কোটি মানুষের জেলায় নেই ট্রমা সেন্টার, দুর্ঘটনার পরই শুরু মৃত্যুর দৌড়
ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট—দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত দুটি মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নারায়ণগঞ্জ। শিল্পকারখানা, নদীবন্দর, রপ্তানিমুখী ব্যবসা এবং বিপুল কর্মসংস্থানের কারণে প্রতিদিন লাখো মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে এ জেলা। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জনসংখ্যা ৪০ লাখের বেশি হলেও ভাসমান শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও যাত্রী মিলিয়ে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রতিদিন প্রায় এক কোটি মানুষের চাপ থাকে জেলাটিতে। কিন্তু এত বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য নেই একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রমা সেন্টার। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা বা গুরুতর আঘাতের শিকার রোগীদের জরুরি বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য ছুটতে হয় ঢাকার হাসপাতালে। আর সেই যাত্রাপথেই অনেকের জীবন থেমে যায়। কেন জরুরি ট্রমা সেন্টার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা স্বর্ণসময় বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অসংখ্য প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। অথচ নারায়ণগঞ্জে সেই সুযোগ নেই। আরও পড়ুন ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশ যেন মরণফাঁদ চিকিৎসকদের মতে, ট্রমা সেন্টার শুধু অস্ত্রোপচারের জায়গা নয়; এটি দুর্ঘটনায় আহত রোগীর জীবন রক্ষার প্রথম
ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট—দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত দুটি মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নারায়ণগঞ্জ। শিল্পকারখানা, নদীবন্দর, রপ্তানিমুখী ব্যবসা এবং বিপুল কর্মসংস্থানের কারণে প্রতিদিন লাখো মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে এ জেলা। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জনসংখ্যা ৪০ লাখের বেশি হলেও ভাসমান শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও যাত্রী মিলিয়ে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রতিদিন প্রায় এক কোটি মানুষের চাপ থাকে জেলাটিতে।
কিন্তু এত বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য নেই একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রমা সেন্টার। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা বা গুরুতর আঘাতের শিকার রোগীদের জরুরি বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য ছুটতে হয় ঢাকার হাসপাতালে। আর সেই যাত্রাপথেই অনেকের জীবন থেমে যায়।
কেন জরুরি ট্রমা সেন্টার
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা স্বর্ণসময় বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অসংখ্য প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। অথচ নারায়ণগঞ্জে সেই সুযোগ নেই।
চিকিৎসকদের মতে, ট্রমা সেন্টার শুধু অস্ত্রোপচারের জায়গা নয়; এটি দুর্ঘটনায় আহত রোগীর জীবন রক্ষার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র। এখানে ২৪ ঘণ্টা সার্জন, অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ, অ্যানেসথেসিয়া, আইসিইউ, জরুরি রক্ত সরবরাহ ও আধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা থাকে। দুর্ঘটনার পর দ্রুত এসব সেবা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুহার ও স্থায়ী পঙ্গুত্ব—দুই-ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
জনসংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি চিকিৎসা অবকাঠামো
নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৩৯ লাখ ৯ হাজার ১৩৮ জন। বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৪২ লাখ ছাড়িয়েছে। তবে শিল্পাঞ্চল হওয়ায় প্রতিদিন আরও কয়েক লাখ ভাসমান মানুষের চাপ পড়ে জেলার স্বাস্থ্যসেবায়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে ৩৭৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৪০ জন নিহত এবং ১৪০ জন আহত হয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
তবে নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুর ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালটি জেলার সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল হলেও এখানে নেই পূর্ণাঙ্গ ট্রমা কেয়ার ইউনিট বা বিশেষায়িত ট্রমা সেন্টার। সড়ক দুর্ঘটনা বা গুরুতর আহত রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলেও জটিল অস্ত্রোপচার কিংবা বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত। একজন ডাক্তার আছেন যিনি সপ্তাহে একদিন অপারেশন করে থাকেন। ফলে আশঙ্কাজনক অবস্থার রোগীদের দ্রুত ঢাকার বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠাতে হয়। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আবুল বাসার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন, যিনি ট্রমা-সংক্রান্ত অস্ত্রোপচার করেন। তবে তিনি সপ্তাহে মাত্র একদিন অপারেশন করতে পারেন। নারায়ণগঞ্জের মতো জনবহুল জেলায় এটি কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয়। প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত রোগী আসে। একজন চিকিৎসকের পক্ষে সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যতটুকু সম্ভব চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রমা সেন্টার হলে ২৪ ঘণ্টা বিশেষায়িত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো এবং অনেক রোগীর জীবন ও অঙ্গহানি রোধ করা যেত।’
নিরাপদ সড়ক আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি রাকিবুল ইসলাম হিমেল বলেন, নারায়ণগঞ্জের জন্য খুবই জরুরি ট্রমা সেন্টার স্থাপন করা। এখানে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু ভুক্তভোগীরা পরিপূর্ণ চিকিৎসাসেবা পায় না।
যা বলছে প্রশাসন
নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মুহম্মদ মুশিউর রহমান বলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলায় কোনো ট্রমা সেন্টার নেই। নারায়ণগঞ্জ অত্যন্ত জনবহুল একটি এলাকা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখানে ৪০ লাখ লোকের বসবাস; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আরও ৪০ লাখ লোক ভাসমান হিসেবে নিয়মিত যাতায়াত করে থাকে। যার কারণে এখানে পরিবহন দুর্ঘটনার সংখ্যা অনেক বেশি। প্রতিবছরই বেশ কিছু রোগী এখানে মারা যায়। এজন্য নারায়ণগঞ্জে একটি ট্রমা সেন্টার প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ট্রমা সেন্টার যদি দ্রুত করা যায়, তাহলে অনেক মানুষ পক্ষাঘাতগ্রস্ত অথবা পঙ্গুত্বের হাত থেকে বেঁচে যাবে। দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের যদি দ্রুত ট্রমা সেন্টারে বিশেষজ্ঞদের দ্বারা চিকিৎসা না দেওয়া যায় এরা পঙ্গুত্বের শিকার হয়ে যায়। যার কারণে আমি মনে করি, নারায়ণগঞ্জ জেলায় একটি ট্রমা সেন্টার স্থাপন করা জরুরি। আশা করি, কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে নজর দেবেন।
তিনি বলেন, জেলায় মেডিকেল কলেজ স্থাপনে সময় লাগলেও ট্রমা সেন্টার দ্রুত করা গেলে তা মানুষের জন্য বড় উপকার বয়ে আনবে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, নারায়ণগঞ্জে একটি ট্রমা সেন্টার প্রয়োজন। আমরা সাধারণত নানা কারণেই ট্রমাটাইজড থাকি। ট্রমাটাইজড লোকগুলোকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ট্রমা সেন্টার দরকার। আমি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বলে হাসপাতালগুলোতে ট্রমা সার্ভিস এবং নতুন করে ট্রমা সেন্টার করা যায় কিনা যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবো।
What's Your Reaction?


