‘চ্যানেল ফি’ ছাড়া মেলে না পাসপোর্ট

দেশের অন্যতম প্রবাসী-অধ্যুষিত জেলা ফেনীর আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়টি এখন সেবাগ্রহীতাদের জন্য চরম ভোগান্তি আর দালালের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এখানে ‘চ্যানেল ফি’ নাম দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা অতিরিক্ত অর্থ বা ঘুষ আদায় করা হচ্ছে। আর এই অবৈধ আয়ের ভাগ যাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তাদের পকেটে। ফলে পাসপোর্ট বানাতে এসে চরম বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। জানা গেছে, গণঅভ্যুত্থানের পর বেশ কয়েক মাস এই কার্যালয়ে কোনো রকম অনিয়ম ও ঘুষ ছাড়া সেবা মিললেও, বর্তমান সহকারী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম যোগদানের পর থেকেই পরিস্থিতি আবার বদলে যায়। কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় দালাল ও নির্দিষ্ট কিছু সিন্ডিকেটের আধিপত্য এখন তুঙ্গে। কোনো গ্রাহক এই অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তাকে নানাভাবে হয়রানি ও বিপত্তিতে পড়তে হচ্ছে। ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রতিটি পাসপোর্টের আবেদন অনলাইনের মাধ্যমে করতে হয়, যেখানে আবেদনকারীরা বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির সহায়তা নেন। সিন্ডিকেটের নিয়ম অনুযায়ী, এজেন্সির মাধ্যমে করা আবেদনগুলোর একটি নির্দিষ্ট কলামে (৭৯ নম্বর কলামে) সংশ্লিষ্

‘চ্যানেল ফি’ ছাড়া মেলে না পাসপোর্ট

দেশের অন্যতম প্রবাসী-অধ্যুষিত জেলা ফেনীর আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়টি এখন সেবাগ্রহীতাদের জন্য চরম ভোগান্তি আর দালালের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এখানে ‘চ্যানেল ফি’ নাম দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা অতিরিক্ত অর্থ বা ঘুষ আদায় করা হচ্ছে। আর এই অবৈধ আয়ের ভাগ যাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তাদের পকেটে। ফলে পাসপোর্ট বানাতে এসে চরম বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

জানা গেছে, গণঅভ্যুত্থানের পর বেশ কয়েক মাস এই কার্যালয়ে কোনো রকম অনিয়ম ও ঘুষ ছাড়া সেবা মিললেও, বর্তমান সহকারী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম যোগদানের পর থেকেই পরিস্থিতি আবার বদলে যায়। কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় দালাল ও নির্দিষ্ট কিছু সিন্ডিকেটের আধিপত্য এখন তুঙ্গে। কোনো গ্রাহক এই অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তাকে নানাভাবে হয়রানি ও বিপত্তিতে পড়তে হচ্ছে।

ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রতিটি পাসপোর্টের আবেদন অনলাইনের মাধ্যমে করতে হয়, যেখানে আবেদনকারীরা বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির সহায়তা নেন। সিন্ডিকেটের নিয়ম অনুযায়ী, এজেন্সির মাধ্যমে করা আবেদনগুলোর একটি নির্দিষ্ট কলামে (৭৯ নম্বর কলামে) সংশ্লিষ্ট এজেন্সির ই-মেইল ঠিকানা ব্যবহার করা হয়।

এদিকে দিনভর কোন এজেন্সির মেইল থেকে কয়টি আবেদন জমা পড়ল, তার নিখুঁত হিসাব তৈরি করেন অফিসের একজন হিসাবরক্ষক। সেই তালিকা ধরে সন্ধ্যায় নির্ধারিত ‘কালেক্টর’ জাকের পাটোয়ারী ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর কাছ থেকে প্রতি আবেদনের বিপরীতে ১ হাজার ১০০ টাকা নেন।

কোনো এজেন্সি এই অতিরিক্ত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে, পরের দিন থেকে তাদের মেইলের আওতাধীন আবেদনগুলো নানা অজুহাতে ও ভুলের অজুহাত দেখিয়ে আটকে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ‘চ্যানেল ফি’ দেওয়া হলে ত্রুটিপূর্ণ আবেদনও মুহূর্তের মধ্যে গ্রহণ করা হয়।

জানা গেছে, পাসপোর্ট অফিসের নির্ধারিত ৪৭টি ট্রাভেল এজেন্সি থেকে নিয়মিত টাকা তোলেন জাকের, যার বিনিময়ে তাকে পাসপোর্ট অফিসের সাইফুল মো. আরিফ নামের এক ব্যক্তি মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতন দেন। এছাড়া ছাগলনাইয়া উপজেলার ১০টি এজেন্সি থেকে টাকা তুলে সাইফুল আরিফের হাতে পৌঁছে দেন মাসুদ ও আতিক নামের দুই ব্যক্তি। আর অনিয়মিত ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর কাছ থেকে সপ্তাহে একদিন টাকা আদায় করেন ‘আনসার করিম’ নামে এক ব্যক্তি।

বর্তমানে এই কার্যালয়ে প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ৩০০টি আবেদন জমা পড়ে। যার সিংহভাগ থেকেই এই ১ হাজার ১০০ টাকা হারে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

ঋণ করে পাসপোর্টের আবেদন করতে আসা শাহীন নামে এক যুবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিদেশ যাওয়ার জন্য মায়ের মাধ্যমে প্রতিবেশীর থেকে ৬ হাজার টাকা ঋণ করে পাসপোর্টের আবেদন করেছিলাম। অতিরিক্ত ১ হাজার ১০০ টাকা দিতে না পারায় অফিস থেকে আমার আবেদনটি ‘ভুল আছে’ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে বাধ্য হয়ে দোকানে গিয়ে টাকা দেওয়ার পর তারা ফর্মের ৭৯ নম্বর কলামের মেইল অ্যাড্রেসটি পরিবর্তন করে দেয়। পরের দিন আর কোনো কথা ছাড়াই অফিস আমার আবেদনটি জমা নেয়।

ফেনী জেলা ট্রাভেল এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফখরুল ইসলাম এই সিন্ডিকেটের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, অতীতে এই চ্যানেল ফির টাকার একটি অংশ অ্যাসোসিয়েশন পেলেও, গত এক বছর ধরে পাসপোর্ট অফিস একাই সব টাকা লুটে নিচ্ছে।

এদিকে ফেনী আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ অস্বিকার করে বলেন, আমার অফিসে কোনো ধরনের বাড়তি টাকা বা ঘুষ গ্রহণের সুযোগ নেই। এ কাজে আমি বা আমার অফিসের কেউ জড়িত নয়। অফিসের বাইরে কেউ বাড়তি টাকা নিলে সেই দায়িত্ব আমার বা আমার অফিসের দায় নেই।

তবে সাধারণ সেবাগ্রহীতা ও সচেতন মহলের দাবি, প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তদারকি এবং কঠোর আইনি পদক্ষেপ ছাড়া প্রবাসীদের রেমিট্যান্সে সমৃদ্ধ এই জেলায় পাসপোর্ট অফিসের এমন ওপেন সিক্রেট দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব নয়।

আবদুল্লাহ আল-মামুন/এনএইচআর/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow