কে এই মোহসেন রেজায়ি? কেন তাকে নিরাপত্তাপ্রধান করলো ইরান?
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাইকে দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইরানের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এই কাউন্সিলের বড় ভূমিকা রয়েছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওয়াশিংটন-তেহরানের আলোচনার মধ্যেই কাউন্সিলের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ৭১ বছর বয়সী রেজাই। কয়েক মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান। রেজাই তার নতুন দায়িত্বে মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদরকে প্রতিস্থাপন করেছেন। অন্যদিকে, জোলঘাদরকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে এই পদে ছিলেন আলী লারিজানি, যিনি চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন। কে এই মোহসেন রেজাই? মোহসেন রেজাই ১৯৮১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত আইআরজিসির প্রধান ছিলেন। তার নেতৃত্বের সময়ের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধ। ইরানে এই যুদ্ধ ‘স্যাক্রেড ডিফেন্স’ বা ‘পবিত্র প্রতিরক্
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাইকে দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইরানের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এই কাউন্সিলের বড় ভূমিকা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওয়াশিংটন-তেহরানের আলোচনার মধ্যেই কাউন্সিলের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ৭১ বছর বয়সী রেজাই। কয়েক মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান।
রেজাই তার নতুন দায়িত্বে মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদরকে প্রতিস্থাপন করেছেন। অন্যদিকে, জোলঘাদরকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে এই পদে ছিলেন আলী লারিজানি, যিনি চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন।
কে এই মোহসেন রেজাই?
মোহসেন রেজাই ১৯৮১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত আইআরজিসির প্রধান ছিলেন। তার নেতৃত্বের সময়ের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধ। ইরানে এই যুদ্ধ ‘স্যাক্রেড ডিফেন্স’ বা ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা’ নামে পরিচিত।
আইআরজিসির প্রধানের দায়িত্ব ছাড়ার পর রেজাই ইরানের এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য হন। আইন প্রণয়ন নিয়ে পার্লামেন্ট ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে তা মীমাংসার দায়িত্ব এই কাউন্সিলের।
গার্ডিয়ান কাউন্সিল ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নিয়োগ দেওয়া একটি পৃথক সংস্থা। পার্লামেন্ট, প্রেসিডেন্ট ও অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের নির্বাচনে প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই করে এই কাউন্সিল। একই সঙ্গে কোনো আইন সংবিধান ও ইসলামি আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও পর্যালোচনা করে তারা।
হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে রেজাই দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। জুলাইয়ে রেজাই বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ‘কয়েক ডজন পারমাণবিক বোমার’ চেয়েও বেশি মূল্যবান।
গত সপ্তাহে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত থাকলে ওয়াশিংটনকে ‘গুরুতর ঝুঁকি ও হতাহতের’ মুখে পড়তে হবে।
ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করেছে। অন্যদিকে, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রও তেহরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে।
কেন রেজাইকে এই পদে আনা হলো?
ইরানের প্রেসিডেন্টের যোগাযোগ কার্যালয় রোববার (৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় ঘোষণা করে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রেজাইকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। আল-জাজিরা আরবি এই খবর জানায়।
একই দিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি একটি ডিক্রি জারি করে রেজাইকে কাউন্সিলে তার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন। ওই ডিক্রিতে রেজাইয়ের অভিজ্ঞতা ও ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ‘স্যাক্রেড ডিফেন্স’ যুগের অন্যতম অগ্রপথিক হিসেবে তার ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
এতে তার সামরিক পটভূমিকেই নিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কৌশলগত বিবেচনা এক জায়গায় এসে মিলিত হয়।
ফলে কাউন্সিলের সচিব কে হচ্ছেন, সেটি শুধু প্রশাসনিক দায়িত্বের বিষয় নয়। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের খোলামেলা যুদ্ধ, ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভেঙে পড়তে থাকা আলোচনা ও হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিরোধের সময় এই পদে পরিবর্তনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি।
তেহরানভিত্তিক সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক আব্বাস আসলানি আল-জাজিরাকে বলেন, রেজাই তার সঙ্গে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক- তিন ধরনের অভিজ্ঞতাই নিয়ে আসবেন। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করতে পারে- এমন একজনকেই ইরানের প্রয়োজন ছিল।
তিনি বলেন, নিরাপত্তার প্রশ্নে রাজনৈতিকভাবে রেজাই তার পূর্বসূরির চেয়ে খুব বেশি আলাদা নন। তবে দেশের অভ্যন্তরে তার ভূমিকা ও বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আসলানি আরও বলেন, সাবেক আইআরজিসি প্রধান ও এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে রেজাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের আলোচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
তার মতে, বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ ও তাদের সঙ্গে কথা বলার সক্ষমতা রেজাইয়ের নিয়োগের অন্যতম কারণ।
পেজেশকিয়ান ও রক্ষণশীলদের মধ্যে সেতুবন্ধনের সুযোগ?
রেজাইয়ের নিয়োগের আরেকটি রাজনৈতিক দিক রয়েছে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় তিনি মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে সমর্থন করেছিলেন। এর ফলে নির্বাচনী রাজনীতিতে তিনি গালিবাফের প্রতিনিধিত্ব করা রক্ষণশীল শিবিরের কাছাকাছি ছিলেন।
গালিবাফ বর্তমানে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় প্রধান আলোচকদের একজন। অন্যদিকে, সাঈদ জলিলির নেতৃত্বাধীন আরও কট্টরপন্থি অংশের সঙ্গে তার অবস্থান পুরোপুরি এক নয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনে পেজেশকিয়ানের কাছে হেরে যাওয়ার আগে জলিলি দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন।
তবে গালিবাফকে সমর্থন করার অর্থ এই নয় যে রেজাই একজন মধ্যপন্থি নেতা। একইভাবে একটি নির্বাচনে তার অবস্থান দিয়েও তার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক জোট বা আনুগত্য নির্ধারণ করা যায় না। তবে এতে বোঝা যায়, রক্ষণশীল শিবিরে তার অবস্থান জলিলি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সবচেয়ে কট্টর বিরোধিতাকারী শক্তিগুলোর সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
এই অবস্থান রেজাইকে একাধিক রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে কাজ করার সুযোগ দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে আলোচনার বিষয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি আগ্রহী পেজেশকিয়ানের সরকার, গালিবাফের সঙ্গে যুক্ত রক্ষণশীল শিবির এবং সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনী- যাদের সঙ্গে আইআরজিসির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই রেজাইয়ের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে।
তার নিয়োগের প্রভাব কী হতে পারে?
বিশ্লেষকেরা রেজাইয়ের নিয়োগকে মূলত দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। প্রথম ব্যাখ্যা হলো, যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার সময়ে ইরান সামরিক ও নিরাপত্তা বিবেচনাকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা কিছুটা ভিন্ন। সাবেক আইআরজিসি প্রধানকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসার মাধ্যমে উল্টো কঠিন কোনো সমঝোতা হলে সেটি দেশের কট্টরপন্থি জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সহজ হতে পারে।
ইরানি সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসআল্লাহ শামসোলভায়েজিন বলেন, রেজাইকে বেছে নেওয়ার ঘটনায় ইরানের একটি অংশের মানুষ বিস্মিত হয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা ছিল, যুদ্ধের সময় সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে নতুন মুখ আনা হবে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতে পরিবর্তনের যে দাবি রয়েছে, তা পূরণ করা হবে।
শামসোলভায়েজিনের মতে, কট্টরপন্থি শক্তিগুলোর কাছে রেজাইয়ের সামরিক রেকর্ড, বিশেষ করে আইআরজিসির সাবেক প্রধান হিসেবে তার ভূমিকা, কাউন্সিলের সিদ্ধান্তকে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভিত্তি দিতে পারে।
কারণ ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামনে শুধু কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্নই নেই। সেই সিদ্ধান্ত দেশের ক্ষমতাকেন্দ্রগুলো ও কট্টরপন্থি রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন পাওয়া কতটা সম্ভব, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ধারাবাহিকতায় ইরানে এমন স্লোগানও শোনা গেছে, যাতে আলোচনা বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। আলোচনার সমর্থকদের দুর্বল বলে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ফলে কোনো সমঝোতা হলে সেটি রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টির শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকতে পারে, বিশেষ করে যদি সেই সমঝোতা মধ্যপন্থি হিসেবে পরিচিত কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে আসে।
শামসোলভায়েজিনের মতে, কাউন্সিলের সচিবালয়ে রেজাইয়ের আগমন এই বিতর্ক কিছুটা কমাতে পারে। কারণ তার সামরিক ইতিহাস কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কট্টরপন্থি পক্ষগুলোর আপত্তি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি শক্তি দিতে পারে।
তিনি বলেন, কাউন্সিলের শীর্ষে রেজাইয়ের উপস্থিতি কট্টরপন্থি শক্তির একটি বড় অংশকে শান্ত করতে পারে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে। কারণ একজন সাবেক আইআরজিসি কমান্ডারকে দুর্বলতা দেখানো বা ইরানের নিরাপত্তা স্বার্থ বিসর্জন দেওয়ার অভিযোগ করা তাদের জন্য কঠিন হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় কী প্রভাব পড়বে?
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রেজাইয়ের নিয়োগকে দুটি আপাতবিরোধী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। প্রথমটি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ার জবাবে ইরানের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো, কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এটি আলোচনার একটি প্রস্তুতিপর্ব হতে পারে। আল জাজিরা আরবি এ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে।
প্রথম ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তেহরান বোঝাতে চাইছে যে নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ ও সামরিক চাপ বাড়ানো হলে তার জবাবও কঠোর হবে। আগের সমঝোতাগুলোর চেয়ে বেশি দাবি জানানো হলে ইরান এমন ব্যক্তিদের সামনে আনবে, যারা সংঘাত পরিচালনায় আরও কঠোর অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করেন।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি হলো, বড় ধরনের সমঝোতা সব সময় মধ্যপন্থি ব্যক্তিদের মাধ্যমে হয় না। অনেক সময় তা বাস্তবায়নের জন্য ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কোনো ব্যক্তির প্রয়োজন হতে পারে।
সামরিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থানের জন্য পরিচিত কোনো ব্যক্তি যদি আলোচনার পথ বেছে নেন, তাহলে দেশের ভেতরে সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নেওয়া তার জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে তাকে ছাড় দেওয়ার অভিযোগের মুখেও কম পড়তে হতে পারে।
শামসোলভায়েজিন মনে করেন, রেজাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখতে পারেন। কারণ তার সামরিক ইতিহাস তাকে দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক সুরক্ষা দিতে পারে ও ভবিষ্যতে কোনো সমঝোতা হলে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় নিশ্চয়তা হিসেবে কাজ করতে পারে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটি রেজাই কট্টরপন্থি নাকি মধ্যপন্থি- সেটি নয়। বরং তার সামরিক ও রাজনৈতিক পরিচিতি যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, সেটিকে বাস্তব নীতিতে পরিণত করার ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হতে পারে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
‘নিরাপত্তা নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত’
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক মোহসেন ফারখানি রেজাইয়ের নিয়োগকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য দেশের ভেতরে রাজনৈতিক সুরক্ষা তৈরির চেষ্টা নয়; বরং ইরানের নিরাপত্তা নীতিতে পরিবর্তনের প্রতিফলনও হতে পারে।
আরবিকে ফারখানি বলেন, জুনের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) যুক্তরাষ্ট্র বারবার লঙ্ঘন করেছে- তেহরানের এমন অভিযোগ এবং কূটনীতির মাধ্যমে উত্তেজনা ও যুদ্ধ ঠেকাতে ব্যর্থতার পর রেজাইকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ইরান অভিযোগ করে আসছে, ওয়াশিংটন ওই সমঝোতা স্মারকের শর্ত লঙ্ঘন করেছে।
ফারখানির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আইআরজিসির নেতৃত্ব দেওয়া ও আট বছরের যুদ্ধে বাহিনী সংগঠিত করার অভিজ্ঞতা ইরানের নিরাপত্তা নীতির নতুন একটি ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেটি হলো ‘শাস্তির মাধ্যমে আক্রমণাত্মক প্রতিরোধ’ এর অর্থ হলো গুরুতর সামরিক সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতার ওপর জোর দেওয়া।
ফারখানি মনে করেন, এই নিয়োগের মাধ্যমে ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রচলিত যুদ্ধের কৌশলগুলোকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে, শত্রু রাষ্ট্রগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক ক্ষতি চাপিয়ে দিতে অসমমিত যুদ্ধের পদ্ধতির ওপরও নির্ভরতা অব্যাহত থাকবে।
এই ব্যাখ্যা থেকে ফারখানি ধারণা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনায় কিংবা হরমুজ প্রণালির সার্বভৌমত্বের মতো ইস্যুতে তেহরান তুলনামূলকভাবে কম নমনীয় অবস্থান নিতে পারে।
তবে তার মতে, শুধু রেজাইয়ের নিয়োগের কারণে ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো পুরোপুরি বদলে যাবে না। কারণ প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইআরজিসি নেতৃত্বের নিজস্ব আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা রয়েছে। সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলও নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের কাজ করে এবং শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ নেতার তত্ত্বাবধান ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অধীনেই কাজ করে।
তবে ফারখানির মতে, রেজাইয়ের নিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সামরিক ও নিরাপত্তা বিবেচনাকে বাড়তি গুরুত্ব দেবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিকল্প নিয়ে ভাবার সময় প্রতিরোধ এবং যুদ্ধসংক্রান্ত মূল্যায়নও আরও বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।
সব মিলিয়ে, রেজাইয়ের নিয়োগকে ইরানের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফারখানি মনে করেন, এতে সামরিক ও নিরাপত্তা বিবেচনার অগ্রাধিকার এবং ইরানের কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেছে। অন্যদিকে, শামসোলভায়েজিনের বিশ্লেষণ হলো- সাবেক আইআরজিসি প্রধানের কট্টর সামরিক পটভূমিই ভবিষ্যতে কোনো সম্ভাব্য সমঝোতার জন্য ইরানের অভ্যন্তরে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সুরক্ষা তৈরিতে কাজে লাগতে পারে।
এসএএইচ
What's Your Reaction?