নদীভাঙনে ছোট হচ্ছে সোনাগাজী-দাগনভূঞা উপজেলা

নদী কেড়ে নিচ্ছে জনপদ, আর মানচিত্র থেকে একটু একটু করে মুছে যাচ্ছে বসতভিটার চিহ্ন। ফেনীর সোনাগাজী ও দাগনভূঞা উপজেলায় ছোট ফেনী নদীর অববাহিকায় এখন কান্নার রোল। চলতি বর্ষায় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে টানা ভারী বর্ষণ আর নদীর করাল গ্রাসে দিশাহারা হাজারো মানুষ। তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্ন, ফসলি জমি আর মাথা গোঁজার ঠাঁই চোখের পলকে চলে যাচ্ছে নদীর পেটে। নদী শাসনের স্থায়ী কোনো উদ্যোগ না থাকায় বদলে যাচ্ছে ফেনীর ভৌগোলিক মানচিত্র। ভৌগোলিক তথ্য অনুযায়ী, ফেনী জেলার উপকূলীয় উপজেলা সোনাগাজীর মোট আয়তন প্রায় ২৮৪.৮৯ বর্গ কিলোমিটার ও দাগনভূঞা উপজেলার আয়তন প্রায় ১৪১.৭১ বর্গ কিলোমিটার। তবে স্থানীয়দের দাবি, নদীভাঙনের ফলে এই দুই উপজেলার মূল ভূখণ্ডের আয়তন প্রতি বছরই সংকুচিত হচ্ছে। বিগত ২০২৪ সালের আগস্টের প্রলয়ংকরী বন্যার পর থেকে গত দুই বছরে ভাঙনের তীব্রতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গত দুই বছরে প্রায় ১০ একর ফসলি জমি, রাস্তাঘাট এবং অসংখ্য বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের মুখে একের পর এক গ্রাম সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, নদীভাঙনের কবলে সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে জেলার সোনাগাজী ও দাগনভূঞা উপজেলা। বিশ

নদীভাঙনে ছোট হচ্ছে সোনাগাজী-দাগনভূঞা উপজেলা

নদী কেড়ে নিচ্ছে জনপদ, আর মানচিত্র থেকে একটু একটু করে মুছে যাচ্ছে বসতভিটার চিহ্ন। ফেনীর সোনাগাজী ও দাগনভূঞা উপজেলায় ছোট ফেনী নদীর অববাহিকায় এখন কান্নার রোল। চলতি বর্ষায় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে টানা ভারী বর্ষণ আর নদীর করাল গ্রাসে দিশাহারা হাজারো মানুষ। তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্ন, ফসলি জমি আর মাথা গোঁজার ঠাঁই চোখের পলকে চলে যাচ্ছে নদীর পেটে। নদী শাসনের স্থায়ী কোনো উদ্যোগ না থাকায় বদলে যাচ্ছে ফেনীর ভৌগোলিক মানচিত্র।

ভৌগোলিক তথ্য অনুযায়ী, ফেনী জেলার উপকূলীয় উপজেলা সোনাগাজীর মোট আয়তন প্রায় ২৮৪.৮৯ বর্গ কিলোমিটার ও দাগনভূঞা উপজেলার আয়তন প্রায় ১৪১.৭১ বর্গ কিলোমিটার। তবে স্থানীয়দের দাবি, নদীভাঙনের ফলে এই দুই উপজেলার মূল ভূখণ্ডের আয়তন প্রতি বছরই সংকুচিত হচ্ছে।

বিগত ২০২৪ সালের আগস্টের প্রলয়ংকরী বন্যার পর থেকে গত দুই বছরে ভাঙনের তীব্রতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গত দুই বছরে প্রায় ১০ একর ফসলি জমি, রাস্তাঘাট এবং অসংখ্য বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

নদীভাঙনে ছোট হচ্ছে সোনাগাজী-দাগনভূঞা উপজেলা

ভাঙনের মুখে একের পর এক গ্রাম

সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, নদীভাঙনের কবলে সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে জেলার সোনাগাজী ও দাগনভূঞা উপজেলা। বিশেষ করে সোনাগাজী উপজেলার চর দরবেশ, চর মজলিশপুর ও চরচান্দিয়া এবং দাগনভুঞা উপজেলার মাতুভূঞা ও দাগনভূঞা সদর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীনের উপক্রম হয়েছে। গত কয়েক মাসে প্রবল ভাঙনে শত শত পরিবার সহায়সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে হাজার হাজার পরিবার ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।

‘হঠাৎ ভাঙনে পরিবার নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। চোখের সামনে ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যাচ্ছে, আমরা কিছুই করতে পারছি না।’

অব্যাহত এই ভাঙনে এরই মধ্যে ছোট হয়ে আসছে তিন দিক থেকে নদীবেষ্টিত সোনাগাজী উপজেলা। ছোট ফেনী নদীর তীরবর্তী এ উপজেলার চর মজলিশপুর ইউনিয়নের চর বদরপুর, কুঠিরহাট, কাটাখিলা, কালী মন্দির, চর দরবেশ ইউনিয়নের দক্ষিণ চর দরবেশ, আদর্শ গ্রাম, পশ্চিম চর দরবেশ, কাজীরহাট স্লুইস গেট, আউরারখীল জেলেপাড়া, আলামপুর, তেল্লারঘাট, ইতালি মার্কেট, ধনীপাড়া, চর চান্দিয়ার সাহেবের ঘাট, মোল্লার চর, পশ্চিম চর চান্দিয়া, বোগদাদিয়ার আলমপুর, আউরারখিল এবং আমিরাবাদ ইউনিয়নের পূর্ব সোনাপুর, বাদামতলী ও গুচ্ছগ্রামসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে।

একই চিত্র দাগনভূঞা উপজেলাতেও। এখানকার মাতুভূঞা ইউপির বাগেরহাট, রামানন্দপুর, সালাম নগর, জেলেপাড়া, তালতলী ও করিমপুরসহ বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙনের তীব্র আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বাসিন্দারা।

বাস্তুহারাদের আর্তনাদ

হঠাৎ শুরু হওয়া নদীভাঙনে পরিবার নিয়ে সব হারিয়েছেন চর চান্দিয়ার বাসিন্দা শফি উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ ভাঙনে পরিবার নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। চোখের সামনে ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যাচ্ছে, আমরা কিছুই করতে পারছি না।’

‘চর মজলিশপুরের চান্দলা, বিষ্ণুপুর, গোপালগাঁওসহ বহু এলাকার ঘরবাড়িতে ফাটল ধরেছে। দ্রুত নদী শাসন ও স্থায়ী বাঁধ না দিলে পুরো এলাকা মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।’

নদী ভাঙনের শিকার চর সাহাভিকারীর বাসিন্দা শহীদ উদ্দিন জানান, ১০ বছর আগে একবার বাড়ি হারিয়েছেন তিনি। এরপর অন্যের জমিতে কোনোমতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের বন্যার পর থেকে নদীতে প্রবল স্রোত ও দু-তিন কিলোমিটার জুড়ে ভাঙন চলায় এবার সেই আশ্রয়টিও নদী কেড়ে নিয়েছে। তার আক্ষেপ, ‘আমাদের গ্রামের চার ভাগের দুই ভাগই এখন নদীগর্ভে শেষ।’

নদীভাঙনে ছোট হচ্ছে সোনাগাজী-দাগনভূঞা উপজেলা

নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ, বাড়ছে ক্ষোভ

চর দরবেশ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ জানান, মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তার নিজেরই ৪০ থেকে ৫০ জন আত্মীয় সর্বস্ব হারিয়েছেন। ভাঙন ঠেকাতে এলাকাবাসী নিজেদের উদ্যোগে বালুর বস্তা বা বাঁশের খাঁচা তৈরি করলেও নদীর তীব্র স্রোতের সামনে তা টিকছে না।

ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ইলিয়াস সুমন জানান, চর মজলিশপুরের চান্দলা, বিষ্ণুপুর, গোপালগাঁওসহ বহু এলাকার ঘরবাড়িতে ফাটল ধরেছে। দ্রুত নদী শাসন ও স্থায়ী বাঁধ না দিলে পুরো এলাকা মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।

মুছাপুর রেগুলেটর ধ্বংসের মাশুল

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই সংকটের মূলে রয়েছে ২০২৪ সালের ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় ধসে যাওয়া মুছাপুর রেগুলেটর। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই রেগুলেটরটি বিলীন হওয়ার পর থেকেই নদী নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। এখন জোয়ারের সময় ৮ থেকে ১০ ফুট উচ্চতার লবণাক্ত পানি সরাসরি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে, আর ভাটার সময় তীব্র স্রোত নদীর তীর ধসিয়ে দিচ্ছে। এত বড় একটি সুরক্ষাকবচ ধ্বংস হওয়ার পরও তা পুনর্নির্মাণে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় ক্ষুব্ধ নদীর পাড়ের মানুষ।

‘বি-স্ট্রং’ প্রকল্প

অস্থায়ীভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কিছু স্থানে বালুর বস্তা ফেললেও তাকে স্রেফ ‘জোড়াতালি’ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। স্থায়ী সমাধানের দাবিতে এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগীরা। তারা জিওব্যাগ ডাম্পিং ও ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জানান, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নদীর তীর প্রতিরক্ষা কাজ ও ভাঙন ঠেকাতে ‘বি-স্ট্রং’ নামের একটি প্রকল্পে এরইমধ্যে দুই প্যাকেজে ৮০ কোটি টাকা অনুমোদিত হয়েছে এবং এর দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হলেই ভাঙন কবলিত এলাকায় স্থায়ী কাজ শুরু হবে।

নদীভাঙনে ছোট হচ্ছে সোনাগাজী-দাগনভূঞা উপজেলা

এছাড়া বহুল আলোচিত ও স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে থাকা মুছাপুর রেগুলেটর স্থাপন প্রকল্পটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। মুছাপুর রেগুলেটর পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন হলে এই অঞ্চলের নদীভাঙন অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

নদীভাঙন পরিস্থিতি ও ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি পুনর্বাসনের বিষয়ে সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার রিগ্যান চাকমা ও দাগনভূঞা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি সাহায্য, টিআর-কাবিখা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করছে।

ফেনীর ভৌগোলিক মানচিত্র রক্ষা ও ভাঙন কবলিত মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক জানান, ভাঙন রোধে স্থায়ী পদক্ষেপের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্প তৈরি করেছে। প্রকল্পটি টেন্ডার পর্যায়ে রয়েছে।

তবে সরকারি আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শেষ হয়ে এই স্থায়ী বাঁধ কখন দৃশ্যমান হবে, আর কতদিন এই মানুষগুলোকে আতঙ্কে রাত কাটাতে হবে সেই উত্তর জানা নেই নদীপাড়ের নিঃস্ব মানুষের।

এফএ/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow