পুণ্ড্রনগরের প্রবাদ-প্রবচন এবং লৌকিক ছড়া: প্রথম পর্ব

খৈয়াম কাদের প্রবাদ-প্রবচন এবং ছড়া সাহিত্য-স্থাপত্যের প্রত্নশীলা। এই শীলাকে আবর্তন করেই নানাবর্ণে লতায়িত এবং সম্প্রসারিত হয়েছে সাহিত্যের বিস্তীর্ণ জগত। ইতিহাসখ্যাত প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন বা পৌণ্ড্রবর্ধন রাজ্যের প্রশাসনিক কেন্দ্রস্থল প্রত্ন-ঐতিহ্যের মহাস্থানগড় তথা আধুনিক বগুড়া জেলাসহ পুণ্ড্রের অন্যান্য অঞ্চলগুলোতেও সাহিত্য-সংস্কৃতির আকরিক অধ্যায় হিসেবে বহমান রয়েছে ‘প্রবাদ-প্রবচন এবং আধুনিক ও লৌকিক ছড়া’। বক্ষমান লেখাটি বগুড়া ও পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে প্রচলিত ও চর্চিত প্রবাদ-প্রবচন এবং আধুনিক ও লৌকিক ছড়া বা লোকছড়া সম্পর্কিত একটি অপাদ্ধতিক ও অসান্দর্ভিক তথ্য এবং দৃকচিত্র উপস্থাপনার মননগত প্রয়াস। প্রবাদ সুদূর অতীতে মানুষ প্রথম যখন নিজের মানবীয় অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়, কথা বলা শেখে, সমাজবদ্ধ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয় এবং একে-অপরের সঙ্গে ভাব বিনিময়ের বাঙকৌশল রপ্ত করে; অর্থাৎ আবেগ, চিন্তা, বুদ্ধি ও জ্ঞানের পথে অগ্রসর হতে থাকে; বলা চলে, তখন থেকেই মানবসমাজে প্রবাদ-প্রবচন ও ছড়ার প্রচলন শুরু হয়। ফলে আদিকাল থেকেই পৃথিবীর সকল ভূখণ্ডে সকল জাতিগোষ্ঠীর মাঝে প্রবাদ-প্রবচন ও ছড়াকেন্দ্রিক বাচ্য প্রয়োগের স

পুণ্ড্রনগরের প্রবাদ-প্রবচন এবং লৌকিক ছড়া: প্রথম পর্ব

খৈয়াম কাদের

প্রবাদ-প্রবচন এবং ছড়া সাহিত্য-স্থাপত্যের প্রত্নশীলা। এই শীলাকে আবর্তন করেই নানাবর্ণে লতায়িত এবং সম্প্রসারিত হয়েছে সাহিত্যের বিস্তীর্ণ জগত। ইতিহাসখ্যাত প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন বা পৌণ্ড্রবর্ধন রাজ্যের প্রশাসনিক কেন্দ্রস্থল প্রত্ন-ঐতিহ্যের মহাস্থানগড় তথা আধুনিক বগুড়া জেলাসহ পুণ্ড্রের অন্যান্য অঞ্চলগুলোতেও সাহিত্য-সংস্কৃতির আকরিক অধ্যায় হিসেবে বহমান রয়েছে ‘প্রবাদ-প্রবচন এবং আধুনিক ও লৌকিক ছড়া’। বক্ষমান লেখাটি বগুড়া ও পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে প্রচলিত ও চর্চিত প্রবাদ-প্রবচন এবং আধুনিক ও লৌকিক ছড়া বা লোকছড়া সম্পর্কিত একটি অপাদ্ধতিক ও অসান্দর্ভিক তথ্য এবং দৃকচিত্র উপস্থাপনার মননগত প্রয়াস।

প্রবাদ

সুদূর অতীতে মানুষ প্রথম যখন নিজের মানবীয় অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়, কথা বলা শেখে, সমাজবদ্ধ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয় এবং একে-অপরের সঙ্গে ভাব বিনিময়ের বাঙকৌশল রপ্ত করে; অর্থাৎ আবেগ, চিন্তা, বুদ্ধি ও জ্ঞানের পথে অগ্রসর হতে থাকে; বলা চলে, তখন থেকেই মানবসমাজে প্রবাদ-প্রবচন ও ছড়ার প্রচলন শুরু হয়। ফলে আদিকাল থেকেই পৃথিবীর সকল ভূখণ্ডে সকল জাতিগোষ্ঠীর মাঝে প্রবাদ-প্রবচন ও ছড়াকেন্দ্রিক বাচ্য প্রয়োগের সংস্কৃতি চালু হয়। মানব-সভ্যতার এই প্রত্ন-স্তরিক বিকাশ-সূত্রে বলা যায়—প্রবাদ-প্রবচন মূলত প্রাকৃত তথা লৌকিক-জীবনের সামষ্টিক অভিজ্ঞতা-উপলব্ধির ফলিত উচ্চারণ; সমাজভুক্ত সচেতন মানুষের বাস্তব-প্রত্যক্ষণ সঞ্জাত অভিব্যক্তির সরল ও সংক্ষিপ্ত প্রকাশ। প্রবাদ-প্রবচনের শব্দবন্ধে অন্য যে কোনো কথার চাইতে অধিক জোর ও ধ্বনিগত দ্যোতনা থাকে। এ কারণে উক্তিমূলক বচনশিল্পটি খুব সহজেই মানুষের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়।

প্রবাদ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ proverb যা ল্যাটিন শব্দ proverbium থেকে এসেছে। এ ছাড়া maxim, adage, parole, gnome শব্দগুলোও proverb-এর বিকল্প শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বাংলায় প্রবাদ শব্দটির উৎপত্তি ‘প্রকৃষ্ট বাদ’ কথাবন্ধ বা অভিধা থেকে। বাদ শব্দটির অর্থ কথা, উক্তি বা ধারণা, আর প্রকৃষ্টের অর্থ উৎকৃষ্ট, শ্রেষ্ঠ, সেরা বা প্রশস্ত। সুতরাং ‘প্রকৃষ্ট বাদ’ শব্দবন্ধের অর্থ উৎকৃষ্ট বা শ্রেষ্ঠ বা সেরা উক্তি।
Oxford Advanced Learners Dictionary মোতাবেক প্রবাদ বা Proverb-এর সংজ্ঞা—‘Proverb is a short well-known pithy saying that states a general truth or a piece of advice.’
Chamber’s Dictionary-তে প্রবাদকে বলা হয়েছে—‘A short familiar sentence expressing a supposed truth or moral lesson: a byword, a saying that requires explanation.’
Cambridge Dictionary মোতাবেক—‘A short statement, usually known by many people for a long time, that gives advice, or expresses some common truth.’
প্রবাদের আমেরিকান সংজ্ঞা—‘A proverb is a short sentence that people often quote, because it gives advice, or tells you something about life.’ এবং ‘A short, traditional saying that expresses some obvious truth or familiar experience; adage, maxim.’
প্রবাদের বৃটিশ সংজ্ঞা—‘A short, memorable, and often highly condensed saying embodying, with bold imagery, some commonplace fact or experience.’ এবং ‘A proverb or an adage is a simple, traditional saying that expresses a perceived truth based on common sense or experience.’
প্রবাদের বিবলিক্যাল সংজ্ঞা—‘An enigmatic saying in which a profound truth is cloaked.’ এবং এক্লেসিয়াসটিক্যাল সংজ্ঞা—‘A wise saying or admonition providing guidance.’
সমর পাল রচিত ‘প্রবাদের উৎসসন্ধান’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বাংলা ভাষার খ্যাতিমান লোকসাহিত্য-বিশেষজ্ঞ আশুতোষ ভট্টাচার্য (১৯০৯-১৯৮৪) প্রবাদ সম্পর্কিত একটি স্প্যানিশ উক্তির বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদ করেছেন নিম্নরূপে—
*‘প্রবাদ হলো দীর্ঘ অভিজ্ঞতার একটি সংক্ষিপ্ত অভিব্যক্তি।’
*‘A proverb is a short sentence based on long experience.’ উল্লিখিত সংজ্ঞাগুলোর সমন্বিত ভাব-সাধারণীর আলোকে বলা যায়, প্রবাদ হলো মানুষের জৈবনিক অভিজ্ঞতা-প্রসূত উপলব্ধি ও অভিব্যক্তির সাত্যিক ও জ্ঞনার্দ্রিক, অথচ সরল ও সংক্ষিপ্ত, ভাষিক বচন, যার ভেতরে চিত্র-প্রতীকের দ্যোতনা ও বিদ্রুপাত্মক বিরোধাভাসসমৃদ্ধ উপদেশনার ইঙ্গিত থাকে।

ছড়া

ইংরেজিতে ছড়াকে বলা হয় nonsense rhymes; অর্থাৎ ছড়া হলো হালকা ভাব ও সহজ ভাষার ছন্দকথা, যার ভেতরে মননজাত মনস্বিতা তথা চিন্তার গহনচারীতা থাকবে না। থাকবে সরস আনন্দরসের সহজ প্রবাহন, চিত্তে বিনোদন সঞ্চারী সুবোধ্য, প্রাঞ্জল ও মৃদু শব্দছন্দের সাংগীতিক তরঙ্গ-দোলা। এখানে তত্ত্বকথা, তথ্যবার্তা ও দার্শনিকতার সংকর্ষণ অনাবশ্যক। আর লৌকিক ছড়া বা লোকছড়া বলতে সেই ছড়াকে বোঝানো হয়, যার রচয়িতা, রচনাকাল ও উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে কোনো ঐতিহাসিক ও প্রামাণিক তথ্য পাওয়া যায় না; কিন্তু তা কোনো বিশেষ জনসমাজের বা বৃহত্তর জনসমাজের চিরায়ত সাংস্কৃতিক সম্পদ ও ঐতিহ্যরূপে মানুষের মুখেমুখে চড়ে বেড়ায় এবং মানব-মনকে, বিশেষত শিশু-মনকে অপার আনন্দে আপ্লুত করে।

ছড়া প্রসঙ্গে বিশিষ্ট ছড়া-গবেষক মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী বলেছেন—‘ছড়ার রাজ্যে বুদ্ধি ও বিচারের অধিকার নেই। শিশুদের কাছে বুদ্ধি ও বিচার অপেক্ষা রসের মূল্য বেশি, মস্তিষ্ক অপেক্ষা হৃদয় বড়।’ (কাসিমপুরী, ১৯৬২: ৬)
সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ তাঁর ‘ছড়ায় বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থে (১৯৮৮) ছড়ার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন—‘ছড়া হলো লঘু ভাষায় ও প্রাকৃত ছন্দেবদ্ধ আনুপূর্বিক ভাব ও কাহিনিবিহীন ধ্বনি, রস বা চিত্র-প্রধান সুরাশ্রয়ী সংক্ষিপ্ত সমিল পদ্য।’
ছড়ার সংজ্ঞা সম্পর্কে ওয়াকিল আহমদের মত—‘সমাজের সাধারণ মানুষের আবেগ, কল্পনা, স্বপ্ন, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার কথা পদ্যের ভাষায় ছন্দের বন্ধনে ক্ষুদ্র অবয়বে যে বাঙময় রূপ লাভ করে তা-ই ছড়া।’ (ওয়াকিল আহমদ, ১৯৯৮: ২)
লোকসংস্কৃতিবিদ অধ্যাপক ড. বরুণ কুমার চক্রবর্তী ছড়ার সংজ্ঞায় লিখেছেন—‘ব্যষ্টি রচিত হয়েও স্বল্পায়তন বিশিষ্ট ছন্দবদ্ধ পদসমূহ যা নাকি সমষ্টি কর্তৃক গৃহীত হয়ে সমষ্টির সম্পদরূপে পরিচিতি অর্জন করে, যেখানে ছন্দ, নির্মিতি, কৌশল এবং অসংলগ্ন চিত্রের সমাবেশই মুখ্য, মূলত শিশু ভোলানাথদের মনোরঞ্জনের জন্য যা মুখে মুখে রচিত এবং মূলত নারীকর্তৃক ব্যবহৃত, তাকেই আমরা ছড়া বলে অভিহিত করতে পারি।’ তিনি আরও বলেছেন—‘আদিমযুগে মানুষ যখন ছিল শিশুর মতো সহজ, তখন সৃষ্টি হয়েছিল ছড়া।’
এ ক্ষেত্রে একজন বিদেশি লেখকের অভিমত নিম্নরুপ—‘The popular rhyme is a striking example of poetic primitivity, going back in its construction and psychological essence almost to the primitive archaic times—’.
লোকসংস্কৃতি অভিধান ‘Standard Dictionary of Folklore Mythology and Legend’-এ উপস্থাপিত Bloomfield-এর অভিমত হলো, ছড়া মূলত—‘attract the notice of children and children-like man.’
লোকশ্রুতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মযহারুল ইসলাম মনে করেন—‘ছন্দ, গান ও সুরের প্রতি মানুষের আকর্ষণ সহজাত বলেই তা আদিকাল থেকেই ভাষার মাধ্যমে অভিব্যক্তি খুঁজেছে। ছড়া এই আকর্ষণের ফসল। শিশুসন্তানকে ঘুম পাড়ানোর জন্য মা যখন ছন্দে ছন্দে সহজ-সরল বাক্যের ক্ষুদ্র মালা গাঁথেন, তা ছড়া হয়—। কোন কোন সময় ছড়ার ছন্দও বাক্যে বিন্যস্ত হয় কেবল মিল দিয়ে বক্তব্য প্রকাশের জন্য, অর্থ খুঁজতে গেলে তা অর্থহীন মনে হতে পারে—।’
ছড়া সম্পর্কে বাঙালি-মননের বিশ্ব-স্মারক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত—‘ছড়াকে আমি মেঘের সহিত তুলনা করিয়াছি। উভয়ই পরিবর্তনশীল, বিবিধ বর্ণে রঞ্জিত, বায়ুস্রোতে যদৃচ্ছাভাসমান। দেখিয়া মনে হয় নিরর্থক। ছড়াও কলা-বিচারে শাস্ত্রের বাহির, মেঘ-বিজ্ঞানও শাস্ত্র-নিয়মের মধ্যে ভালো করিয়া ধরা দেয় নাই। অথচ জড়জগতে এবং মানব-জগতে এই দুই উচ্ছৃঙ্খল অদ্ভূত পদার্থ চিরকাল মহৎ উদ্দেশ্য সাধন করিয়া আসিতেছে। মেঘ বারিধারায় নামিয়া আসিয়া শিশুশস্যকে প্রাণদান করিতেছে এবং ছড়াগুলিও স্নেহরসে বিগলিত হইয়া কল্পনাবৃষ্টিতে শিশুহৃদয়কে উর্বর করিয়া তুলিতেছে। লঘুকায় বন্ধনহীন মেঘ আপন লঘুত্ব এবং বন্ধনহীনতা গুণেই জগদ্ব্যাপী হিতসাধনে স্বভাবতই উপযোগী হইয়া উঠিয়াছে, এবং ছড়াগুলিও ভাবহীনতা, অর্থবন্ধশূন্যতা এবং বৈচিত্র্যবশত চিরকাল ধরিয়া শিশুদের মনোরঞ্জন করিয়া আসিতেছে।’

কিন্তু কালধারার নানাকৌণিক অভিঘাতে ছড়া এখন সেই শিশুতোষণী বা শিশুর মনোরঞ্জনী লঘু ছন্দদ্যোতনার ভাব ও ভঙ্গিসারল্যের লৌকিক স্তরে স্থিত নেই। সে এখন বোধিস্বাত্তিক শিল্পনৈপুণ্যের সফিস্টিক স্তরে উন্নীত হয়েছে। গঠনরীতি, বিষয়বস্তু এবং কারু-নন্দনের দিক থেকে ছড়া এখন রীতিমতো আধুনিক শিল্প। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মতাত্ত্বিক, জৈবজাগতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক—সব ধরনের বিষয় নিয়েই রচিত হচ্ছে ছড়া। পাশাপাশি এ কথাও সত্য যে, এখনো ছড়াকারগণ তাঁদের অধিকাংশ ছড়ায় শিশুভোলানো, ছেলেভোলানো এবং ঘুমপাড়ানি ভাব ও স্বরাবহ সৃষ্টিতেই অধিক মনোযোগী। সাহিত্যপত্রিকা ‘কালি ও কলমে’ প্রকাশিত বিশ্বজিৎ ঘোষের ছড়াবিষয়ক প্রবন্ধ ‘বাংলাদেশের ছড়ায় গণসচেতনতা’ থেকে জানা যায়, বাংলা ছড়া তার প্রাচীন লোকচারিত্র ছেড়ে আধুনিকতায় প্রথম অভিষিক্ত হয় মনস্বী অন্নদাশঙ্কর রায়ের হাত ধরে। ছড়া শব্দটির উৎস সম্পর্কে প্রফেসর ড. বেলাল হোসেন তাঁর ‘লোকসাহিত্যের কাঠামোগত স্বাতন্ত্র্য পূর্ববগুড়া’ গ্রন্থে বলেছেন—‘যোগেশচন্দ্র রায়, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজশেখর বসু প্রমুখ আভিধানিক ছড়া শব্দটির উৎস সন্ধান করেছেন সংস্কৃত ‘ছটা’ শব্দে। যোগেশচন্দ্র রায় শব্দটির অর্থ বলেছেন ‘সমূহ পরম্পরা’ বা ‘শ্লোক পরম্পরা’ (যোগেশচন্দ্র রায় ১৩২০: ৩০)।’

তবে ছড়া শব্দের উৎস অন্যভাবেও অনুমিত হতে পারে। যেমন- ছড়া মুখেমুখে সৃষ্টি হয়ে সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তো। এই ছড়ানো স্বভাবের জন্যই হয়তো ছন্দবদ্ধ এই রসাস্বাদী কথাবন্ধের নাম হয়ে থাকতে পারে ছড়া। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান (২০০০)’-কে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত ‘ছড়া’ শব্দটির নানারকম লৌকিকরূপ সম্পর্কে ড. বেলাল বলেছেন—‘সিলেটে ‘শিলখ বা শিল্ল’, ময়মনসিংহে ‘শিলুক বা শিলকি বা সিলহি’, কুমিল্লায় ‘শললুক’, রংপুর ও রাজশাহীতে ‘ছিলকা বা ছিলকি’ এবং পূর্ববগুড়ায় ‘শিল্লোক বা শিল্লুক’। উল্লেখ্য—বর্তমান বগুড়া শহরের পশ্চিম উপকণ্ঠে ‘ছিলকিবান্ধা’ নামে একটি প্রাচীন মহল্লা রয়েছে। এখানে অনুমান করা যেতেই পারে যে, হয়তো এই মহল্লায় এক বা একাধিক শিল্লোক বা শিলকি বান্ধা লোক বা ছড়াকারের বসবাস ছিল। ছড়া-গবেষকদের অনেকেই ছড়া-সাহিত্যের বিভিন্ন শ্রেণিকরণ করেছেন। একজন থেকে আরেকজনের শ্রেণি-বিভাজনে বেশকিছু পার্থক্য পরিদৃষ্ট হয়, যদিও কিছু কিছু বিভাগ প্রায় সকলের তালিকাতেই কমনরূপে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আশুতোষ ভট্টাচার্য, সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ, শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী, সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী, আশরাফ সিদ্দিকী, নির্মলেন্দু ভৌমিক, আলমগীর জলীল প্রমুখ বিভিন্নভাবে ছড়ার বিষয় ও বৈশিষ্ট্যগত বিভাজন বা শ্রেণিকরণ করেছেন। এসব শ্রেণিবিভাজনের আলোকে এখানে ছড়ার একটি সমন্বিত বিভাজন-তালিকা প্রদর্শন করা হলো।

ক. শিশুবিষয়ক ছড়া
খ. নারীবিষয়ক বা মেয়েলি ছড়া
গ. বিয়েবিষয়ক ছড়া
ঘ. জামাই বা জামাতাবিষয়ক ছড়া
ঙ. খেলাধুলাবিষয়ক ছড়া
চ. কর্মপ্রেরণামূলক ছড়া
ছ. অভ্যাস গঠনমূলক ছড়া
জ. নীতিকথামূলক ছড়া
ঝ. প্রার্থনামূলক ছড়া
ঙ. আচার-প্রথামূলক ছড়া
প. প্রকৃতিবিষয়ক ছড়া
ফ. পশুপাখিবিষয়ক ছড়া
ব. কৃষি বা ফসলবিষয়ক ছড়া
ভ. নিন্দা বা তিরস্কারমূলক ছড়া
ম. সমসাময়িক ঘটনাবিষয়ক ছড়া ইত্যাদি।

লোকপ্রবাদ এবং লোকছড়া—দুটোই আদিম মানুষদের মনের ভাব ও স্বর-ব্যঞ্জনার সুরাশ্রয়ে সৃষ্ট ধ্বনিভাষ্যের শিল্প। সুতরাং জন্মগত ঐতিহ্যের দিক থেকে দুটো শিল্পই সুপ্রাচীন। প্রখ্যাত লোক-ঐতিহ্য গবেষক সমর পাল তাঁর ‘প্রবাদের উৎসসন্ধান’ গ্রন্ধের ভূমিকায় বলেছেন—‘পূর্বকাল থেকে ধারাবাহিকভাবে চলে আসা বাক্য, জনশ্রুতি কিংবা লোক-সমাজের যুগসঞ্চিত অভিজ্ঞতালব্ধ বোধের সংক্ষিপ্ততম প্রকাশ হলো প্রবাদ।’ অন্যদিকে আরেক লোক-সংস্কৃতিবিদ বিশ্বজিৎ ঘোষ তাঁর ‘বাংলাদেশের ছড়ায় গণচেতনা’ শিরোনামীয় নিবন্ধে বলেছেন—‘ছড়াসাহিত্যের ইতিহাস সুপ্রাচীন। বাংলা ছড়ার সুদীর্ঘ ইতিহাসের পথ ধরেই বাংলাদেশের ছড়া সাহিত্যের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ।’ একইভাবে লোকসাহিত্য বিশারদ অধ্যাপক ড. পল্লব সেনগুপ্ত তাঁর ‘লোকসংস্কৃতির সীমানা ও স্বরূপ’ গ্রন্থে ‘লৌকিক ছড়ার স্বরূপ সন্ধান’ অংশে লিখেছেন—‘কালগতভাবে বিচার করলে, ছড়াকে সম্ভবত মানুষের আদিমতম সাহিত্য-প্রয়াসগুলির একটি বলেই ধার্য করতে হয়। সভ্যতার প্রদোষলগ্নে আমাদের প্রাচীন পিতামহরা যখন বহুবিচিত্র দেবতাদের অস্তিত্ব কল্পনা ক’রে নিয়ে তাঁদের উদ্দেশ্যে স্তবস্তুতি ইত্যাদি নিবেদন করতেন ছন্দ ও সুরের মাধ্যমে; তখন থেকেই ছড়ার উৎসারণের পথ খুলে যায়।... সেদিক থেকে ছড়াকেই প্রাচীনতরের শিরোপা দিতে হয়।’ (লৌকিক ছড়া প্রসঙ্গে: ড. মন্টু বিশ্বাস)

সৃষ্টি-উৎসের প্রাচীনত্বের কারণে এই লৌকিক শিল্প দুটির সৃষ্টিকাল ও স্রষ্টার পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম খনা। জনশ্রুতি আছে যে, খনার নিবাস ছিল আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বারাসাত মহকুমার দেউলিয়া গ্রামে (বর্তমানে চন্দ্রকেতুগড় প্রত্নস্থল যেটি খনামিহিরের ঢিবি নামে পরিচিত)। তিনি ছিলেন বৈদ্য বংশজাত বিদুষী এবং জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী একজন বাঙালি নারী। মনে করা হয়, তাঁর বচনগুলো আনুমানিক ৮ম থেকে ১২শ শতাব্দীর মধ্যে কোনো এক সময়ে রচিত হয়েছে। খনার বচনের মতোই তুমুল জনপ্রিয় ডাকের বচনের কোনো নির্দিষ্ট রচয়িতা নেই। ডাকের অর্থ বুদ্ধিবস্তু বা জ্ঞানগর্ভ উক্তি। ডাকের বচনের প্রথম সংকলনের নাম ‘ডাকার্ণবে’। এটি সম্ভবত অষ্টম শতকে প্রকাশিত হয়। খনার বচনগুলো মূলতই কৃষি ও পারিবারিক বিষয়সংশ্লিষ্ট; কিন্তু ডাকের বচনগুলো বিচিত্র এবং সর্ববিষয়মুখী। অনেক ক্ষেত্রে আবার বৌদ্ধধর্মীয় নীতিবাক্যেরও অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

আসল কথা হলো—ইতিহাসের প্রচলিত ধারায় আদিমত্ব এবং সর্বজনীন ও শাশ্বত মানবিক আবেদন সৃষ্টির সক্ষমতার কারণে পুরাকালের লৌকিক প্রবাদ ও লৌকিক ছড়াগুলো বাংলাবিশ্বের কোনো বিশেষ অঞ্চলে স্থবির, স্থিত বা সীমিত হয়ে থাকেনি বা থাকতে পারেনি। বরং এগুলো গৌড় বরেন্দ্র পুণ্ড্র থেকে চন্দ্রদ্বীপ নবদ্বীপ এবং রাঢ় তাম্রলিপ্তি বঙ্গ সমতট ও হরিকেল পর্যন্ত সমগ্র বাংলাভাষী ভূখণ্ডের সকল জনগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পদে পরিণত হয়েছে। সুতরাং পুণ্ড্র-অঞ্চল বা অন্য যে কোনো অঞ্চলের একান্ত নিজস্ব ধাচের পুরাকালিক লোকপ্রবাদ এবং লোকছড়া থাকার বিষয়টি খানিকটা অ্যাবসার্ড। কারণ যে প্রবাদ-ছড়া পুণ্ড্রে জনপ্রিয় তা গৌড় রাঢ় সমতট হরিকেলসহ পুরো বাংলার সর্বত্র জনপ্রিয়। ইতিহাসখ্যাত পুণ্ড্রবর্ধন বা পৌণ্ড্রবর্ধন রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানা ছিল ব্যাপক বিস্তৃত। এর তৎকালীন রাজধানী ছিল পৌণ্ড্রনগর বা পেণ্ড্রুনগর, যা বর্তমান বগুড়া জেলা শহর থেকে চৌদ্দ কিলোমিটার উত্তরে মহাস্থানগড় নামে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।

এ রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাজা বাসুদেব এবং শেষ রাজা ছিলেন পরশুরাম। রাজা পরশুরাম একজন লেখক ছিলেন। সংস্কৃত ভাষায় রচিত তাঁর গ্রন্থের নাম ছিল ‘উত্তর পৌণ্ড্র খণ্ড’। এ অঞ্চলের রূপকথা থেকে জানা যায়, রাজার ভগিনী শীলাদেবীও একজন কবি ছিলেন। ইতিহাসঘনিষ্ঠ ইতিকাহিনি মোতাবেক আফগানিস্তানের বলখ শহর থেকে আগত মুসলিম দরবেশ হযরত ইব্রাহীম শাহ সুলতান বলখী মাহিসাওয়ারের সঙ্গে এক যুদ্ধে রাজা পরশুরাম পরাজিত হন; এবং তাঁর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক পুণ্ড্ররাজ্যের পরিসমাপ্তি ঘটে। বর্তমান সময়ে পুণ্ড্রভূমি বলতে সাধারণভাবে বগুড়া এবং এর আশপাশের অঞ্চলসমূহকেই বোঝানো হয়ে থাকে। সুতরাং এই লেখায় প্রবাদ-প্রবচন এবং আধুনিক ও লৌকিক ছড়া সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনার ক্ষেত্রে পুণ্ড্র-অঞ্চলের শিল্প-স্বাতন্ত্র্য শনাক্তির একটি বিশেষ প্রয়াস বর্তমান।

চলবে...

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাবেক উপাধ্যক্ষ, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow