দ্বিগুণ শুল্কের প্রস্তাবে বড় বিপদের মুখে প্লাস্টিক খাত
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আগে থেকেই সংকটের মধ্যে ছিল দেশের প্লাস্টিক শিল্প। আমদানিকৃত কাঁচামালের দাম বাড়তে বাড়তে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এ কারণে আমদানিও কমে অর্ধেকে নেমে গেছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের বাজেট ঘোষণার পর এবার বড় বিপদের মুখে পড়তে যাচ্ছে প্লাস্টিক খাত। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১১ জুন জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন। এসময় প্লাস্টিক শিল্পের অন্যতম প্রধান দুই কাঁচামাল পিভিসি (পলিভিনাইল ক্লোরাইড) ও পিইটি (পলিইথিলিন টেরেফথালেট) রেজিনের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সরকারের এমন প্রস্তাবে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দেশের প্লাস্টিক শিল্প খাতে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কাঁচামাল আমদানির ওপর দ্বিগুণ শুল্কের কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে। বেড়ে যাবে পণ্যের দাম। একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। প্লাস্টিক শিল্পের মূল কাঁচামাল পিভিসি ও পিইটি রেজিন/ছবি: সংগৃহীত পিভিসি ও পিইটি রেজিনের ব্যবহার দেশে প্লা
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আগে থেকেই সংকটের মধ্যে ছিল দেশের প্লাস্টিক শিল্প। আমদানিকৃত কাঁচামালের দাম বাড়তে বাড়তে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এ কারণে আমদানিও কমে অর্ধেকে নেমে গেছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের বাজেট ঘোষণার পর এবার বড় বিপদের মুখে পড়তে যাচ্ছে প্লাস্টিক খাত।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১১ জুন জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন। এসময় প্লাস্টিক শিল্পের অন্যতম প্রধান দুই কাঁচামাল পিভিসি (পলিভিনাইল ক্লোরাইড) ও পিইটি (পলিইথিলিন টেরেফথালেট) রেজিনের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সরকারের এমন প্রস্তাবে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দেশের প্লাস্টিক শিল্প খাতে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কাঁচামাল আমদানির ওপর দ্বিগুণ শুল্কের কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে। বেড়ে যাবে পণ্যের দাম। একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
প্লাস্টিক শিল্পের মূল কাঁচামাল পিভিসি ও পিইটি রেজিন/ছবি: সংগৃহীত
পিভিসি ও পিইটি রেজিনের ব্যবহার
দেশে প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনে বহুল ব্যবহৃত কাঁচামাল পিভিসি ও পিইটি রেজিন। এগুলো দিয়ে তৈরি হয় পিভিসি পাইপ, ফিটিংস, পানির ট্যাংক, দরজা-জানালা, ফ্লোরিং সামগ্রী, বৈদ্যুতিক তার ও ক্যাবলের ইনসুলেশন, কৃত্রিম চামড়া, জুতার সোল, খাদ্য ও পানীয় বোতল, ওষুধ ও ভোক্তা পণ্যের প্যাকেজিংসহ অসংখ্য শিল্পপণ্য।
এর ফলে শুল্ক বৃদ্ধির প্রভাব শুধু প্লাস্টিক শিল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নির্মাণ, প্যাকেজিং, বিদ্যুৎ, ইলেকট্রনিকস পণ্য, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ, পোশাক ও অটোমোবাইল খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যুদ্ধের প্রভাব / কাঁচামালের জোগান সংকটে চাপে প্লাস্টিক শিল্প

ফেলে দেওয়া প্লাস্টিককে সম্পদে রূপ দিচ্ছে প্রাণ-আরএফএল
মোট চাহিদার ৭০ শতাংশই আমদানি
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ মেট্রিক টন পিভিসি রেজিন এবং তিন লাখ ৫০ হাজার টন পিইটি রেজিনের চাহিদা রয়েছে। অর্থাৎ মোট চাহিদা প্রায় আট লাখ ৫০ হাজার টন। এর বিপরীতে দেশে পিভিসি রেজিন উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় দেড় লাখ টন এবং পিইটি রেজিন উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় এক লাখ টন। ফলে মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। এ কারণে আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্প বছরে ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। দেশে প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে পাঁচ হাজারের বেশি, যার প্রায় ৯৮ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। শিল্পটি এখনো বেশির ভাগ কাঁচামালের জন্য আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি কিংবা শুল্ক পরিবর্তনের প্রভাব দ্রুত উৎপাদন ব্যয়ে প্রতিফলিত হয়।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত হলে পাইপ, ফিটিংস, পানির ট্যাংক, পানীয় বোতল, প্যাকেজিং সামগ্রী, বৈদ্যুতিক ক্যাবলের ইনসুলেশন, কৃত্রিম চামড়া, জুতা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফলে বাজারে এসব পণ্যের দামও বৃদ্ধি পেতে পারে, যা ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করেন/ছবি: সংগৃহীত
যুদ্ধের কারণে আগেই বেড়েছে কাঁচামালের দাম
প্লাস্টিক শিল্পের কাঁচামালের বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এর দাম এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্ববাজারে প্রতি টন কাঁচামাল যেখানে ৯০০ থেকে ৯৫০ ডলারে বিক্রি হতো, সেটা এখন বেড়ে এক হাজার ৬০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। শিপমেন্টের খরচও বেড়ে গেছে। এ কারণে দেশের কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। লোকসানের মুখে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
এবারের বাজেটে আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। কাঁচামালের ওপর করভার বাড়ানো হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং শিল্প উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।- বিপিজিএমইএ সভাপতি শামিম আহমেদ
উদ্যোক্তারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মাস আগে দেওয়া কাঁচামালের অর্ডারও সময়মতো সরবরাহ হচ্ছে না। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরবরাহকারীরা অর্ডার বাতিল করছেন কিংবা দীর্ঘ সময় নিচ্ছেন। এমন বাস্তবতায় নতুন করে শুল্ক বৃদ্ধি শিল্পের ওপর দ্বিগুণ চাপ তৈরি করবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) সভাপতি শামিম আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, দেশের প্লাস্টিক শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের অর্ধেকের বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। কিন্তু সেখানে চলমান যুদ্ধের কারণে কাঁচামালের দাম বাড়তে বাড়তে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আমদানিও কমে অর্ধেকে নেমে গেছে।

‘প্লাস্টিক নিজে দূষণ করে না, দূষণ করে আমাদের অব্যবস্থাপনা’

চট্টগ্রাম বন্দরে যেন ‘অনিয়মই নিয়ম’
শুল্ক বাড়িয়ে দেশীয় রেজিন উৎপাদনে সুরক্ষা?
বিভিন্ন খাতে শুল্ক বৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘চীনে ঘরে ঘরে শিল্প একদিনে হয় নাই। আমরা যদি ডিম আগে না মুরগি আগের মতো অবস্থা করি, দেশীয় শিল্পকে যদি সুরক্ষা না দেওয়া হয়, তাহলে শিল্প থাকবে, কিন্তু ক্রেতা কিনবে না। বাইরে থেকে সস্তায় পাওয়া যায় এ জন্য কিনবে না। এ কারণে অল্প কিছু প্রটেকশন দিয়ে ধীরে ধীরে আগাতে হবে।’
তবে প্লাস্টিক শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে রেজিন উৎপাদনে এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণতা আসেনি। তার ওপর দেশীয় উৎপাদিত রেজিনের দাম আমদানির তুলনায় কেজিপ্রতি প্রায় ১০ টাকা বেশি। তাই দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার আগে উৎপাদন ব্যয়ের কারণগুলো দূর করা প্রয়োজন। তাদের মতে, স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের আগেই আমদানি শুল্ক বাড়ানো হলে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে, উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত তার বোঝা বহন করতে হবে ভোক্তাদেরই।
আমরা এখন জিরো মার্জিনে রপ্তানি করছি। কেবল বাজার ধরার জন্য। অন্যদিকে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা বসে নেই। কাঁচামালের করভার বাড়ানোয় আমাদের উৎপাদন খরচ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়বে।- ইয়াকিন পলিমার লিমিটেডের চেয়ারম্যান কাজী আনোয়ার
সূত্রমতে, বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্প বর্তমানে প্রায় ৭০টি দেশে পণ্য রপ্তানি করছে এবং রপ্তানি আয়ও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এখন কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হলে রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে পোশাক, খাদ্য ও ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত প্যাকেজিং উপকরণের খরচ বাড়লে তার প্রভাব পুরো রপ্তানি শৃঙ্খলে পড়বে।
নানা ধরনের প্লাস্টিক পণ্য/ছবি: সংগৃহীত
শিল্প উদ্যোক্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা
বিপিজিএমইএ সভাপতি শামিম আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবারের বাজেটে আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। কাঁচামালের ওপর করভার বাড়ানো হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং শিল্প উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’
তিনি জানান, সরকার যখন রপ্তানি ও শিল্পায়ন বাড়ানোর কথা বলছে, তখন শিল্পের প্রধান কাঁচামালের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি উদ্যোক্তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
বিপিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও প্লাস্টিক খাতের উদ্যোক্তা মো. ইউসুফ আশরাফ বলেন, ‘বাজেটে প্লাস্টিক খাতের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো সুযোগ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। রপ্তানি পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এর মধ্যে কাঁচামালের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি আমাদের জন্য নতুন সংকট তৈরি করবে।’

আবাসন খাতে ‘কালো টাকা’ বৈধ করার সুযোগ, বৈষম্য বাড়ার শঙ্কা

সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় বাড়েনি করহার, বরং সুবিধা বাড়ছে ছোটদের
এ নিয়ে কথা হলে ইয়াকিন পলিমার লিমিটেডের চেয়ারম্যান কাজী আনোয়ার জাগো নিউজকে জানান, এই কাঁচামালের ওপর করভার বাড়ানোর ফলে এ খাতের উদ্যোক্তাদের বাজার ছোট হয়ে যাবে। উদ্যোক্তাদের পণ্য মূল্য বাড়াতে হবে, ক্রেতাদের ক্রয় ক্ষমতা কমে যাবে। অথচ কর বাড়িয়ে খুব বেশি রাজস্ব আদায় করা যাবে, বিষয়টি এমন নয়। অর্থনৈতিক ঘূর্ণন কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখন জিরো মার্জিনে রপ্তানি করছি। কেবল বাজার ধরার জন্য। অন্যদিকে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা বসে নেই। কাঁচামালের করভার বাড়ানোয় আমাদের উৎপাদন খরচ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়বে। একই পরিমাণ প্রভাব দামের ক্ষেত্রে পড়তে পারে। আমরা শিগগিরই খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসবো। অর্থমন্ত্রীকেও ডাকবো, আমাদের সমস্যা তুলে ধরবো। কাঁচামালের দাম বাড়লে দিন শেষে শিল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
এসএম/একিউএফ
What's Your Reaction?