ট্রাম্পের সুরেই সুর মেলাতেন, তবু কেন বিদায় নিতে হলো তুলসী গ্যাবার্ডকে?
যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে একের পর এক শীর্ষ কর্মকর্তার বিদায়ের তালিকায় এবার যুক্ত হলেন ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স (ডিএনআই) তুলসী গ্যাবার্ড। গত তিন মাসে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি, অ্যাটর্নি জেনারেল এবং শ্রমমন্ত্রীর পদত্যাগের পর গত ২২ মে (শুক্রবার) গ্যাবার্ড তার পদত্যাগের ঘোষণা দেন। স্বামীর ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও প্রশাসনের ভেতরে তার ক্রমশ একাকী হয়ে পড়া এবং নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত থেকে দূরে সরিয়ে রাখাকেই এর মূল কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। গ্যাবার্ডের এই বিদায় এমন এক সময়ে এলো, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ফের যুদ্ধ শুরুর বিষয়টি বিবেচনা করছেন। তার এই সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী ছিলেন গ্যাবার্ড। সাবেক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ও যুদ্ধফেরত সেনা কর্মকর্তা তুলসী গ্যাবার্ড মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সব সময়ই কিছুটা ভিন্ন স্রোতের মানুষ ছিলেন। ২০১৭ সালে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ কিংবা ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের জন্য ন্যাটোকে দায়ী করে দেওয়া তার বক্তব্য ওয়াশিংটনে বেশ শোরগোল ফেলে
যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে একের পর এক শীর্ষ কর্মকর্তার বিদায়ের তালিকায় এবার যুক্ত হলেন ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স (ডিএনআই) তুলসী গ্যাবার্ড। গত তিন মাসে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি, অ্যাটর্নি জেনারেল এবং শ্রমমন্ত্রীর পদত্যাগের পর গত ২২ মে (শুক্রবার) গ্যাবার্ড তার পদত্যাগের ঘোষণা দেন। স্বামীর ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও প্রশাসনের ভেতরে তার ক্রমশ একাকী হয়ে পড়া এবং নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত থেকে দূরে সরিয়ে রাখাকেই এর মূল কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
গ্যাবার্ডের এই বিদায় এমন এক সময়ে এলো, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ফের যুদ্ধ শুরুর বিষয়টি বিবেচনা করছেন। তার এই সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী ছিলেন গ্যাবার্ড।
সাবেক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ও যুদ্ধফেরত সেনা কর্মকর্তা তুলসী গ্যাবার্ড মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সব সময়ই কিছুটা ভিন্ন স্রোতের মানুষ ছিলেন। ২০১৭ সালে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ কিংবা ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের জন্য ন্যাটোকে দায়ী করে দেওয়া তার বক্তব্য ওয়াশিংটনে বেশ শোরগোল ফেলেছিল। ডেমোক্র্যাট দল ছেড়ে প্রথমে স্বতন্ত্র ও পরে ২০২৪ সালে রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দিয়ে তিনি ট্রাম্পের ‘মাগা’ আন্দোলনের যুদ্ধবিরোধী অংশের প্রতীক হয়ে ওঠেন। যুক্তরাষ্ট্রের ১৮টি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়কারী হিসেবে তার নিয়োগের পর মার্কিন গোয়েন্দা মহলে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
নীতি নির্ধারণে প্রভাবহীন, কিন্তু ট্রাম্পের অনুগত
বাস্তব ক্ষেত্রে, গ্যাবার্ডের বিদায় ট্রাম্পের নীতি নির্ধারণে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্যাবার্ড শুরু থেকেই ‘মূল বৃত্তের বাইরে’ ছিলেন। জাতীয় নিরাপত্তা বা সামরিক বিষয়ে ট্রাম্পের মূল উপদেষ্টা দলের সদস্য ছিলেন না তিনি। গত জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনী যখন ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালায়, তার তীব্র বিরোধী ছিলেন গ্যাবার্ড। ওই অভিযানের সময় তিনি ছুটিতে ছিলেন, যা তার গুরুত্বহীনতারই প্রমাণ দেয়।
আরও পড়ুন>>
কে এই তুলসী গ্যাবার্ড?
ডেমোক্র্যাটদের ‘যুদ্ধবাজ’ আখ্যা দিয়ে দল ছাড়লেন তুলসী গ্যাবার্ড
‘অন্য দেশের সরকার পরিবর্তনের মার্কিন নীতি’ শেষ হয়েছে: গ্যাবার্ড
ট্রাম্পের ইরান পরিকল্পনার পেছনে কলকাঠি নাড়ছে কারা?
তবে ট্রাম্পের প্রতি গ্যাবার্ডের আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। ২০২৫ সালের বার্ষিক গোয়েন্দা ব্রিফিংয়ে তিনি কংগ্রেসকে বলেছিলেন, ইরান কোনো পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে না। কিন্তু চলতি বছরের শুরুতে ট্রাম্প যখন যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি দিয়ে এর উল্টো দাবি করেন, তখন মার্চ মাসে সিনেটরদের মুখোমুখি হয়েও গ্যাবার্ড তার লিখিত বক্তব্যের সেই অংশগুলো পড়তে অস্বীকৃতি জানান, যা প্রেসিডেন্টের দাবির বিরোধী ছিল। এমনকি মে মাসে তিনি এমন দুজন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেন, যারা ভেনিজুয়েলা সরকারের সঙ্গে ড্রাগ কার্টেলের সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবির বিরোধিতা করে প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গোয়েন্দা সংস্থার ব্যবহার
গ্যাবার্ডের মেয়াদকালে ‘অফিস অব দ্য ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স’ (ওডিএনআই)-এর আকার যেমন ছোট হয়েছে, তেমনি এটি নজিরবিহীনভাবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। গত জানুয়ারিতে জর্জিয়ার ফুলটন কাউন্টিতে ট্রাম্পের ২০২০ সালের নির্বাচন চুরির ভিত্তিহীন দাবি তদন্তে যখন এফবিআই ব্যালট জব্দ করে, তখন গ্যাবার্ড সেখানে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন এবং ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।
দুই মাস পর তিনি স্বীকার করেন, পুয়ের্তো রিকোর নির্বাচনে ভেনেজুয়েলা কারচুপি করেছে—ট্রাম্প সমর্থকদের এমন ভিত্তিহীন দাবির প্রেক্ষিতে ওডিএনআই সেখানকার ভোটিং মেশিন জব্দ করেছে। এ ছাড়া বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য ট্রাম্পের নির্দেশে একটি বিশেষ ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ’ও তৈরি করেছিলেন তিনি।
গ্যাবার্ডের এই বিদায়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন পেশাদার গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির হেইডেন সেন্টার ফর ইন্টেলিজেন্সের নির্বাহী পরিচালক ল্যারি ফাইফার বলেন, ‘তিনি কখনই এই পদের জন্য যোগ্য ছিলেন না এবং পদের দায়িত্বও পুরোপুরি বোঝেননি। ট্রাম্পের মন জয় করতে তিনি অতীতের নির্বাচন নিয়ে তৈরি হওয়া বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের তদন্তে জড়িয়ে পড়েন।’
যুদ্ধবিরোধীরা কোণঠাসা?
তুলসী গ্যাবার্ডের পদত্যাগ ট্রাম্পের বলয়ে যুদ্ধবিরোধী শিবিরের ক্ষয়িষ্ণু প্রভাবেরই সর্বশেষ প্রমাণ। গত মার্চ মাসে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রতিবাদে ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্ট পদত্যাগ করেছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুদ্ধের কট্টর বিরোধী হিসেবে পরিচিত ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই সংঘাত নিয়ে নীরব রয়েছেন।
বিপরীতে, কট্টরপন্থি হিসেবে পরিচিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং রাশিয়া-বিরোধী হিসেবে পরিচিত সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। ট্রাম্প এখন ইরান ও কিউবার ওপর নতুন করে হামলার পরিকল্পনা করছেন।
অবশ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প গ্যাবার্ডকে পদত্যাগে বাধ্য করেননি। তবে চলতি বছরের শুরুতেই ট্রাম্প স্বীকার করেছিলেন, তাদের চিন্তাভাবনার মিল নেই। ট্রাম্পের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি গ্যাবার্ডকে ধন্যবাদ জানিয়ে লিখেছেন, ‘তুলসী দুর্দান্ত কাজ করেছেন, আমরা তাকে মিস করব।’
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
কেএএ/
What's Your Reaction?