পেঁয়াজু খাইয়ে মাস্টারশেফের বিচারকদের মন জিতলেন সাবিনা খান

মুহাম্মদ শফিকুর রহমানরান্না যদি শিল্প হয়, তবে সেই শিল্পের এক নিখুঁত জাদুকর হলেন সাবিনা খান। ঐতিহ্য আর টেকসই জীবনযাপনের সঙ্গে তার রন্ধনশৈলীর মেলবন্ধন তৈরি করেছে এক অনন্য ভালো লাগা, ভালোবাসার জগৎ। তার হাতের রান্না যেন অমৃতসুধা, দৃষ্টিনন্দন, আর স্বাদে অসাধারণ। সম্প্রতি তিনি মাস্টারশেফ ইউকে ২০২৬-এর ২২তম সিজনের বিচারকদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন, যা তার দক্ষতা ও সৃজনশীলতারই স্বীকৃতি। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই রন্ধনশিল্পীর জনপ্রিয় একটি ইনস্টাগ্রাম পেজ রয়েছে ‘সাবিনাস ফ্লেভার ল্যাব’। নিজেকে তিনি পরিচয় করান ‘গ্লোবাল ফ্লেভার এক্সপ্লোরার’ হিসেবে। জীবনের নানা পর্বে ভিন্ন ভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসার সুযোগ পেয়েছেন সাবিনা। তার জন্ম, বেড়ে ওঠা বাংলাদেশে, পড়াশোনার জন্য ভারতে যান এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) সম্পন্ন করে সেখানেই স্থায়ী হন। এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা তার রান্নায় এনেছে বৈচিত্র্যের ছোঁয়া। বিভিন্ন সংস্কৃতির স্বাদ ও উপাদান তার রান্নায় মিশে যায় অনায়াসে। তার বিশ্বাস, একই থালায় ভিন্ন সংস্কৃতির খাবার স্থান পেতে পারে। তবে প্রতিটি পদেই থাকতে হবে গভীর ও স্মরণীয় স্বাদ। আজ তিনি যতই প্রশংসিত

পেঁয়াজু খাইয়ে মাস্টারশেফের বিচারকদের মন জিতলেন সাবিনা খান

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
রান্না যদি শিল্প হয়, তবে সেই শিল্পের এক নিখুঁত জাদুকর হলেন সাবিনা খান। ঐতিহ্য আর টেকসই জীবনযাপনের সঙ্গে তার রন্ধনশৈলীর মেলবন্ধন তৈরি করেছে এক অনন্য ভালো লাগা, ভালোবাসার জগৎ। তার হাতের রান্না যেন অমৃতসুধা, দৃষ্টিনন্দন, আর স্বাদে অসাধারণ।

সম্প্রতি তিনি মাস্টারশেফ ইউকে ২০২৬-এর ২২তম সিজনের বিচারকদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন, যা তার দক্ষতা ও সৃজনশীলতারই স্বীকৃতি। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই রন্ধনশিল্পীর জনপ্রিয় একটি ইনস্টাগ্রাম পেজ রয়েছে ‘সাবিনাস ফ্লেভার ল্যাব’। নিজেকে তিনি পরিচয় করান ‘গ্লোবাল ফ্লেভার এক্সপ্লোরার’ হিসেবে।

jagonewsজীবনের নানা পর্বে ভিন্ন ভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসার সুযোগ পেয়েছেন সাবিনা। তার জন্ম, বেড়ে ওঠা বাংলাদেশে, পড়াশোনার জন্য ভারতে যান এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) সম্পন্ন করে সেখানেই স্থায়ী হন। এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা তার রান্নায় এনেছে বৈচিত্র্যের ছোঁয়া।

বিভিন্ন সংস্কৃতির স্বাদ ও উপাদান তার রান্নায় মিশে যায় অনায়াসে। তার বিশ্বাস, একই থালায় ভিন্ন সংস্কৃতির খাবার স্থান পেতে পারে। তবে প্রতিটি পদেই থাকতে হবে গভীর ও স্মরণীয় স্বাদ।

আজ তিনি যতই প্রশংসিত হোন না কেন, তার হৃদয়ে এখনো অমলিন হয়ে আছে মায়ের রান্নার স্মৃতি। মায়ের হাতের বৈচিত্র্যময় রান্নাই তার মনে প্রথম জাগিয়ে তোলে কৌতূহল আর ভালোবাসা, যেখান থেকেই শুরু তার এই রন্ধনযাত্রা।

ইনস্টাগ্রামে ‘সাবিনাস ফ্লেভার ল্যাব’ তার জন্য এক ধরনের সৃজনশীল পরীক্ষাগার যেখানে তিনি নিরন্তর নতুন নতুন রান্না নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। কোনো কিছু ভুল হলে থেমে যান না; বরং সংশোধন করে আবারও নতুন করে রান্না করেন। তার এই যাত্রা শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সবার জন্য উন্মুক্ত এক শেখার প্ল্যাটফর্ম। তার রান্না দেখে অসংখ্য মানুষ শিখছেন, চেষ্টা করছেন, আবার নিজেদের মতামতও জানাচ্ছেন। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা এই ভক্তদের প্রতিক্রিয়াই তার অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা।

jagonewsমাস্টারশেফ প্রতিযোগিতা সাবিনার জীবনে আনন্দ ও বেদনার এক মিশ্র অধ্যায়। প্রায় ষোল বছর আগে তিনি প্রথমবার এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে সময় গর্ভাবস্থার কারণে তাকে সরে দাঁড়াতে হয়। তবু তার স্বপ্ন থেমে থাকেনি। মাস্টারশেফ ইউকে ২০২৬-এ ফিরে এসে তিনি প্রমাণ করেছেন-স্বপ্ন কখনো মরে না, যদি তা সত্যিকারের ভালোবাসা দিয়ে লালন করা হয়।

জীবনের বহু সময় পেরিয়ে গেলেও রান্নার প্রতি তার ভালোবাসা আর আন্তরিকতায় কোনো ঘাটতি পড়েনি। বয়স এখন তার পঞ্চাশের কাছাকাছি, কিন্তু তার উদ্যম আর প্রাণচাঞ্চল্য দেখলে তা বোঝার উপায় নেই। যে সন্তানের জন্মের অপেক্ষায় একসময় তিনি মাস্টারশেফের মঞ্চ ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেই সন্তানই আজ তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। মায়ের রান্নার একনিষ্ঠ ভক্ত।

মাস্টারশেফে সুযোগ পাওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে সাবিনা বলেন, ‘যখন ফোনটা পেলাম, সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।’

প্রতিযোগিতার প্রথম রাউন্ডে সাবিনা পরিবেশন করেন ডাল ও পেঁয়াজের ফ্রিটার, যা আমাদের পরিচিত পেয়াজু। বিচারকরা সেই পদ চেখে মুগ্ধ হয়ে একে ‘আনন্দের গুলি’ নামে অভিহিত করেন। আলাদাভাবে ডাল বা পেঁয়াজের নানা পদ তারা আগে খেয়েছেন, কিন্তু এই দুইয়ের মেলবন্ধনে এমন স্বাদ যে সৃষ্টি হতে পারে তা হয়তো তাদের কল্পনাতেও ছিল না। সাবিনার হাতের এই সাধারণ উপাদানের অসাধারণ রূপান্তরই তাকে আলাদা করে দিয়েছে সবার মাঝ থেকে।

কোয়ার্টার ফাইনালে সাবিনা খান পরিবেশন করেন তার ব্যতিক্রমধর্মী রেসিপি ‘হারমনি সালাদ’। এই সালাদে ছিল ফল, কালা চানা, কোয়েলের ডিম, পিকলড বিটরুট, সরিষার তেলের ড্রেসিং, ফরাসি কৌশলে তৈরি রসুনের গার্নিশ এবং আমাদের পরিচিত মুড়ি। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির এই উপাদানগুলোকে এক থালায় নিপুণভাবে সাজিয়ে তিনি তৈরি করেন স্বাদের এক অনন্য সেতুবন্ধন।

jagonewsবিচারকদের মুগ্ধ করার পাশাপাশি এই পরিবেশনায় তিনি তার স্বকীয়তারও স্পষ্ট প্রমাণ রাখেন। আগামী সপ্তাহগুলোতে তিনি নকআউট রাউন্ডে অংশ নেবেন, যেখানে তার রান্নার আরও মুন্সিয়ানা দেখা যাবে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাতেও রয়েছে তার সুস্পষ্ট দৃষ্টি। ‘সাবিনাস ফ্লেভার ল্যাব’-এর দর্শনের ওপর ভিত্তি করে একটি রান্নার বই লেখার ইচ্ছা রয়েছে তার। পাশাপাশি রন্ধনভিত্তিক সিরিজ তৈরি এবং খাবারের ইতিহাস নিয়ে লেখালেখি চালিয়ে যেতে চান তিনি।

সাবিনার বিশ্বাস, বাংলাদেশের প্রতিটি কোণায় অসাধারণ দক্ষ রাঁধুনি নারী রয়েছেন, যারা এখনো তাদের প্রতিভাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছেন না। অথচ ইচ্ছা ও উদ্যোগ থাকলে এই দক্ষতাকে পেশায় রূপ দিয়ে একজন সফল শেফ হিসেবে ভালো আয় করা সম্ভব।

বিভিন্ন সংস্কৃতির রান্নার সংমিশ্রণ, গভীর স্বাদের প্রতি তার যত্ন, আর দৃষ্টিনন্দন উপস্থাপনার সঙ্গে ঐতিহ্যের মেলবন্ধন-সব মিলিয়ে সাবিনার রান্না তাকে আলাদা এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আশা করা যায়, তার এই নিজস্ব উপস্থাপনা ও উদ্ভাবনী চিন্তার পথ ধরে তিনি আরও বহুদূর এগিয়ে যাবেন, আর সফলতার আরও অনেক মুকুট শোভা পাবে তার মাথায়।

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow