নতুন প্রজন্ম জানে না শহীদ আসাদের ইতিহাস!
আজ শহীদ আসাদ দিবস। ১৯৬৯ সালের এই দিনে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে স্বৈরশাসন বিরোধী বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন নরসিংদীর কৃতি সন্তান আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদ। শোষণমুক্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র আসাদের রাজনৈতিক দর্শন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও পাঠ্য পুস্তকে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের নায়ক শহীদ আসাদের ইতিহাস তুলে না ধরায় তার চিন্তা চেতনা সম্পর্কে কিছুই জানে না নতুন প্রজন্ম। ১৯৪২ সালের ১০ জুন নরসিংদীর হাতিরদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আসাদ। পুরো নাম আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তার পৈতৃক নিবাস নরসিংদীর শিবপুরের ধানুয়া গ্রামে। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র আসাদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা ঢাকা মেডিক্যালে ছুটে আসেন। তার হত্যার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া মিছিলে যোগ দেন অসংখ্য সাধারণ মানুষ। আসাদ হত্যার প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি তিনদিনের শোক পালন শেষে ২৪ জানুয়ারি হরতালের ডাক দেয়। সেইদিনের মিছিলে আবারও পুলিশ গুলি চালালে শুরু হওয়া গণ আন্দোলনে
আজ শহীদ আসাদ দিবস। ১৯৬৯ সালের এই দিনে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে স্বৈরশাসন বিরোধী বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন নরসিংদীর কৃতি সন্তান আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদ। শোষণমুক্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র আসাদের রাজনৈতিক দর্শন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও পাঠ্য পুস্তকে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের নায়ক শহীদ আসাদের ইতিহাস তুলে না ধরায় তার চিন্তা চেতনা সম্পর্কে কিছুই জানে না নতুন প্রজন্ম।
১৯৪২ সালের ১০ জুন নরসিংদীর হাতিরদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আসাদ। পুরো নাম আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তার পৈতৃক নিবাস নরসিংদীর শিবপুরের ধানুয়া গ্রামে। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র আসাদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা ঢাকা মেডিক্যালে ছুটে আসেন। তার হত্যার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া মিছিলে যোগ দেন অসংখ্য সাধারণ মানুষ। আসাদ হত্যার প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি তিনদিনের শোক পালন শেষে ২৪ জানুয়ারি হরতালের ডাক দেয়। সেইদিনের মিছিলে আবারও পুলিশ গুলি চালালে শুরু হওয়া গণ আন্দোলনে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
গণঅভ্যুত্থানের নায়ক আসাদকে স্মরণীয় করে রাখতে তার জন্মভূমি নরসিংদীর শিবপুরে প্রতিষ্ঠা করা হয় সরকারি শহীদ আসাদ কলেজ, শহীদ আসাদ কলেজিয়েট গার্লস হাইস্কুল, শহীদ আসাদ সড়কসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু খোদ এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ নতুন প্রজন্ম শহীদ আসাদ ও তার রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে কিছুই জানে না। প্রতি বছর শিবপুরের ধানুয়া গ্রামে শহীদ আসাদের সমাধিস্থলে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন রাজনৈতিকরা।
পাঠ্যপুস্তকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ আসাদের ইতিহাস তুলে না ধরায় আসাদ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা নেই বর্তমান প্রজন্মের। শহীদ আসাদ কলেজিয়েট গার্লস হাইস্কুলের অষ্টম ও নবম শ্রেণির একাধিক শিক্ষার্থীর কাছে শহীদ আসাদ সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা জানায়, আসাদ ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের নায়ক ছিলেন, তবে সে বিস্তারিত কিছুই জানাতে পারেনি। আবার কেউ জানায় মুক্তিযোদ্ধা, কেউ বলেছে ভাষা সৈনিক, কেউ বলেছে ছাত্রনেতা ইত্যাদি ভুল তথ্য। একইভাবে শহীদ আসাদ সম্পর্কে জানাতে পারেনি সরকারি শহীদ আসাদ কলেজের অনেক শিক্ষার্থীরাও। তাদের অভিযোগ বই পুস্তকে এ সম্পর্কে কিছুই বলা নেই।
শহীদ আসাদ কলেজিয়েট গার্লস হাইস্কুলের অধ্যক্ষ আবুল হারিছ রিকাবদার বলেন, ‘৬৯ এর গণ আন্দোলনের সূত্র ধরেই ১৯৭১ এর স্বাধীনতাযুদ্ধের শুরু এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। কিন্তু পাঠ্যপুস্তকে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার ব্যর্থতার কারণেই নতুন প্রজন্ম ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক শহীদ আসাদের ইতিহাস জানতে পারছে না।’
শিবপুর সরকারি শহীদ আসাদ কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সেলিনা বেগম বলেন, ‘শুধু শহীদ আসাদ দিবস এলেই তার সম্পর্কে আলোচনা করে ঘটা করে দিবসটি পালন করা হয়। বই পুস্তক কিংবা অন্য কোথাও এ বিষয়ে কোনো উল্লেখ বা আলোচনা থাকে না বিধায় আজকের প্রজন্ম আসাদের বীরত্বগাথা ইতিহাস জানে না। নরসিংদীর কৃতি সন্তান হিসেবে আসাদ সম্পর্কে না জানা আমাদের লজ্জিত করে। আসাদ কলেজের শিক্ষার্থীরা যাতে আসাদ সম্পর্কে জানতে পারে আমি আমার শিক্ষকদের মাধ্যমে সে বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।’
শিবপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আরিফুল ইসলাম মৃধা বলেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করতে ৬৯ এর গণআন্দোলন তথা গণঅভ্যুত্থানের নায়ক আসাদের ভূমিকা ছিল এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। শহীদ আসাদের রাজনৈতিক দর্শন ও তার চিন্তা চেতনাকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে পাঠ্যপুস্তকে শহীদ আসাদ সম্পর্কে তুলে ধরতে রাস্ট্রকে পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।’
শহীদ আসাদ (১৯৪২-১৯৬৯) উনিশশত ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এর শহীদ ছাত্রনেতা। আসাদুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তিনি ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম কমিটির ১১ দফা আদায়ের মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তার মৃত্যু ঊনসত্তরের ছাত্র-গণআন্দোলনের গোটা অবয়বকেই পাল্টে দেয় এবং তা আইয়ুব খানের শাসন ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়।
আসাদ ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ)-এর ঢাকা হল শাখার সভাপতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান সংগঠক। সতেরোই জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার সমাবেশ থেকে এগারো দফার বাস্তবায়ন এবং ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ ও ই.পি.আর বাহিনী কর্তৃক নির্যাতন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্রতা লঙ্ঘনের প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি ২০ জানুয়ারি গোটা পূর্ব পাকিস্তানের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালনের আহবান জানিয়েছিল। এ ধর্মঘট মোকাবিলার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে জারি করা হয় ১৪৪ ধারা।
তথাপি বিভিন্ন কলেজের ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে সমবেত হয় এবং বেলা ১২টার দিকে বটতলায় এক সংক্ষিপ্ত সভা শেষে প্রায় দশহাজার ছাত্রের একটি বিশাল মিছিল ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে রাজপথে পা বাড়ায়। মিছিলটি চাঁনখার পুলের নিকটে তখনকার পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে এর ওপর পুলিশ হামলা চালায়। প্রায় ঘণ্টাখানেক সংঘর্ষ চলার পর আসাদসহ কয়েকজন ছাত্রনেতা মিছিলটিকে ঢাকা হলের পাশ দিয়ে শহরের কেন্দ্রস্থলের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে একজন পুলিশ কর্মকর্তা খুব কাছ থেকে রিভলবারের গুলি ছুঁড়ে আসাদকে হত্যা করে। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী মেডিক্যাল কলেজের দিকে ছুটে আসে। বেলা তিনটায় কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের হয় একটি বিরাট শোক মিছিল।
নারীদের নেতৃত্বে এ মিছিল অগ্রসর হতে থাকলে সাধারণ জনগণও এতে যোগ দেয়। আসাদের মুত্যুর প্রতিক্রিয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বের হওয়া প্রায় দুমাইল দীর্ঘ মিছিলটি শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে শহীদ মিনারে এসে শেষ হয়। আসাদের মৃত্যুতে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি গোটা পূর্ব পাকিস্তানে তিনদিনব্যাপী শোক ঘোষণা করে। এছাড়া কমিটি ঢাকা শহরে হরতাল এবং পরবর্তী চার দিন প্রতিবাদ মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। ২৪ তারিখে হরতালে গুলি চললে ঢাকার পরিস্থিতি গভর্নর মোনেম খানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সরকারের দমন নীতি জনতাকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি এবং শেষাবধি প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের পতন ঘটে।
মূলত আসাদের মৃত্যুতে ঊনসত্তরের গণআন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। অনেক জায়গায় জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আইয়ুবের নামফলক নামিয়ে আসাদের নাম উৎকীর্ণ করে। এভাবে ‘আইয়ুব গেট’ হয়ে যায় ‘আসাদ গেট’, ‘আইয়ুব এভিনিউ’ নামান্তরিত হয়ে হয় ‘আসাদ এভিনিউ’। তখন থেকে আসাদের নাম হয়ে ওঠে নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মূর্ত প্রতীক। আসাদ কেবল একজন ছাত্র সংগঠকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ঐকান্তিক কৃষক সংগঠকও। নরসিংদীর শিবপুর-হাতিরদিয়া-মনোহরদি ও পাশ্ববর্তী এলাকাসমূহে তিনি একটি শক্তিশালী কৃষক সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। অত্যন্ত সংগ্রামী মানসিকতার অধিকারী আসাদ ‘জনগণতন্ত্র’কে মনে করতেন মুক্তির মন্ত্র।
আসাদ মনে করতেন সাধারণ নিপীড়িত অসহায় মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন করতে হলে সুবিশাল জনশক্তিকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। সেজন্য দেশে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত বলে তিনি দাবি করতেন। এজন্য তিনি ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের নিয়ে শিবপুরে একটি নৈশ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। শুধু ছাত্র ও কৃষক সংগঠনে অথবা গণশিক্ষা কার্যক্রমের মধ্যেই আসাদের রাজনৈতিক চিন্তা ও তৎপরতা সীমিত ছিল না। তিনি উন্নত রাজনৈতিকে আদর্শ বহনকারী একটি পার্টির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন।
১৯৬৮ সালে লিখিত তার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে সর্বহারা শ্রেণির রাজনীতি পরিচালনার জন্য সংক্ষিপ্তভাবে স্টাডি সার্কেল গঠন করার কথা লেখা আছে। তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলার সমন্বয় কমিটির একজন অগ্রণী সংগঠক, যারা ১৯৬৮ সাল থেকেই সার্বভৌম ও শ্রেণিশোষণমুক্ত একটি দেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছিলেন। শোষিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামে আসাদের এই চেতনা জাগরুক হয়ে থাকবে চিরকাল। শহীদ আসাদ দিবসে আসাদসহ ঊনসত্তর, একাত্তর ও চব্বিশের শহীদদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
আরও পড়ুন
ব্লু ইকোনমি হতে পারে দেশের সম্ভাবনার নতুন দ্বার
বরফের ঘুমে লাল চিংড়ি: বঙ্গোপসাগর থেকে নীরব বিদেশযাত্রা
কেএসকে/জেআইএম
What's Your Reaction?