রাপ্তির ওপরও প্রভাব পড়ে।

তিনি বলেন, অতিরিক্ত তাপ শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে দেয়। এতে হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ডায়াবেটিস এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে। প্রবীণ, শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

সরকারগুলোর প্রস্তুতি কতটা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতসহ কয়েকটি দেশে হিট অ্যাকশন প্ল্যান চালু থাকলেও তা মূলত শহরকেন্দ্রিক এবং আনুষ্ঠানিক খাতের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

কার্তিকা ভাটোটিয়ার মতে, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক ও দিনমজুরদের জন্য কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। তিনি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শ্রম সুরক্ষা, নগর পরিকল্পনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে সমন্বিত করার আহ্বান জানান।

পাকিস্তানের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ফাহাদ সাঈদ বলেন, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য গোপন করলে কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়। তাপপ্রবাহকে দুর্যোগ হিসেবে স্বীকার করে সঠিক তথ্য প্রকাশের ওপর জোর দেন তিনি।

ভবিষ্যতে কি তাপপ্রবাহ আরও বাড়বে?

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় তাপপ্রবাহের সংখ্যা ও তীব্রতা আরও বাড়বে।

তবে তাদের মতে, আগাম সতর্কতা, উন্নত নগর পরিকল্পনা, তাপসহনশীল অবকাঠামো এবং কার্যকর অভিযোজন ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

তথ্যসূত্র : আলজাজিরা

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow