বন্যার শঙ্কায় আধা পাকা ধান কাটছেন হাওরপাড়ের চাষিরা

নেত্রকোনায় আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাসে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ডিজেল ও শ্রমিক সংকটে অনিশ্চয়তার মধ্যেই তারা দ্রুত ধান কাটার কাজে নেমেছেন। গত দুই দিন হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় কৃষকেরা নির্বিঘ্নে মাঠে কাজ করতে পেরেছেন। রোববার (২৬ এপ্রিল) সকালে জেলায় হালকা রোদ দেখা গেছে, তবে আকাশ ছিল কিছুটা মেঘাচ্ছন্ন। নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন রোববার সকালে বলেন, বৃষ্টি না হওয়া স্বস্তির হলেও ২৮ এপ্রিল থেকে ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হতে পারে। এসময় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করে হাওরে ঢুকে পড়তে পারে, ফলে বন্যার আশঙ্কা আছে। হাওরের জমিতে ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলে সেগুলো জমিতে রাখা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। নেত্রকোনায় আগেও ভারী বৃষ্টি হয়েছে। এমনিতে হাওরের বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা রয়েছে। এখন উজানের ঢল নামলে পানি আরও বাড়বে। তাই দ্রুত পাকা ধান কাটতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় কৃষকেরা জানান, হাওরের প্রায় অর্ধেক ধান এখনো পাকেনি। ধান রোপণের সময় হাওরে পানি থাকায় রোপণ করতে কিছুটা দেরি হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে বৃষ

বন্যার শঙ্কায় আধা পাকা ধান কাটছেন হাওরপাড়ের চাষিরা

নেত্রকোনায় আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাসে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ডিজেল ও শ্রমিক সংকটে অনিশ্চয়তার মধ্যেই তারা দ্রুত ধান কাটার কাজে নেমেছেন। গত দুই দিন হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় কৃষকেরা নির্বিঘ্নে মাঠে কাজ করতে পেরেছেন।

রোববার (২৬ এপ্রিল) সকালে জেলায় হালকা রোদ দেখা গেছে, তবে আকাশ ছিল কিছুটা মেঘাচ্ছন্ন।

নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন রোববার সকালে বলেন, বৃষ্টি না হওয়া স্বস্তির হলেও ২৮ এপ্রিল থেকে ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হতে পারে। এসময় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করে হাওরে ঢুকে পড়তে পারে, ফলে বন্যার আশঙ্কা আছে। হাওরের জমিতে ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলে সেগুলো জমিতে রাখা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। নেত্রকোনায় আগেও ভারী বৃষ্টি হয়েছে। এমনিতে হাওরের বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা রয়েছে। এখন উজানের ঢল নামলে পানি আরও বাড়বে। তাই দ্রুত পাকা ধান কাটতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, হাওরের প্রায় অর্ধেক ধান এখনো পাকেনি। ধান রোপণের সময় হাওরে পানি থাকায় রোপণ করতে কিছুটা দেরি হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি কম হওয়ায় ধান পাকতে দেরি হচ্ছে। আবার অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে কম্বাইন হারভেস্টার দিয়েও ধান কাটতে সমস্যা হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে ডিজেল ও শ্রমিক সংকটও।

পাউবো জানায়, এবার নেত্রকোনায় চৈত্র মাসের শুরু থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। অতিবৃষ্টিতে বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। চেরাপুঞ্জিতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। উজানে বৃষ্টি হলে নেত্রকোনায় পাহাড়ি ঢল নামে। এতে সোমেশ্বরী, কংস, ধনু, উদ্ধাখালীসহ অন্যান্য নদ-নদীতে পানি বাড়ে। যেকোনো সময় হাওর এলাকায় দেখা দিতে পারে অকাল বন্যা, ক্ষতি হতে পারে বোরো ফসলের।

স্থানীয় কৃষক, উপজেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, জেলার খালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ, মদন ও কলমাকান্দার আংশিক এলাকা মূলত হাওরাঞ্চল। হাওরের একমাত্র ফসল বোরোর ওপরই নির্ভর করে কৃষকদের সারা বছরের সংসার খরচ, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়ালেখা ও আচার অনুষ্ঠান। জেলায় ছোট-বড় মোট ১৩৪টি হাওরের মধ্যে খালিয়াজুরিতে ৮৯টি হাওর আছে।

আগাম বন্যা থেকে হাওরের ফসল রক্ষায় এ বছর ১৩৮ কিলোমিটার ডুবন্ত (অস্থায়ী) বাঁধ দেওয়া হয়। পাউবো ও উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এসব বাঁধে ব্যয় ধরা হয় ৩১ কোটি টাকা। এসব বাঁধের ওপর স্থানীয় কৃষকদের প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির রোরো ফসল নির্ভর করে।

গত দুই সপ্তাহের বৃষ্টিতে নেত্রকোনার কংস, উব্দাখালি, ধনুসহ বেশ কয়েকটি নদ-নদীর পানি বাড়ছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে রোববার দুপুর একটা পর্যন্ত খালিয়াজুরির ধনু নদে প্রায় তিন ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে উঠতি বোরো ফসল নিয়ে চিন্তিত স্থানীয় কৃষক। হাওরাঞ্চলের প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদিত ফসলের বাজার মূল্য প্রায় ৭০০ কোটি টাকা।

খালিয়াজুরী সদর উপজেলার কৃষক শামছুল হক (৫৫) বলেন, কখন কী হয় বলা যায় না, এজন্য চিন্তায় আছি। নিচু জমির ধান জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়ে গেছে, উঁচু জমির ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু হাওড়ের সব ধান এখনো পাকেনি। খুব দুশ্চিন্তায় আছি। এখন আধাপাকা ধানই কাটছি।

কৃষ্ণপুর এলাকার কৃষক হাশেম আলী (৫৩) বলেন, ‘প্রতিদিন মেঘ (বৃষ্টি) হইতেছে, এর লাগি ভালা লাগতেছে না। ওখন কি অইব, বুঝতেছি না। ইবার দেখি বিপদ আমরার পিছ ছাড়বে না।’

মোহনগঞ্জের গাগলাজুর গ্রামের কৃষক কুদ্দুস মিয়া বলেন, ‘ধান পাকেনি। শ্রমিকও নাই। আধাপাকা ধান নিজেরাই কাটতেছি। কখন বন্যা হয়, কখন কি হয় জানি না।’

খালিয়াজুরি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘খালিয়াজুরী উপজেলায় ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার মেট্রিক টন। হাওরে পুরোদমে ধান কাটা চলছে। আমরা কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিচ্ছি।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাদির হোসেন শামীম বলেন, ‘ধনু নদে পানি কিছুটা বেড়েছে। কিছু কিছু নিচু এলাকার ধান খেতে পারি জমেছে। হাওড়ের পাকা ধান দ্রুত কেটে ফেলতে মাইকিং করে কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ডিজেলের যাতে সংকট না হয় তা তদারকি করা হচ্ছে।’

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়, আগামী কয়েক দিনে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উজানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হতে পারে। ২৪-২৬ এপ্রিল হালকা থেকে মাঝারি, ২৭ এপ্রিল মাঝারি থেকে ভারী এবং ২৮-৩০ এপ্রিল ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। এতে ধনু, বৌলাই ও কংস নদের পানি বাড়তে পারে এবং ২৮ এপ্রিল থেকে কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।

এইচ এম কামাল/এমএন/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow