চাষাঢ়ে গল্প: বঞ্চিত মানুষের আখ্যান
আনিফ রুবেদ লেখক রাখাল রাহার কাজের মূল ক্ষেত্র শিক্ষা, প্রকাশনা ও সম্পাদনা। এবং মনে হয়, তিনি গল্প-উপন্যাস লিখেছেন খুব কম। ‘অমাবতী’ তার প্রথম উপন্যাস, যেটা ২০০৭ সালে বেরিয়েছিল। এরপর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘চাষাঢ়ে গল্প’। অবশ্য আমার হাতের বইটি ২০২০ সালের সংস্করণ। পরে আর কোনো বই প্রকাশিত হয়েছে কি না আমার জানা নেই। ‘আষাঢ়ে গল্প’ বাগধারার সাথে মিল রেখে তিনি চাষাঢ়ে গল্প নামটি নিয়েছেন এবং এই শব্দের সার্থক ব্যবহার হয়েছে বলে মনে হয়েছে আমার। আষাঢ়ে গল্পের ভেতর অলীকতা থাকলেও চাষাঢ়ে গল্পের ভেতর তা নেই। বইটিতে চারটি গল্প রয়েছে এবং গল্পের নাম রাখার ক্ষেত্রেও তিনি একটা বিশেষ ধারা ব্যবহার করেছেন। গল্পগুলোর নামের সাথে পরিচিত হলেই ব্যাপারটি পরিষ্কার হবে। গল্পগুলোর নাম—‘শোল-গজার’, ‘শরীয়ত-মারেফত’, ‘বাম-ডান’, ‘বড়-ছোট’। চাষা বলতে আমরা বুঝি সমাজের, দেশের সেইসব নাগরিককে; যারা সবকিছুর জোগান দেয় কিন্তু সবকিছু থেকে তারাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়। নির্যাতনের শিকার হয়; অপমানিত হয়। এইসব চাষারাই রাখাল রাহার গল্পে উঠে এসেছে তাদের করুণ চোখের চাউনি নিয়ে; মারাত্মকভাবে হেরে যাওয়া আত্মা নিয়ে; কথা বলতে না পারা জিহ্বা নিয়ে। আরও পড়ুনপ
আনিফ রুবেদ
লেখক রাখাল রাহার কাজের মূল ক্ষেত্র শিক্ষা, প্রকাশনা ও সম্পাদনা। এবং মনে হয়, তিনি গল্প-উপন্যাস লিখেছেন খুব কম। ‘অমাবতী’ তার প্রথম উপন্যাস, যেটা ২০০৭ সালে বেরিয়েছিল। এরপর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘চাষাঢ়ে গল্প’। অবশ্য আমার হাতের বইটি ২০২০ সালের সংস্করণ। পরে আর কোনো বই প্রকাশিত হয়েছে কি না আমার জানা নেই।
‘আষাঢ়ে গল্প’ বাগধারার সাথে মিল রেখে তিনি চাষাঢ়ে গল্প নামটি নিয়েছেন এবং এই শব্দের সার্থক ব্যবহার হয়েছে বলে মনে হয়েছে আমার। আষাঢ়ে গল্পের ভেতর অলীকতা থাকলেও চাষাঢ়ে গল্পের ভেতর তা নেই। বইটিতে চারটি গল্প রয়েছে এবং গল্পের নাম রাখার ক্ষেত্রেও তিনি একটা বিশেষ ধারা ব্যবহার করেছেন। গল্পগুলোর নামের সাথে পরিচিত হলেই ব্যাপারটি পরিষ্কার হবে। গল্পগুলোর নাম—‘শোল-গজার’, ‘শরীয়ত-মারেফত’, ‘বাম-ডান’, ‘বড়-ছোট’।
চাষা বলতে আমরা বুঝি সমাজের, দেশের সেইসব নাগরিককে; যারা সবকিছুর জোগান দেয় কিন্তু সবকিছু থেকে তারাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়। নির্যাতনের শিকার হয়; অপমানিত হয়। এইসব চাষারাই রাখাল রাহার গল্পে উঠে এসেছে তাদের করুণ চোখের চাউনি নিয়ে; মারাত্মকভাবে হেরে যাওয়া আত্মা নিয়ে; কথা বলতে না পারা জিহ্বা নিয়ে।
- আরও পড়ুন
প্রিয় ১৫ গল্প: সমকালের আয়না
প্রথম গল্পে গোবিন্দকে দেখি। গরিব বেচারা। খেতেও পায় না ঠিকমতো। সে কিয়ামদ্দী শেখের পুকুরে জাল নিয়ে নামে। একটা বড় শোল মাছ ওপরে ছোবড়ার নিচে লুকিয়ে রাখে। এটা চুরি। কিন্তু পাঠক মনে মনে গোবিন্দের চুরি করাটা যেন সার্থক হয় তা প্রার্থনা করতে থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয় না। ধরা পড়ে যায়। এমনই গোবিন্দদের জৈব-জীবন।
দ্বিতীয় গল্প ‘শরীয়ত-মারেফত’। এখানে দেখা যায় জীবনের সামাজিক সংকট; দার্শনিক সংকট। কেদারকে একজন সাধারণ কিন্তু গোঁয়ার মানুষ হিসেবে দেখি। ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে দিন চালায়। ঘরে দুই বউ। ছেলেরা আলাদা সংসার করেছে। সে একদিন হুট করে নামাজ পড়া শুরু করে এবং কিছুদিন পর হঠাৎ করে নামাজ পড়া ছেড়েও দেয়। নিভৃত স্থানে ধ্যানমগ্নপ্রায় বসে থাকে; আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। চমৎকার শান্ত একজন মানুষ হয়ে ওঠে। কিন্তু এবার সমাজিরা, নমাজিরা তার পেছনে লেগে পড়ে। সে তার নিজ দার্শনিক জীবনযাপন করতে পারে না।
‘বাম-ডান’ তৃতীয় গল্প। প্রথমে ভেবেছিলাম রাজনীতির যে বাম-ডান তাই নিয়েই বুঝি এ গল্প। কিন্তু তা নয়; রাজনীতি এখানে অবশ্যই রয়েছে কিন্তু এ ডান-বাম হলো লেফট-রাইট; এ ডান-বাম হলো জলপাই রং। গল্পটিতে চমৎকার টগবগে এক ছাত্রের দেখা পাই যার নাম লিয়াকত; লিয়াকতের বয়স যা, তাতে সে যে ক্লাসে পড়ার কথা তার চাইতে অনেক নিচের শ্রেণিতে পড়ে। সে কাউকে পরোয়া করে না কিন্তু অমানবিক সে নয়; মানুষের বিপদে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে; মনের ভেতর তার আর্মির অফিসার হবার বাসনা।
এক দুর্যোগের সময় সে দুর্যোগ কবলিত এলাকার জন্য বন্ধুদের নিয়ে কাজ করতে নেমে যায়। একসময় সে আর্মিদের সাথেও কাজ করে। তারা তাকে বেশ বাহ্বা দেয়। এরপর দেশে সামরিক শাসন নেমে আসে। অনেকেই তাকে বলে, চুল বড় দেখলে আর্মিরা কেটে ফেলছে; সে যেন চুল কেটে ফেলে। কিন্তু এসব কথা বিশ্বাস করে না, সে ভাবে, এই চুল নিয়েই তো দুর্যোগের সময় তাদের সাথে কাজ করেছি, তখন তো কিছু বলেনি। তাহলে এখন বলবে কেন! কিন্তু তাই ঘটে তার সাথে; অনেক মানুষ আর তার প্রেমিকার সামনেই তার চুল কেটে ফেলে। তার চোখ দিয়ে জল ঝরে।
এমন একটা সোনার ছেলেকে নষ্ট করে দেয় নির্বোধ রাষ্ট্রযন্ত্র। তৃতীয় গল্প আর চতুর্থ গল্প প্রায় একই ভাব ধারণ করে আছে। চতুর্থ গল্প অর্থাৎ শেষ গল্প অর্থাৎ ‘বড়-ছোট’ গল্পে আমরা দেখতে পাই, একজন শিশুর সাথে আমরা কত নির্মমভাবে মিথ্যাচার করে তার মনটাকে বিষিয়ে তুলি।
কথাকার রাখাল রাহার গল্পের যে ভাষা, তার পুরোটাই যদ্দুর সম্ভব ঝিনাইদহ বা তার আশপাশের অঞ্চলগুলোর ভাষা বলে ধারণা করছি। এটা তার বয়ানভঙ্গিকে নিজস্বতা দান করেছে। লোকজ বিভিন্ন ছড়া, গান, উপকথা বইটির গল্পগুলোর মাধুরী বাড়িয়ে দিয়েছে কিন্তু গল্পের ভেতর বড় শরীরের উপগল্পের উপস্থিতি আরেকটু কম হলে হয়তো আঁটুনিটা আরও শক্ত হতে পারতো। ভালোবাসা গল্পকার রাখাল রাহার জন্য।
এসইউ
What's Your Reaction?