বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় চারটি খাল পুনঃখনন প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নের পর অব্যবহৃত ১ কোটি ৭৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। বরাদ্দের পুরো অর্থ অপচয় না করে সাশ্রয় হওয়া উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার এই ঘটনাকে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির এক বিরল ও ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপজেলার নেপালতলী, নশিপুর, সোনারায় ও দক্ষিণপাড়া ইউনিয়নের ৩ হাজার ৬০০ মিটার দীর্ঘ চারটি খাল পুনঃখননের জন্য ৪ কোটি ৩১ লাখ ৭৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়।
গত ২০ এপ্রিল বাগবাড়ি-নশিপুর চৌকিরদহ খালের কাজ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে অন্য তিনটি খালের কাজও শুরু হয় এবং ২৯ জুন পুনঃখননের কাজ শেষ হয়।
প্রকল্পের আওতায় খাল পুনঃখননের পাশাপাশি দখলমুক্তকরণ, সরকারি নকশা অনুযায়ী খনন, দুই পাড় বাঁধাই, নিচু জমির পানি নিষ্কাশনের জন্য পাইপ স্থাপন, চলাচলের সুবিধার্থে কালভার্ট নির্মাণ এবং খালের দুই পাশে বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের আশা, এতে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন সহজ হবে, কৃষিজমিতে সেচব্যবস্থা উন্নত হবে এবং দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা অনেকটাই কমে আসবে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, শ্রমিকদের মজুরি, যন্ত্রপাতি ব্যবহার, পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য বৈধ বিল পরিশোধ করে প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৫২ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। ফলে ১ কোটি ৭৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকা অব্যয়িত থাকে। পরে সরকারি বিধি অনুসারে সেই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।
নেপালতলী ইউনিয়নের ধনঞ্জয় এলাকার কৃষক জাহাঙ্গীর বলেন, গত বছর বর্ষায় তাদের জমি দীর্ঘদিন পানিতে ডুবে ছিল। এবার খাল পুনঃখননের কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে গেছে। এতে সময়মতো হালচাষ করা সম্ভব হয়েছে এবং আমনের ফলন ভালো হওয়ার আশা করছেন তিনি।
সোনারায় ইউনিয়নের কৃষক সাইফুল হোসেন বলেন, আগে বর্ষায় বাড়িঘর ও উঠান পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যেত। এবার খাল দিয়ে দ্রুত পানি নেমে যাওয়ায় বাড়িতে পানি ওঠেনি, জমিতেও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়নি।
আরেক কৃষক আবদুল আজিজ বলেন, পুনঃখননের পর খালে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ফিরে এসেছে। কৃষিকাজের পাশাপাশি এখন খাল থেকে মাছও ধরা যাচ্ছে, যা পরিবারের খাদ্য চাহিদা পূরণে সহায়তা করছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অব্যয়িত অর্থ কোষাগারে ফেরত দেওয়ার ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না। তাদের মতে, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার এ উদ্যোগ অন্য প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও অনুসরণযোগ্য হতে পারে।
গত ৫ মে স্থানীয় সংসদ সদস্য মোরশেদ মিলটন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মফিদুল ইসলাম বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ৩ হাজার ৬০০ মিটার খাল ৯ ফুট গভীর এবং ৩০ থেকে ৩৫ ফুট প্রস্থে পুনঃখনন করা হয়েছে। বৃষ্টির কারণে কয়েক দফা পাড় মেরামতের প্রয়োজন হলেও নির্ধারিত মান বজায় রেখেই কাজ শেষ করা হয়েছে। খালের দুই পাশেও বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সঠিক অর্থ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। সব বৈধ ব্যয় পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থ সরকারি বিধি অনুযায়ী কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, খালের কয়েকটি স্থানে প্রস্থ প্রাক্কলনের তুলনায় কম হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয়ও কম হয়েছে। ফলে ১ কোটি ৭৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকা সাশ্রয় হয় এবং সেই অর্থ সরকারি তহবিলে জমা দেওয়া হয়েছে।