পাঁচজন ফজলু: একটা মানুষই কয়েকটা মানুষ

আনিফ রুবেদ পৃথিবীতে যতগুলো মানুষ আছে; ততগুলো নাম-শব্দ নেই। ফলে একটা নামের ভাগেই পড়ে যায় লাখ লাখ মানুষ; একটু হয়তো আকার-একারের ফারাক বা উপনামের কিছুটা এদিক-ওদিক। আবার একটা নামের জন্য কয়েক লাখ মানুষ থাকলেও একই নামের মানুষগুলো একইরকম তো হয় না বরং একটাই মানুষ কয়েকরকম হয়; একটা মানুষই কয়েকটা মানুষ। সুতরাং কমপক্ষে হলেও যত কোটি মানুষ আছে, তার কয়েকগুণ বেশি মানস রয়েছে পৃথিবীতে। ‌‘পাঁচজন ফজলু’ পড়লাম। এটি কথাকার মুম রহমানের একটি উপন্যাস। এখানে পাঁচজন ফজলু রয়েছে, তাদের পাঁচরকম পেশা, পাঁচরকম নেশা, পাঁচরকম বয়স। এই পাঁচ ফজলুর একজন পেশাদার খুনি, একজন ডাক্তার, একজন ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেনটেটিভ, একজন গোরখোদক, একজন রিকশাচালক। এক ফজলু খুনি কিন্তু প্রেমিক; সূচি নামের এক তরুণীকে খুব ভালোবাসে। ডাক্তার ফজলু অর্থপিশাচ কিন্তু ধর্মাচারি; নামাজ বাদ দেয় না এক ওয়াক্তও। ওষুধ কোম্পানির চাকুরে ফজলু নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে সারাদেশের বিভিন্ন জেলার মেয়েদের সাথে প্রেম করে, সেক্স করে, ফোনসেক্স করে; তার স্বপ্ন তার ছোটভাইকে ডাক্তার বানাবে আর তাকে একটা ক্লিনিক বানিয়ে দেবে। সেই ক্লিনিকের মালিক হবে সে নিজে আর প্রচুর সেক্স করবে

পাঁচজন ফজলু: একটা মানুষই কয়েকটা মানুষ

আনিফ রুবেদ

পৃথিবীতে যতগুলো মানুষ আছে; ততগুলো নাম-শব্দ নেই। ফলে একটা নামের ভাগেই পড়ে যায় লাখ লাখ মানুষ; একটু হয়তো আকার-একারের ফারাক বা উপনামের কিছুটা এদিক-ওদিক। আবার একটা নামের জন্য কয়েক লাখ মানুষ থাকলেও একই নামের মানুষগুলো একইরকম তো হয় না বরং একটাই মানুষ কয়েকরকম হয়; একটা মানুষই কয়েকটা মানুষ। সুতরাং কমপক্ষে হলেও যত কোটি মানুষ আছে, তার কয়েকগুণ বেশি মানস রয়েছে পৃথিবীতে।

‌‘পাঁচজন ফজলু’ পড়লাম। এটি কথাকার মুম রহমানের একটি উপন্যাস। এখানে পাঁচজন ফজলু রয়েছে, তাদের পাঁচরকম পেশা, পাঁচরকম নেশা, পাঁচরকম বয়স। এই পাঁচ ফজলুর একজন পেশাদার খুনি, একজন ডাক্তার, একজন ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেনটেটিভ, একজন গোরখোদক, একজন রিকশাচালক।

এক ফজলু খুনি কিন্তু প্রেমিক; সূচি নামের এক তরুণীকে খুব ভালোবাসে। ডাক্তার ফজলু অর্থপিশাচ কিন্তু ধর্মাচারি; নামাজ বাদ দেয় না এক ওয়াক্তও। ওষুধ কোম্পানির চাকুরে ফজলু নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে সারাদেশের বিভিন্ন জেলার মেয়েদের সাথে প্রেম করে, সেক্স করে, ফোনসেক্স করে; তার স্বপ্ন তার ছোটভাইকে ডাক্তার বানাবে আর তাকে একটা ক্লিনিক বানিয়ে দেবে। সেই ক্লিনিকের মালিক হবে সে নিজে আর প্রচুর সেক্স করবে। গোরখোদক ফজলুর জন্ম পরিচয় নিয়ে মনে ক্ষোভ আছে, তার জীবনের লক্ষ্য সুন্দর করে কবর খোঁড়া আর তার জন্মদাতা পিতাকে খুন করা। রিকশাচালক ফজলু একা ঢাকায় থাকে; তার তিন মেয়ে, এক ছেলে আর বউ গ্রামের বাড়িতে থাকে; ফজলুর স্বপ্ন, কিছু টাকা জমিয়ে গ্রামে গিয়ে গ্রামের বাজারে খিচুড়ির দোকান দেওয়া।

উপন্যাসে সব ফজলুর সাথে সব ফজলু কোনো না কোনোভাবে জড়ায় কিন্তু কেউ জড়ায় খুনি ফজলুর মরণের সময় বা আগে বা মরণের পরে। হ্যাঁ, খুনি ফজলু শেষে মারা যাবে লিভারের সমস্যায়। মুম রহমানের বয়ান ভঙ্গি খুব সরস। খুব সহজেই কাহিনির মাংস-মজ্জা-হাড়ের ঠিকানা বের করা যায় এবং নিখাদ এক মধু পানের আনন্দ পাওয়া যায়। কাহিনি বলার কৌশলটিও খুব চমৎকার আর নতুন বলে মনে হয়েছে আমার কাছে।

পৃথিবীতে যতগুলো মানুষ রয়েছে, তাদের আমরা যেভাবেই চিনি না কেন; সেসব মানুষের জীবনে এমন একটা ইতিহাস রয়েছে, যা তাকে বর্তমান জীবনের ভেতর এনে ফেলেছে। সেই ইতিহাস খুবই করুণ, খুবই মর্মস্পর্শী। মুম রহমান উপন্যাসটিতে এমন বয়ান কৌশল এবং চরিত্র নির্মাণ কৌশল ব্যবহার করেছেন, যাতে ওই মানুষটির সেই মর্মটা দেখা যায়। এতে পাঠকের হৃদয় খুনির জন্যও আর্দ্র হয়ে ওঠে। তাকে সফল হওয়া দেখতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, খুন করেও সে যেন ধরা না পড়ে।

সরাসরি উপন্যাসের ভেতর মুম রহমানও একজন চরিত্র; ব্যাপারটা চমৎকারিত্ব তৈরি করে। ঔপন্যাসিক মুম রহমানের উপন্যাসের মুম রহমান বলছেন, ‘এই বাজারে টাকা খরচ করে আপনারা অধম মুমের বই কিনেছেন, সময় খরচ করে পড়ছেন, তাই আপনাদের আরাম-আয়েশ দেওয়া আমার দায়িত্ব, কর্তব্য।’ পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে, মুম রহমান সেই ‘আরাম-আয়েশ’ আমাদের দিতে পেরেছেন।

ভালোবাসা ঔপন্যাসিক মুম রহমানের জন্য। এমন স্বচ্ছ আর সচ্ছল উপন্যাস আরও বেরিয়ে আসুক তার হাত থেকে।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow