বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধকতার দেয়াল ভেঙে শতভাগ বৃত্তি পেলেন ইফতি
কথা বলতে পারেন না। শ্রবণশক্তিও নেই। কিন্তু স্বপ্ন দেখতে কোনো বাধা ছিল না। প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই একের পর এক বাধা অতিক্রম করে এবার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব (অ্যানথ্রোপলজি) বিভাগে শতভাগ স্কলারশিপ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী তরুণ মামুনুর রশীদ ইফতি। তার এই অর্জন শুধু একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা, পারিবারিক ভালোবাসা এবং অদম্য অধ্যবসায়ের এক অনন্য উদাহরণ। চট্টগ্রাম হাটহাজারীর সন্তান ইফতির জন্ম একটি শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী পরিবারে। বাবা ও মা দুজনই শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একমাত্র বড় বোন আফরোজা খাতুন মুক্তাই স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে এবং শুনতে পারেন। ছোটবেলা থেকেই তিনিই ছিলেন ইফতির পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের সবচেয়ে বড় সেতুবন্ধন। ভাইয়ের পড়াশোনা, শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ, পাঠ বুঝিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তিনি পাশে থেকেছেন। পরিবারের এই অক্লান্ত সমর্থনই ইফতির আত্মবিশ্বাস ও এগিয়ে চলার শক্তি হয়ে উঠেছে। ইফতির শিক্ষাজীবনের শুরু একটি মাদ্রাসায়। কিন্তু পাঠ বুঝতে অসুবিধা হওয়ায়
কথা বলতে পারেন না। শ্রবণশক্তিও নেই। কিন্তু স্বপ্ন দেখতে কোনো বাধা ছিল না। প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই একের পর এক বাধা অতিক্রম করে এবার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব (অ্যানথ্রোপলজি) বিভাগে শতভাগ স্কলারশিপ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী তরুণ মামুনুর রশীদ ইফতি। তার এই অর্জন শুধু একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা, পারিবারিক ভালোবাসা এবং অদম্য অধ্যবসায়ের এক অনন্য উদাহরণ।
চট্টগ্রাম হাটহাজারীর সন্তান ইফতির জন্ম একটি শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী পরিবারে। বাবা ও মা দুজনই শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একমাত্র বড় বোন আফরোজা খাতুন মুক্তাই স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে এবং শুনতে পারেন। ছোটবেলা থেকেই তিনিই ছিলেন ইফতির পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের সবচেয়ে বড় সেতুবন্ধন। ভাইয়ের পড়াশোনা, শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ, পাঠ বুঝিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তিনি পাশে থেকেছেন। পরিবারের এই অক্লান্ত সমর্থনই ইফতির আত্মবিশ্বাস ও এগিয়ে চলার শক্তি হয়ে উঠেছে।
ইফতির শিক্ষাজীবনের শুরু একটি মাদ্রাসায়। কিন্তু পাঠ বুঝতে অসুবিধা হওয়ায় প্রতিদিন বড় বোন আফরোজা মুক্তা তাঁর পাশে বসে পাঠ বুঝিয়ে দিতেন। পরে সাধারণ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও প্রয়োজনীয় সহায়ক পরিবেশের অভাবে পড়াশোনায় বাধা সৃষ্টি হয়। তখন পরিবারের সিদ্ধান্তে তাকে ঢাকার সরকারি বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। পরিবার থেকে দূরে একা থেকে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু সেই কঠিন সিদ্ধান্তই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
সরকারি বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.০০ এবং গুলশান কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৮৩ অর্জন করেন ইফতি। ধারাবাহিক ভালো ফলাফলের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টানা তিনবার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মেধাবৃত্তি লাভ করেন। এছাড়া ২০২৪ সালে National IT Competition for Youth with Disabilities প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে তথ্যপ্রযুক্তিতেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ রাখেন।
শিক্ষার পাশাপাশি তিনি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সমানভাবে সক্রিয়। ঢাকা থিয়েটার এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের DARE Project-এর শিল্পী হিসেবে নিয়মিত অভিনয় করছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী তরুণদের প্রতিনিধিত্ব করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অংশ নিচ্ছেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নেতৃত্ব বিকাশ নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি নিজের সম্প্রদায়ের তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।
সম্প্রতি তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগে শতভাগ স্কলারশিপ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নেওয়া উদ্যোগের এটি একটি উল্লেখযোগ্য সফল উদাহরণ।
ইফতির বড় বোন আফরোজা খাতুন মুক্তা, যিনি পরিবারের একমাত্র সদস্য হিসেবে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে ও শুনতে পারেন এবং বর্তমানে একজন সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ইন্টারপ্রেটার ও প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী হিসেবে কাজ করছেন, মুক্তা বলেন, ‘ইফতিকে নিয়ে আমাদের পথচলা সহজ ছিল না। সমাজের অনেকেই মনে করতেন, কথা বলতে না পারা একটি ছেলে খুব বেশি দূর এগোতে পারবে না। কিন্তু আমরা কখনো সেই বিশ্বাস হারাইনি। তাকে ঢাকায় ভর্তি করানো, একা থেকে পড়াশোনা করার সাহস দেওয়া এবং প্রতিটি ধাপে পাশে থাকা ছিল আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। আজ তার এই অর্জন প্রমাণ করে, সঠিক সুযোগ, পরিবারের সমর্থন এবং নিজের পরিশ্রম থাকলে প্রতিবন্ধিতা কখনোই সফলতার পথে বাধা হতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি সবসময় চেয়েছি সমাজ যেন আমার ভাইকে করুণা নয়, তার যোগ্যতার জন্য মূল্যায়ন করে। আজ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শতভাগ স্কলারশিপ নিয়ে তার ভর্তি হওয়া শুধু আমাদের পরিবারের গর্ব নয়, এটি বাংলাদেশের অসংখ্য প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্যও আশার বার্তা।’
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ইফতি জানান, নৃতত্ত্ব বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে তিনি সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে চান।
ইফতির গল্প প্রমাণ করে, প্রতিবন্ধকতা মানুষের সক্ষমতাকে সংজ্ঞায়িত করে না। সুযোগ, পরিবারের অবিচল সমর্থন এবং নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে নীরবতার ভেতর থেকেও সৃষ্টি হয় সাফল্যের সবচেয়ে জোরালো ভাষা। তার এই অর্জন শুধু একটি পরিবারের নয়, বাংলাদেশের হাজারো প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন দেখার সাহস হয়ে থাকবে।
What's Your Reaction?