চট্টগ্রাম বহির্নোঙরে জলদস্যু আতঙ্ক

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে জলদস্যু চক্র। মাত্র ১৮ দিনের ব্যবধানে ৩টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে লুট করা হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকার মালপত্র, মূল্যবান যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম। একের পর এক ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে আমদানিকারক, শিপিং এজেন্ট ও বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে। বহির্নোঙরের নিরাপত্তা জোরদার ও দস্যুতা প্রতিরোধে জরুরি পদক্ষেপ নিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। গত ২২ জুলাই নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে পাঠানো চিঠিতে চট্টগ্রাম চেম্বার জানায়, গত এক মাসে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ৩টি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজে জলদস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কয়েক কোটি টাকার মালামাল, জাহাজের সরঞ্জাম ও মূল্যবান যন্ত্রাংশ লুট হয়েছে। হামলার সময় কোস্টগার্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগের বিষয়টিও চিঠিতে তুলে ধরা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের প্রায় ৯২ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে বহ

চট্টগ্রাম বহির্নোঙরে জলদস্যু আতঙ্ক

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে জলদস্যু চক্র। মাত্র ১৮ দিনের ব্যবধানে ৩টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে লুট করা হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকার মালপত্র, মূল্যবান যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম। একের পর এক ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে আমদানিকারক, শিপিং এজেন্ট ও বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে। বহির্নোঙরের নিরাপত্তা জোরদার ও দস্যুতা প্রতিরোধে জরুরি পদক্ষেপ নিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি।

গত ২২ জুলাই নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে পাঠানো চিঠিতে চট্টগ্রাম চেম্বার জানায়, গত এক মাসে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ৩টি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজে জলদস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কয়েক কোটি টাকার মালামাল, জাহাজের সরঞ্জাম ও মূল্যবান যন্ত্রাংশ লুট হয়েছে। হামলার সময় কোস্টগার্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগের বিষয়টিও চিঠিতে তুলে ধরা হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের প্রায় ৯২ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে বহির্নোঙরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে শুধু শিপিং খাত নয়, জাতীয় অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, জলদস্যুতার ঘটনায় বিদেশি শিপিং অপারেটরদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। এর ফলে বাড়তে পারে বীমা ব্যয়, জাহাজ পরিচালনায় বিলম্ব এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের খরচ।

সর্বশেষ গত ১৬ জুলাই ভোরে চট্টগ্রাম বন্দরের চার্লি অ্যাঙ্করেজে নোঙর করা সিয়েরা লিওনের পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার ‘তাই শুয়েন’ জাহাজে হামলা চালায় একদল সশস্ত্র জলদস্যু। হংকং থেকে আনা জাহাজটি সীতাকুণ্ডের জনতা স্টিলের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য আনা হয়েছিল।

জানা গেছে, প্রায় ২০ জন সশস্ত্র দস্যু ৫টি কাঠের নৌকা নিয়ে জাহাজটিতে উঠে পড়ে। একদল নাবিকদের ব্যস্ত রাখে, অন্য দল ডেক থেকে নোঙরের দড়ি, ব্যাটারি ও বিভিন্ন মূল্যবান সরঞ্জাম খুলে নিয়ে যায়। জাহাজের ক্যাপ্টেন তাৎক্ষণিকভাবে বন্দর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বার্তা পাঠালেও কোস্টগার্ড ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই পালিয়ে যায় দস্যুরা। 

এর আগে গত ২৯ জুন একই অ্যাঙ্করেজে ডায়নামিক শিপ রিসাইক্লিংয়ের আমদানি করা ‘এমভি হাই জু’ জাহাজে হামলা চালায় ২০ থেকে ২৫ জন সশস্ত্র ডাকাত। তারা নাবিকদের জিম্মি করে প্রায় এক কোটি টাকার যন্ত্রাংশ লুট করে নিয়ে যায়। এর পরদিন যমুনা শিপ ব্রেকার্সের আমদানি করা ‘এমটি আইআরওএস’ জাহাজ থেকেও কয়েক কোটি টাকার সরঞ্জাম চুরি হয়। পরে নৌ-পুলিশ রাজধানীর বাংলাবাজার এলাকা থেকে প্রায় দুই কোটি টাকার চোরাই মালামাল উদ্ধার করে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯২ শতাংশ পরিচালিত হয়। বহির্নোঙরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে জাতীয় অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে জরুরি পদক্ষেপ নিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা রিজিওনাল কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট অন কমবেটিং পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রবারি এগেইনস্ট শিপস ইন এশিয়া (রিক্যাপ)-এর তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে কোনো দস্যুতা বা চুরির ঘটনা ঘটেনি। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নাব্য-সংকটের কারণে বড় জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে না পারায় বন্দরে আসা মোট পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজে খালাস করা হয়।

প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০টি বড় পণ্যবাহী জাহাজ বহির্নোঙরে অবস্থান করে। এসব জাহাজ থেকে প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ টন পণ্য লাইটার জাহাজে স্থানান্তর করা হয়। ফলে বহির্নোঙরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বন্দর পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ বার্থ অপারেটর অ্যান্ড শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সরওয়ার হোসেন বলেন, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বহির্নোঙরে কোনো দস্যুতার ঘটনা ছিল না। হঠাৎ করে একের পর এক হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক। নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

এদিকে বহির্নোঙরে নিরাপত্তা বাড়াতে নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কোস্টগার্ড। ইতোমধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) এবং বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের জোনাল কমান্ডারের মধ্যে সমন্বয় সভা হয়েছে। সভায় বহির্নোঙরে নজরদারি বৃদ্ধি, অনুমোদিত ওয়াচম্যান নিয়োগ নিশ্চিত করা, জাহাজ আগমনের তথ্য বাধ্যতামূলক সরবরাহ, প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজরদারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব রেফায়েত হামীম বলেন, বহির্নোঙরে চুরি বন্ধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে। কোস্টগার্ড নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। চুরির সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow