খাদ্য সহায়তা কমাচ্ছে ডাব্লিউএফপি, ভাগ হচ্ছে রোহিঙ্গা পরিবার

আগামী ১ এপ্রিল থেকে কক্সবাজার ও ভাসানচরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য সমান মাসিক খাদ্য সহায়তা বন্ধ করতে যাচ্ছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডাব্লিউএফপি)। নতুন ব্যবস্থায় পরিবারগুলোকে তিনটি স্তরে ভাগ করে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। ডাব্লিউএফপি এ পরিবর্তনকে ‘টার্গেটিং ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ অনুশীলন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের যুক্তি, যারা বেশি খাদ্য নিরাপত্তাহীন তারা বেশি সহায়তা পাবে, যাতে সবার জন্য ন্যূনতম খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। পরিবারগুলোকে চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীন, অত্যন্ত খাদ্য নিরাপত্তাহীন ও খাদ্য নিরাপত্তাহীন হিসেবে ভাগ করা হবে। চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীন পরিবার চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীন পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি খাদ্য সংকটে ভুগছে। এ ধরনের পরিবারগুলোতে শিশুর সংখ্যা বেশি, পরিবারপ্রধান প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা এমন নারী-প্রধান পরিবার যেখানে ১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়সী কর্মক্ষম কোনো পুরুষ নেই। কক্সবাজারের একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প একইভাবে এমন প্রবীণ-পরিবার প্রধান যেখানে কর্মক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নেই। এছাড়া যেসব পরিবারে দুই বা ততধিক প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছে বা এক সদস্যের পরিবার—তারাও এই শ

খাদ্য সহায়তা কমাচ্ছে ডাব্লিউএফপি, ভাগ হচ্ছে রোহিঙ্গা পরিবার

আগামী ১ এপ্রিল থেকে কক্সবাজার ও ভাসানচরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য সমান মাসিক খাদ্য সহায়তা বন্ধ করতে যাচ্ছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডাব্লিউএফপি)। নতুন ব্যবস্থায় পরিবারগুলোকে তিনটি স্তরে ভাগ করে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

ডাব্লিউএফপি এ পরিবর্তনকে ‘টার্গেটিং ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ অনুশীলন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের যুক্তি, যারা বেশি খাদ্য নিরাপত্তাহীন তারা বেশি সহায়তা পাবে, যাতে সবার জন্য ন্যূনতম খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। পরিবারগুলোকে চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীন, অত্যন্ত খাদ্য নিরাপত্তাহীন ও খাদ্য নিরাপত্তাহীন হিসেবে ভাগ করা হবে।

চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীন পরিবার

চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীন পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি খাদ্য সংকটে ভুগছে। এ ধরনের পরিবারগুলোতে শিশুর সংখ্যা বেশি, পরিবারপ্রধান প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা এমন নারী-প্রধান পরিবার যেখানে ১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়সী কর্মক্ষম কোনো পুরুষ নেই।

রোহিঙ্গা

কক্সবাজারের একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প

একইভাবে এমন প্রবীণ-পরিবার প্রধান যেখানে কর্মক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নেই। এছাড়া যেসব পরিবারে দুই বা ততধিক প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছে বা এক সদস্যের পরিবার—তারাও এই শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত। তাদের প্রতিটি সদস্যকে মাসিক ১২ ডলার মূল্যের খাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হবে।

অত্যন্ত খাদ্য নিরাপত্তাহীন পরিবার

‘অত্যন্ত খাদ্য নিরাপত্তাহীন’ পরিবারগুলোও খাদ্য নিরাপত্তাহীন হলেও তাদের অবস্থান চরম পর্যায়ের তুলনায় কিছুটা ভালো। তাদের পরিবার প্রতি সদস্যকে মাসিক ১০ ডলার বরাদ্দ দেওয়া হবে।

খাদ্য নিরাপত্তাহীন পরিবার

এছাড়া খাদ্য নিরাপত্তাহীন পরিবারগুলো অপেক্ষাকৃত কম দুর্বল। এই শ্রেণিতে এমন পরিবার রাখা হয়েছে, যেখানে কর্মক্ষম পুরুষ সদস্য রয়েছে, অথবা নারীপ্রধান হলেও পরিবারে কাজ করতে সক্ষম পুরুষ আছে এবং কোনো প্রতিবন্ধী সদস্য নেই। এছাড়া যেসব পরিবারে প্রজননক্ষম বয়সের নারী, শিশু বা প্রতিবন্ধী কেউ নেই, তারাও এই দলে পড়ে। তাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে মাসিক ৭ ডলার বরাদ্দ দেওয়া হবে।

যদিও কম বরাদ্দ, তবুও ন্যূনতম খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য সহায়তা দেওয়া হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে একজন ব্যক্তিকে মাসে ১২ ডলার রেশন দেওয়া হচ্ছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২শ টাকার বেশি। এই টাকায় একজন মানুষ পুরো মাস বেঁচে থাকতে পারবে কীভাবে, তা বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিমাণ আরও কমানো হলে মানুষ বাঁচবে কীভাবে-ইউনাইটেড কাউন্সিল ফর রোহিঙ্গার প্রেসিডেন্ট সৈয়দ উল্লাহ

এর আগে পর্যাপ্ত তহবিল জোগাড়ের কারণে গত বছর এপ্রিল থেকে রোহিঙ্গাদের মাথাপিছু খাদ্য সহায়তা কমিয়ে ১২ ডলার করা হয়েছিল। এক বছরের মাথায় আবারও বরাদ্দ কমার খবর এলো। তবে নতুন সিস্টেমে অসংখ্য রোহিঙ্গার বরাদ্দ কমে মাথাপিছু সাত ডলারে নেমে আসতে পারে। নতুন সিস্টেমে অসংখ্য রোহিঙ্গার বরাদ্দ কমে আসায় অনেকে অপরাধমূলক কার্যক্রমের দিকে ঝুঁকতে পারেন বলেও আশঙ্কা করছেন অনেকে।

রোহিঙ্গা

কক্সবাজারের একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প

‘ইউনাইটেড কাউন্সিল ফর রোহিঙ্গা’র প্রেসিডেন্ট সৈয়দ উল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে একজন ব্যক্তিকে মাসে ১২ ডলার রেশন দেওয়া হচ্ছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২শ টাকার বেশি। এই টাকায় একজন মানুষ পুরো মাস বেঁচে থাকতে পারবে কীভাবে, তা বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিমাণ আরও কমানো হলে মানুষ বাঁচবে কীভাবে?’

তিনি জানান, ডাব্লিউএফপি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফান্ডের সীমাবদ্ধতার কারণে এ ব্যবস্থা নেওয়া বাধ্যতামূলক।

আরও পড়ুন

আগামী বছর ঈদের আগে এক লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন
আশা ছিল দেশে ঈদ করার, ফিরতে পারেনি একজন রোহিঙ্গাও
বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা কমাচ্ছে জাতিসংঘ
রোহিঙ্গাদের খাদ্যসহায়তা অব্যাহত রাখতে অঙ্গীকারবদ্ধ ডব্লিউএফপি

সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ‘ক্যাম্পে যে তিনটি ক্যাটাগরি তৈরি করা হয়েছে, তা নির্ধারণ করা হয়েছে শিশু থাকা বা না থাকা এবং প্রতিবন্ধী থাকা বা না থাকা অনুযায়ী। তবে এই ভাগাভাগি কিছু অনিয়ম বা অসচ্ছতা সৃষ্টি করতে পারে। বড় পরিবারের লোকেরা কম রেশন পাচ্ছে, আর ছোট বা শিশুহীন পরিবার বেশি পাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘মূল সমস্যা হলো, রেশন বা ফান্ড কমানোর কারণে মানুষ বেঁচে থাকার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বা অবৈধ পথ অবলম্বন করতে পারে। ক্যাম্পে মানুষের স্বাবলম্বী হওয়ার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় শুধু রেশনই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র উৎস হয়ে গেছে। সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে এতে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’

সৈয়দ উল্লাহর দাবি, ক্যাম্পের লোকদের টিকে থাকার জন্য পর্যাপ্ত রেশন বা আর্থিক সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। ফান্ডের সীমাবদ্ধতা থাকলেও এটি ন্যায্যভাবে এবং স্বচ্ছভাবে বিতরণ করা জরুরি, না হলে সামাজিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দেবে।

ভাসানচরের রোহিঙ্গা ক্যাম্প

ভাসানচরের রোহিঙ্গা ক্যাম্প

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ডাব্লিউএফপি এই পরিবর্তন সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছে। এ বিষয়ে আমরা আমাদের কনসার্নও জানিয়েছি, যাতে কোনো ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি না হয়।’

তিনি জানান, তহবিল সংকট তো বটেই, পাশাপাশি সুষম বণ্টন তাদের লক্ষ্য। তবে ডাব্লিউএফপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা পর্যাপ্ত পর্যালোচনা করেই এ সিস্টেম চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, এমনকি ১ এপ্রিল নতুন পদ্ধতিতে রেশন দেওয়ার পরেও সেটি ঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা তারা পর্যালোচনা করবে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নিশ্চিত করেছে।

ডাব্লিউএফপি জানায়, তাদের খাদ্য সহায়তা প্যাকেজে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার অন্তর্ভুক্ত থাকে, যা একটি পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে সহায়তা করে। ফর্টিফায়েড চালে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রয়েছে, যা রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ভূমিকা রাখে। একটি সুষম খাদ্যতালিকায় প্রোটিন, শর্করা ও স্বাস্থ্যকর চর্বি থাকা জরুরি, যা শরীরকে শক্তি জোগায় এবং সুস্থ থাকতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করে।

ডাব্লিউএফপি আরও জানায়, ‘ফ্রেশ ফুড কর্নার’ থেকে তাজা সবজি ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার সরবরাহ করা হয়, যা পরিবারের বর্তমান স্বাস্থ্য রক্ষা এবং ভবিষ্যতের জন্য পুষ্টি নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।

সংস্থাটি সবাইকে প্রাপ্ত খাদ্য সহায়তার সর্বোচ্চ ব্যবহার করার আহ্বান জানিয়ে বলে, এই সহায়তা মৌলিক খাদ্য চাহিদা বিবেচনা করেই নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই এর কোনো অংশ বিক্রি না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ডাব্লিউএফপি জানায়, কোনো প্রশ্ন, অভিযোগ বা মতামত থাকলে রোহিঙ্গারা সহজেই জানাতে পারবেন। এজন্য প্রতিটি ডাব্লিউএফপি আউটলেটে ডাব্লিউএফপি ও ইউএনএইচসিআরের যৌথ হেল্পডেস্ক থাকবে, যেখানে সরাসরি গিয়ে কথা বলা যাবে।

সংস্থাটি জানায়, পরিবারগুলোকে গ্রুপে ভাগ করতে ইউএনএইচসিআরের তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে। তাই কেউ যদি মনে করেন তাকে ভুলভাবে কোনো গ্রুপে রাখা হয়েছে বা তার তথ্য আপডেট হলেও তা ঠিকভাবে ধরা হয়নি, তাহলে তিনি ডাব্লিউএফপির হেল্পডেস্কে যোগাযোগ করতে পারবেন। এছাড়া ২৪ ঘণ্টার হটলাইন (০৮০০০০৯৯৯৭৭৭) ও ইমেইলের মাধ্যমেও যোগাযোগ করা যাবে।

ডাব্লিউএফপি আরও জানায়, পরিবারের তথ্য বা সদস্য সংখ্যায় কোনো পরিবর্তন হলে তা জানাতে ইউএনএইচসিআরের হেল্পডেস্কে যোগাযোগ করতে হবে। এছাড়া ইউএনএইচসিআরের হেল্পলাইন (১৬৬৭০) ও ইমেইলের মাধ্যমেও সহায়তা পাওয়া যাবে।

জেপিআই/এএসএ/এমএফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow