বাবা দিবসের গল্প: জীবনের স্থপতি

তপ্ত দুপুরের গল্প। যে দুপুরে তৃতুপুরী শহরে বাতাসের ঝাপটায় আগুনের হলকা থাকে আর রাস্তার পিচ গলে চটি জুতো আটকে যায়। মধ্যবিত্ত পাড়ার সেই পুরোনো দোতলা বাড়িটি মানে শাওনাজ ভিলার বারান্দায় দাঁড়ালে মনে হয় বাইরের চেয়ে ভেতরের পৃথিবীটা একদম আলাদা, অনন্য ও নন্দিত। সেখানে এক বৃদ্ধ ইজিচেয়ারে অর্ধশুয়ে আছেন। তার নাম এ জি সরকার। পাড়ার মানুষ তাকে চেনে ‘সরকার সাহেব’ নামে। আজ জীবনের সবচেয়ে বড় নকশাটি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি স্মৃতির পাতা ওল্টাচ্ছেন। সেই নকশাটির নাম সংসার। এ জি সরকার সাহেবের একমাত্র ছেলে জগলুল হায়দার সরকার। সন্তান জন্মদানের সময় জগলুর মা চলে যান না ফেরার দেশে। সেই থেকে সিঙ্গেল ফাদার হিসেবে নিরলস চলছেন নিরবধি। আজ তার ছেলে বড় স্থপতি। বনেদি ফার্মে কাজ করে। কিন্তু জগলুর কাছে স্থাপত্য মানে কেবল ইট-পাথরের ইমারত নয় বরং তার বাবার জীবনটাই একটা জীবন্ত স্থাপত্য। জগলু ড্রয়িংরুমে বসে বাবার সেই পুরোনো ডায়েরিটা দেখছিল। যেখানে বাবা ছোটবেলায় তার জন্য কবিতার ছন্দে ছন্দে জীবনের পাঠ লিখে রাখতেন। এ জি সরকার পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন না কিন্তু জগলুর চোখে তিনি ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রূপকার। জগলুর মনে পড়ে, যখন

বাবা দিবসের গল্প: জীবনের স্থপতি

তপ্ত দুপুরের গল্প। যে দুপুরে তৃতুপুরী শহরে বাতাসের ঝাপটায় আগুনের হলকা থাকে আর রাস্তার পিচ গলে চটি জুতো আটকে যায়। মধ্যবিত্ত পাড়ার সেই পুরোনো দোতলা বাড়িটি মানে শাওনাজ ভিলার বারান্দায় দাঁড়ালে মনে হয় বাইরের চেয়ে ভেতরের পৃথিবীটা একদম আলাদা, অনন্য ও নন্দিত। সেখানে এক বৃদ্ধ ইজিচেয়ারে অর্ধশুয়ে আছেন। তার নাম এ জি সরকার। পাড়ার মানুষ তাকে চেনে ‘সরকার সাহেব’ নামে। আজ জীবনের সবচেয়ে বড় নকশাটি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি স্মৃতির পাতা ওল্টাচ্ছেন। সেই নকশাটির নাম সংসার।

এ জি সরকার সাহেবের একমাত্র ছেলে জগলুল হায়দার সরকার। সন্তান জন্মদানের সময় জগলুর মা চলে যান না ফেরার দেশে। সেই থেকে সিঙ্গেল ফাদার হিসেবে নিরলস চলছেন নিরবধি। আজ তার ছেলে বড় স্থপতি। বনেদি ফার্মে কাজ করে। কিন্তু জগলুর কাছে স্থাপত্য মানে কেবল ইট-পাথরের ইমারত নয় বরং তার বাবার জীবনটাই একটা জীবন্ত স্থাপত্য। জগলু ড্রয়িংরুমে বসে বাবার সেই পুরোনো ডায়েরিটা দেখছিল। যেখানে বাবা ছোটবেলায় তার জন্য কবিতার ছন্দে ছন্দে জীবনের পাঠ লিখে রাখতেন।

এ জি সরকার পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন না কিন্তু জগলুর চোখে তিনি ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রূপকার। জগলুর মনে পড়ে, যখন সে ছোট ছিল; তখন বাবা তাকে নিয়ে ভাঙা খেলনা ঠিক করতেন। বাবা বলতেন, ‘খোকা, ভেঙে যাওয়া সহজ কিন্তু গড়ে তোলা সাধনার কাজ।’

সরকার সাহেবের বাগানটা অনন্য সুন্দর ছিল। ফুলে ফুলে মৌমাছিতে ভরপুর। জগলুর বাবা বলতেন, ‘ফুল ছিঁড়বে না বাবা, ফুলের সাথে, গাছের সাথে, লতার সাথে কথা বললে দেখবে ওরা উত্তর দেবে।’
ছোট্টো জগলু বলতো, ‘ওরা শুধু তোমার সাথেই কথা বলে বাবা, আমার সাথে কথা বলে না!’
বাবা বলতেন, ‘একদিন ঠিক বলবে, ওরা বড্ড অভিমানি তো!’
ছবি আঁকার সময় বাবা প্রজাপতির পাখাগুলো নানান রঙে রাঙিয়ে দিতেন। অঙ্কিত ছবির মোষের শিং বাঁকা করে দিতেন।

এ জি সরকার কেবল ইমারত গড়েননি, তিনি গড়ে তুলেছিলেন একটি আদর্শের ভিত। জগলুর কাছে স্কুলের শিক্ষকরা ছিলেন পাঠ্যবইয়ের জোগানদার কিন্তু বাবা ছিলেন জীবনের তপোবন। যেখানে শান্তিনিকেতনের মতো নিস্তব্ধতা আর গভীরতা ছিল। বাবা শেখাতেন কীভাবে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে হয়। বাবা বলেছিলেন, ‘সিলেবাস নামক বৃত্তের পরিধির বাহিরে গিয়েও তোমাকে কিছু করতে হবে।’

সেই থেকে জগলুর লেখালিখি শুরু। হাঁটি হাঁটি পা পা করে আজ লেখক সমাজেও জগলু বেশ পরিচিত নাম। সে তাদের বাগান নিয়ে ‘কবিকুঞ্জ’ কবিতায় লিখেছিল, ‘ফুলের পাশে ফুলের আশে/ স্বপ্নের প্রহর অফুরান!/ ভ্রমরের গুঞ্জনে বীণার নিক্কনে/ সুরে তানে মিলাই প্রাণ!’

জগলুর জীবনের একটি বিশেষ দিনের কথা মনে পড়ে। তখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষবর্ষে। আচমকা এক বিশাল আর্থিক সংকটে পড়ল পরিবার। জগলু ভাবল পড়াশোনা ছেড়ে পার্টটাইম চাকরিতে ঢুকে যাবে। বাবা সেদিন তার সামনে এসে দাঁড়ালেন। বাইরে তখন প্রচণ্ড রোদ। বাবার কপালের ঘাম তার রুমালটাকে ভিজিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তার মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে বললেন, ‘তোর মাথার ওপর আকাশটা এখনো আমি ধরে আছি রে। রোদ লাগলে আমার গায়ে লাগবে। তোর ওপর আমি ছাতা হয়ে থাকব যতকাল প্রাণ আছে।’ সেদিন জগলু বুঝেছিল, বাবা মানে সেই বটবৃক্ষ; যার তলায় দাঁড়ালে বাইরের ঝড়-ঝাপ্টা সব তুচ্ছ মনে হয়।

ঝিনুকের ভেতর যেমন মুক্তো লুকানো থাকে, বাবার কঠোর শাসনের ভেতরেও ঠিক তেমনি এক অব্যক্ত মায়ার ধন লুকানো ছিল। বাবা কখনো মুখে ‘ভালোবাসি’ বলেননি কিন্তু তার ঘামে ভেজা শার্টের গন্ধে জগলু অব্যক্ত ভালোবাসার ঘ্রাণ পেত।

এ জি সরকার ছিলেন পাহাড়ের মতো। পাহাড় যেমন নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সব ঋতু সহ্য করে; তিনিও তেমনি ছিলেন ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা। জগলুর মনে পড়ে, একবার এক অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বাবা চাকরি হারিয়েছিলেন। মাসের পর মাস অর্থকষ্টে কেটেছে কিন্তু বাবার মুখে কোনো অভিযোগ ছিল না। তিনি ছিলেন সততার এক বশিষ্ঠ ঋষি। জগলুর জন্য তার বাবা দধীচিও বটে।

অন্যায়ের সামনে তিনি যখন বুক চিতিয়ে দাঁড়াতেন; তখন তাকে মনে হতো এক দুর্ভেদ্য দেওয়াল। জগলুকে তিনি সব সময় বলতেন, ‘মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার চরিত্র। সততার পথ পিচ্ছিল হতে পারে কিন্তু সেই পথে হাঁটলে রাতে শান্তিতে ঘুমানো যায়।’ আজ জগলু যখন বড় বড় প্রজেক্টে কাজ করে, তখন অনেক প্রলোভন আসে। কিন্তু বাবার সেই পাহাড়ের মতো মৌনতা আর দৃঢ়তার কথা মনে পড়লে সে অনায়াসেই সেই প্রলোভন পায়ে ঠেলে দেয়।

জগলুর ক্যারিয়ারের শুরুতে একবার এক বড় ভুল করায় খুব ভেঙে পড়েছিল। চারপাশটা যেন অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছিল। সেই গভীর অন্ধকারে বাবা এসে তার কাঁধে হাত রাখলেন। বাবা যেন হয়ে উঠলেন আকাশের ধ্রুবতারা। তিনি দিগ্‌ভ্রান্ত নাবিকরূপী জগলুকে পথ দেখালেন। বাবা বললেন, ‘ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়, এটা একটা নতুন নকশার শুরু মাত্র।’
সেই মুহূর্তে বাবার কথাগুলো ছিল তপ্ত গ্রীষ্মের পর প্রশান্ত শ্রাবণের বৃষ্টির মতো। এক নিমেষেই জগলুর মনের সব জ্বালা জুড়িয়ে গেল। সে নতুন উদ্যমে কাজে ফিরল। বাবার সেই ধীরস্থির কণ্ঠস্বর তাকে সব সময় কাজের শক্তি জোগায়, মনে প্রশান্তি দেয়। সেদিন সে বাবাকে নিয়ে লিখেছিল, ‘আগাগোড়া দেশ-প্রেমিক/ সহজ সরল সৎ সুমন!/ দেখেছি ঘুরে বিশ্বজুড়ে/ বাবার মতো বিরল সুজন!/ ...আমার বাবা আমার বিশ্ব/ বাবা ছাড়া আমি নিস্ব!/ গুনে-মানে ধ্যানে জ্ঞানে/ বাবা গুরু আমি শিষ্য!’

সংসার এক রণাঙ্গন। সেই রণাঙ্গনের সেনাপতি ছিলেন বাবা এ জি সরকার। তিনি নিজের জন্য কোনোদিন নতুন জামা কেনেননি, কিন্তু জগলুর জন্মদিনে সেরা উপহারটা ঠিকই নিয়ে আসতেন। ত্যাগের যে শীর্ষবিন্দুতে বাবা পৌঁছেছিলেন, তা জগলুর কাছে হিমালয়ের চেয়েও উঁচু মনে হয়। আসলে বাবা সাগরের চেয়ে বিশাল হয়।

বাবার বুকের ভেতরটা ছিল আকাশ সমান বড়। সেখানে সন্তানের সব আবদার, সব ভুল অনায়াসে হারিয়ে যেত। এ জি সরকার জানতেন সন্তানের উত্থান-শিখর তখনই মজবুত হবে; যখন তার শেকড় মাটির গভীরে গেঁথে থাকবে। আর সেই শেকড় ছিলেন তিনি নিজে। তিনি নিজেকে মাটির নিচে লুকিয়ে রেখেছিলেন, যাতে তার সন্তান মহীরুহ হয়ে আকাশে মাথা তুলতে পারে।

আজ জগলু তার নিজের অফিস উদ্বোধন করছে। ফিতা কাটার জন্য সে কোনো ভিআইপিকে ডাকেনি। সে ডেকেছে তার বাবাকে। এ জি সরকার সাহেব আজ লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটছেন। তার কপালে এখন বলিরেখা কিন্তু চোখে সেই একই তেজোদীপ্ত দৃষ্টি। জগলু মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল, ‘সবাই সফল স্থপতি আর ডিজাইনারকে খুঁজছিলেন না আপনারা? এই মুহূর্তে যে মানুষটি আমার ডানে দাঁড়িয়ে আছেন, ইনিই আসল স্থপতি। আমার জীবনের স্থপতি। আমার সফলতার প্রতিটি ইটে তার ঘাম মিশে আছে। তিনি শিখিয়েছেন সোজা হয়ে দাঁড়াতে, শিখিয়েছেন আদর্শের পতাকা উঁচিয়ে ধরতে।’

এ জি সরকার মিটিমিটি হাসছেন। তার মনে হচ্ছে, জীবনের ক্রীড়াঙ্গণের রিলে রেসে তিনি সফল হয়েছেন। পেয়ে গেছেন জীবনের সেলফ অ্যাকচুয়ালাইজেশন। তার প্রোথিত শেকড় আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। সে বৃক্ষ এখন অন্যকে ছায়া দিতে রিলে রেসের ব্যাটন নিয়ে দৌড়াচ্ছে।

বাইরে শ্রাবণের মেঘ জমেছে। হয়তো একটু পরেই বৃষ্টি নামবে। জগলু বাবার হাত ধরে গাড়িতে ওঠার সময় দেখল, বাবার সেই পুরোনো রুমালে আজও ত্যাগের গন্ধ লেগে আছে। বাবা মানে কেবল একটি শব্দ নয়, বাবা মানে এক বিশাল ভুবন; যেখানে সন্তান চিরকাল পরম শান্তিতে বাস করে।

পরদিন ছিল বিশ্ব বাবা দিবস। জগলু তার বাবাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখলো:

পিতৃস্তব

বাবা আমার স্থপতি-রূপকার
আমার বিশ্ব-ভুবন;
বাবা আমার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক
চির শ্রেষ্ঠ তপোবন!

বাবা রোদে মাথার ছাতা
বটবৃক্ষের শীতল ছায়া,
ঝিনুকের মত লুকায়িত ধন
অব্যক্ত বুকে মায়া।

পাহাড়ের মত মৌন-মহান
ধৈর্য দৃঢ়তার পরাকাষ্ঠা;
সাহসের দুর্ভেদ্য দেওয়াল
সততার চির বশিষ্ঠা!

নীল নভে বাবা ধ্রুবতারা,
দিশারী গাঢ় অন্ধকারে;
স্নিগ্ধ শ্রাবণে প্রশান্তির পরশ
বৃষ্টির ছোঁয়া খরে!

বাবা যেন আস্থার হিমালয়,
শান্তির নিবিষ্ট নীড়।
আদর্শের পতাকা পতপত ওড়ে
ছাপিয়ে হাজার ভিড়।

ঘর্মাক্ত কপাল আক্ত রুমাল
অক্লান্ত শিরদাঁড়া;
মাথা তুলে চিরকাল বলে
সোজা হয়ে দাঁড়া!

বাবার বুক আকাশ সমান
সন্তানের চিরায়ত সুর;
ত্যাগ-তিতীক্ষার শীর্ষবিন্দু
সন্তানের চির স্বপ্নচূড়!

সংসার রণাঙ্গনের সেনাপতি
সন্তানের প্রোথিত শেকড়;
যার ওপর রচিত হয়
সন্তানের উত্থান-শিখর!

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow